সুদানের চলমান গৃহযুদ্ধে এবার প্রতিবেশী দেশ ইথিওপিয়ার সরাসরি জড়িত থাকার চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। দেশটির একটি দুর্গম এলাকায় বিদ্রোহী আধা-সামরিক বাহিনী ‘র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস’ (আরএসএফ)-এর হাজার হাজার যোদ্ধাকে গোপনে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইথিওপিয়ার পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রত্যন্ত বেনিশাঙ্গুল-গুমুজ অঞ্চলের একটি গভীর বনে এ ক্যাম্পটি অবস্থিত, যা সুদান সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থিত। এ ঘটনা সুদানের চলমান গৃহযুদ্ধে ইথিওপিয়ার সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রথম প্রমাণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রয়টার্স জানিয়েছে, অন্তত ১৫ জন কর্মকর্তা, কূটনীতিক ও স্যাটেলাইট থেকে প্রাপ্ত ছবির ভিত্তিতে এ ক্যাম্পের অস্তিত্ব নিশ্চিত হওয়া গেছে। বর্তমানে সেখানে প্রায় ৪ হাজার ৩০০ আরএসএফ যোদ্ধা প্রশিক্ষণ নিচ্ছে বলে ইথিওপিয়ার নিরাপত্তা গোয়েন্দা বিভাগের একটি গোপন নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
নথিতে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, ক্যাম্পটিতে একসঙ্গে প্রায় ১০ হাজার যোদ্ধা অবস্থান করার সক্ষমতা রয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এ প্রশিক্ষণের ফলে সুদানের দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলে নতুন করে লড়াই তীব্র হতে পারে।
ইথিওপিয়ার সরকারি কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) এই ক্যাম্পটি নির্মাণে অর্থায়ন করেছে। এছাড়া আমিরাত সেখানে সামরিক প্রশিক্ষক এবং প্রয়োজনীয় রসদ সরবরাহ করছে। যদিও সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, তারা সুদানের লড়াইয়ে কোনোভাবেই জড়িত নয়।
স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া ছবি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত বছরের অক্টোবর থেকে ওই এলাকায় কার্যক্রম ব্যাপক হারে বেড়েছে। ইথিওপিয়ার মেঞ্জ জেলা এলাকায় বন পরিষ্কার করে শত শত তাবু খাটানো হয়েছে। গত ২২ জানুয়ারির ছবিতে দেখা গেছে, ক্যাম্পের চারপাশে সারি সারি শিপিং কন্টেইনার রাখা হয়েছে এবং সেখানে ভারী ট্রাকের ব্যাপক চলাচল রয়েছে। প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা ‘জেনস’ -এর মতে, ক্যাম্পটির আয়তন এবং তাঁবুর সংখ্যা দেখে বোঝা যায় যে এখানে কয়েক হাজার যোদ্ধা অনায়াসে দীর্ঘ সময় অবস্থান করতে পারে।
এদিকে, এ গোপন ক্যাম্পের পাশেই অবস্থিত আসোসা বিমানবন্দরের ব্যাপক উন্নয়ন কাজ শুরু হয়েছে। স্যাটেলাইট চিত্রে সেখানে নতুন হ্যাঙ্গার এবং ড্রোনের গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশন দেখা গেছে। ইথিওপিয়া দাবি করেছে, জাতীয় নিরাপত্তা ও বিশেষ করে ‘গ্র্যান্ড ইথিওপিয়ান রেনেসাঁ ড্যাম’ বা গ্র্যান্ড ড্যাম রক্ষার জন্য তারা এই বিমানবন্দরটি আধুনিকায়ন করছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ বিমানবন্দরটি মূলত আরএসএফ যোদ্ধাদের কাছে অস্ত্র ও রসদ পৌঁছে দেয়ার একটি গোপন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ নেয়া যোদ্ধাদের মধ্যে কেবল সুদানি নাগরিক নয়, ইথিওপিয়া ও দক্ষিণ সুদানের কিছু নাগরিকও রয়েছে। প্রশিক্ষণ শেষে শত শত যোদ্ধাকে এরই মধ্যে ট্রাকের কনভয়ে করে সুদানের ব্লু-নাইল বা নীল নদ প্রদেশের সীমান্তের দিকে যেতে দেখা গেছে। ইথিওপিয়ার প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান জেনারেল গেটাচিউ গুডিনা পুরো প্রকল্পটি দেখাশোনা করছেন বলে জানা গেছে।
২০২৩ সালের এপ্রিলে সুদানের সেনাবাহিনী ও আরএসএফের মধ্যে শুরু হওয়া এই লড়াই এখন একটি ভয়াবহ আঞ্চলিক সংকটে রূপ নিয়েছে। যুদ্ধে এখন পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে এবং ১ কোটিরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোতে আশ্রয় নিয়েছে। এখন ইথিওপিয়ার মতো শক্তিশালী প্রতিবেশীর এই সম্পৃক্ততা আফ্রিকার হর্ন অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদী অস্থিরতা এবং নতুন করে প্রক্সি বা ছায়া যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি করেছে। ইথিওপিয়া সরকার বা আরএসএফের পক্ষ থেকে রয়টার্সের প্রতিবেদনের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি।