দ্বিতীয় দফায় হোয়াইট হাউসে ফেরার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থায় বড়সড় ধাক্কা দিয়েছেন। ৭ আগস্ট থেকে কার্যকর হওয়া নতুন শুল্ক ব্যবস্থায় ৯০টিরও বেশি দেশের পণ্যের ওপর কর আরোপ করা হয়েছে। যুক্তরাজ্যের পণ্যে ১০% থেকে শুরু করে সিরিয়ায় ৪১% এবং ভারতের ক্ষেত্রে কর আরোপ হয়েছে ৫০% পর্যন্ত। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের গড় কার্যকর শুল্কহার প্রায় এক শতাব্দীর মধ্যে সর্বোচ্চে পৌঁছেছে।
গাড়ি ও ইস্পাতসহ কিছু নির্দিষ্ট পণ্যে আলাদা উচ্চ শুল্কও বসানো হয়েছে। এসব শুল্ক আমেরিকায় পণ্য আমদানিকারী কোম্পানিগুলোকেই পরিশোধ করতে হয়। এরইমধ্যে দেশীয় ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে এসব শুল্ক।
ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট ল্যাবের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৭ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের গড় কার্যকর শুল্কহার দাঁড়িয়েছে ১৮ দশমিক ৬% — যা ১৯৩৩ সালের পর সর্বোচ্চ। ২০২৪ সালে এটি ছিল মাত্র ২ দশমিক ৪%। অফিসিয়াল তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক রাজস্ব ছিল ২৮ বিলিয়ন ডলার — যা ২০২৪ সালের মাসিক আয়ের তিনগুণ।
কংগ্রেশনাল বাজেট অফিসের (সিবিও) অনুমান— ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত নতুন শুল্ক নীতি ২০৩৫ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণ ২ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার কমাতে সহায়তা করতে পারে। তবে সংস্থাটি সতর্ক করে দিয়েছে, এই শুল্ক অর্থনীতির আকার ছোট করবে এবং পরবর্তী এক দশকে ট্রাম্প প্রশাসনের করছাড়ের কারণে রাজস্ব ক্ষতি শুল্ক আয়ের চেয়ে বেশি হবে।
ট্রাম্প দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ঘাটতিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি অবিচার হিসেবে দেখেন এবং শুল্ক দিয়ে আমদানি কমানো ও বিদেশী বাজার খোলার ব্যাপারে চাপ সৃষ্টি করতে চান। কিন্তু বাস্তবে, শুল্ক কার্যকর হওয়ার আগে মার্কিন কোম্পানিগুলো বিপুল পরিমাণ পণ্য মজুদ করায় আমদানি বেড়েছে। ফলে মার্চ ২০২৫ সালের মার্চে পণ্য বাণিজ্য ঘাটতি রেকর্ড ১৬২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। তবে জুনে তা ৮৬ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদে ঘাটতি কমানো কঠিন হবে কারণ এটি মূলত যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির কাঠামোগত সমস্যার ফল।
চীনের পণ্যে এক সময়ে ১৪৫% শুল্ক আরোপ করা হলেও বর্তমানে তা কমে ৩০%-এ নেমেছে। তবুও ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে চীনের যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি আগের বছরের তুলনায় ১১% কমেছে। একই সময়ে ভারত, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য এবং আসিয়ান দেশগুলোতে রফতানি যথাক্রমে ১৪%, ৭%, ৮% এবং ১৩% বেড়েছে চীনের।
যুক্তরাষ্ট্র-চীন দ্বন্দ্বের ফাঁকে অন্যান্য দেশ পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি এগিয়ে নিচ্ছে। যুক্তরাজ্য ও ভারত তিন বছরের আলোচনার পর নতুন চুক্তি করেছে। নরওয়ে, আইসল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড ও লিচেনস্টেইন (ইএফটিএ) গোষ্ঠী মেরকোসুরের লাতিন দেশগুলোর সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে এবং কানাডা আসিয়ানের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির চেষ্টা চালাচ্ছে।
সয়াবিন আমদানিতে চীন যুক্তরাষ্ট্রের বদলে ব্রাজিলের দিকে ঝুঁকেছে। ২০২৫ সালের জুনে চীন ১০ দশমিক ৬ মিলিয়ন টন সয়াবিন ব্রাজিল থেকে কিনেছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র থেকে কেনা সয়াবিনের পরিমাণ মাত্র ১ দশমিক ৬ মিলিয়ন টন। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে অনুরূপ পরিস্থিতিতে মার্কিন কৃষকদের ক্ষতিপূরণ দিতে হয়েছিল।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, উচ্চ শুল্ক আমেরিকান ভোক্তাদের জন্য মূল্যস্ফীতি ডেকে আনবে। জুনে যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রাস্ফীতি ছিল ২ দশমিক ৭%— যা মে মাসের ২ দশমিক ৪% থেকে বেশি। শুরুর দিকে মজুদ পণ্যের কারণে দাম নিয়ন্ত্রণে থাকলেও জুনে বড় গৃহস্থালী যন্ত্রপাতি, কম্পিউটার, খেলাধুলার সরঞ্জাম, বই ও খেলনার দাম স্পষ্টভাবে বেড়েছে।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাইসিং ল্যাবের গবেষণায় দেখা গেছে, শুল্কে প্রভাবিত আমদানি ও দেশীয় পণ্যের দাম ২০২৫ সালে দ্রুত বাড়ছে, যেখানে শুল্কমুক্ত দেশীয় পণ্যের দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল।