সৌদি রাজনীতিতে বর্তমান বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ আল সৌদের পুত্র মোহাম্মদ বিন সালমান (এমবিএস) এর উত্থানের পর থেকে নানা সংকটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ। এমবিএসের উত্থানকালে রাজ পরিবারে স্মরণকালের সবেচেয়ে বড় ধরপাকড় চলে। একই সময়ে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দী ইরানের সাথে উত্তেজনা বৃদ্ধি, ব্যর্থ কাতার ব্লক, ইয়েমেন যুদ্ধ ও অতিমাত্রায় মার্কিন-ইসরাইল বলয়ে ঝুঁকে যাওয়া নিয়ে ঘরে বাইরে বিতর্কের মুখে পড়ে সৌদি রাজ পরিবার। আধুনিক মনস্ক তরুণ বলে নিজেকে তুলে ধরতে চাইলেও সাংবাদিক জামাল খাসোগী হত্যাকান্ড, মার্কিন ধনকুব ও ওয়াশিংটন পোস্টের মালিক জেফ বেসোচের মোবাইল হ্যাকড বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান।
তবে
এবার রাজনীতির পর সংকটের মুখে
পড়তে যাচ্ছে সৌদি অর্থনীতি। করোনা ভাইরাস প্রকোপের কারণে এমনিতেই তেলের চাহিদা নিম্নমুখী। এরই মধ্যে জ্বালানি তেলের
দর নিয়ে গতমাসে ওপেক ও রাশিয়ার সাথে
সমঝোতা বৈঠক ব্যর্থ হয়। বৈঠকের
পর সৌদি আরব তেলের দাম ১০% কমিয়ে দেয়। বাজার নিয়ন্ত্রণে শীর্ষ তেল রফতানিকারক দেশ সৌদি আরব ও রাশিয়ার মধ্যে
দাম কমানোর প্রতিযোগিতা শুরু হয়। ফলে গতমাসে ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের পর সর্বনিম্ন দরে
চলে আসে তেলের দাম। ব্যারেল প্রতি জ্বালানি তেলের দাম দাঁড়ায় ২৭ ডলারে। রাশিয়াও
দর কমালে সৌদি যুবরাজ রাশিয়ান প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সাথে ‘হটটক’ এ জড়িয়ে পড়েন।
এরই মধ্যে রাশিয়ার উপর চাপ বাড়ানো ও মার্কেট শেয়ার
বাড়ানোর লক্ষ্যে মার্চের পর আরেক দফায়
ব্যারেল প্রতি ৬-৮ ডলার
দাম কমিয়ে দিয়েছে সৌদি আরব। অসম প্রতিযোগিতার ফলে বর্তমানে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কমে এসেছে প্রায় ২০ ডলারের নিচে।
রাশিয়ার অর্থনীতি তেলনির্ভর নয়। তাছাড়া রাশিয়া প্রতি ব্যারেল তেলের মূল্য ৪০ ডলার ধরে বাজেট তৈরী করে। অন্যদিকে উপসাগরীয় দেশ সমূহে ব্যারেল প্রতি বাজেট ধরতে হয় ৭০ ডলার। সৌদি আরবের রফতানী আয়ের ৭০% আসে তেল ও গ্যাস থেকে। ফলে বাজেট যোগান দিতে হিমমিশ খেতে হবে সৌদি আরবকে। এছাড়া লকডাউনে বড় ধরনের একটি প্রণোদনা দিতে হচ্ছে সরকারকে। ইতিমধ্যে লকডাউন পরিস্থিতির কারণে রাষ্ট্র সবার ৬০% বেতন ভাতা পরিশোধ করার প্রতিশ্রুতি দিলেও বিভিন্ন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা যথাযথ সরকারী সহযোগিতা পাচ্ছে না বলে মিডল ইস্ট আই সংবাদ প্রকাশ করেছে।
সৌদি আরবের অন্যতম বড় আয়ের পথ ওমরা- হজ্জ্বও এবছর বন্ধ থাকছে কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে। মিডল ইস্ট আই বলছে, এই বছরে অন্তত ১ কোটি মানুষ সৌদি আরবে ধর্মীয় উদ্দেশ্যে যেতেন। ওমরা ও হজ্জ্ব থেকে চলতি বছরে আয় হওয়ার সম্ভাবনা ছিল প্রায় ৮০০ কোটি ডলার। ফলে সবদিকের আয় কমে ঋণগ্রস্ত দেশে পরিণত হতে যাচ্ছে সৌদি আরব। আইএমএফ এর দেওয়া তথ্য মতে, এই বছরে সৌদি আরবের ঋণ মোট জিডিপির ১৯% এ পৌঁছাবে। ২০২০ সালে গিয়ে তা দাঁড়াবে ৫০% এ। তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৫০-৫৫ ডলারে নামলে ২০২৪ সাল নাগাদ সৌদির বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ মাত্র ৫ মাসের আমদানী ব্যয়ের সমান হয়ে দাঁড়াবে বলে দাবী এই সংস্থাটির। কিন্তু এখন যে পানির ধরে তেলের দাম তার হিসাব করলে আরও দ্রুত ফুরাবে সৌদি রিজার্ভ। নতুন বাদশাহ সালমান ২০১৫ সালে যখন দায়িত্ব নেন
তখন দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৭৩২ বিলিয়ন ডলার। বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৪৯৯ বিলিয়ন ডলারে। এছাড়া বিশ্বব্যাংকের হিসাব মতে ২০১২ সালে যেখানে সৌদি আরবের মাথাপিছু আয় ছিল ২৫ হাজার ডলার বর্তমানে তা ২৩ হাজার ডলারে ঠেকেছে। এসব চিত্র বলছে ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে সৌদি অর্থনীতি। শুধু রিজার্ভ নয় সৌদি পিআইএফ বা সার্বভৌম বিনিয়োগ তহবিল এর পরিমাণও কমে আমিরাত,কাতার,কুয়েতের চেয়ে ছোট হয়ে এসেছে। সৌদি অর্থনীতির আরেকটি বড় সংকট হচ্ছে দুর্নীতি বিরোধী অভিযানের নামে অনেক প্রিন্স ও ধনাট্য ব্যবসায়ীর ব্যবসা বন্ধ করেছেন এমবিএস। অর্থনীতিতে বৈচিত্র আনয়নের চেষ্টায় উদ্যোগ নিলেও জামাল খাসোগী হত্যাকান্ড কেলেঙ্কারীতে যুবরাজের অর্থনৈতিক সম্মেলনে তেমন সাড়া মেলেনি। ফলে বেসরকারী খাতও সংকুচিত হয়েছে।
সৌদি আরবের অর্থনীতি দুর্বল হয়ে যাওয়া ও রিজার্ভ কমে যাওয়ার জন্য অন্যতম কারণ সামরিক ব্যয় বাড়ানো। এমবিএস একদিকে সৌদি অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার কথা বলে অন্যদিকে ব্যয়বহুল ইয়েমেন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। হঠকারী ইয়েমেন যুদ্ধে সৌদি আরব কোন অর্জন নেই। বরং তৈরী করেছে বিশে^র সবচেয়ে বড় মানবিক বিপর্যয়। সীমান্তের পাশে এসে গেছে আগ্রাসী অস্ত্রধারী শত্রু। ইয়েমেন যুদ্ধ, ইরান ও কাতারের সাথে উত্তেজনার মধ্যে অস্ত্রের মজুদ বাড়িয়েছে সৌদি আরব। ফলে কমেছে বৈদেশিক রিজার্ভ। স্টকহোম ভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট মতে, গত পাঁচ বছরে সৌদি আরব অস্ত্র আমদানি বাড়িয়েছে ২২৫ শতাংশ। সংস্থাটি বলছে গত ২০১৫-২০১৯ সালে বিশে^র মোট অস্ত্র আমদানির ৩৫% হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে। আমেরিকার ইন্ধনে সৌদি আরব অস্ত্র আমদানিতে বিশে^র দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশে পরিণত হয়। ২০১৭ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সৌদি সফরেই সৌদি আরব মার্কিন মুলুক থেকে ১১ হাজার কোটি ডলারের (বাংলাদেশী টাকায় প্রায় ৯ লাখ কোটি টাকা) অস্ত্র আমদানির চুক্তি করে দেশটি। এতবড় অস্ত্র চুক্তির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন করলে তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন বলেছিলেন, ইরানকে ভয়ে রাখতে সৌদি আরবের অস্ত্র কেনা প্রয়োজন। উল্লেখ্য গত পাঁচ বছরে সৌদি মোট অস্ত্র আমদানির ৭৩% আসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে।
এসব বাস্তবতায় তেল ও গ্যাস রফতানি নির্ভর সৌদি অর্থনীতিতে তৈরী হতে পারে বড় ধরনের ঋণ। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়া, তেল রাজনীতি ও অর্থনীতি অগুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠার ফলে সৌদি প্রভাবও কমে আসতে পারে মধ্যপ্রাচ্যে। সৌাদ আরবে নতুন যুবরাজ সালমানের নানা বিতর্কিত কর্মকান্ডের ফলে বহির্বিশে^ তার ভাবমূর্তিও ম্লান হয়ে উঠছে। এছাড়া করোনা পরবর্তী বিশ্ব লড়াইয়ে নিজেকে সামাল দিতে না পারলে বিশ্ব রাজনীতিতেও গুরুত্ব কমে আসবে সৌদি আরবের।
সৌদি অর্থনীতি সংকটে পড়লে তা শুধু সৌদি আরবে সীমাবদ্ধ থাকবে না। সৌদি আরবে কর্মরত আছে মিশর, সুদান, জর্ডান, বাংলাদেশ, ভারত ও পকিস্তানের অসংখ্য শ্রমিক। ফলে মুখ থুবড়ে পড়তে পারে মধ্যপ্রাচ্য থেকে বাংলাদেশে আসা রেমিট্যান্স আয়। অন্যদিকে বাংলাদেশে সৌদি প্রতিশ্রুত ৩০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগও আটকে যেতে পারে।
লেখক : শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।