গাজায় যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের মধ্যেই হতে যাচ্ছে শান্তি পর্ষদের প্রথম সম্মেলন

গত বছরের নভেম্বরে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ভোটের পর থেকেই এই পর্ষদ নিয়ে অস্বস্তি বিরাজ করছে। অনেকে ট্রাম্পের ক্ষমতাবলে শান্তি পর্ষদের গঠনের বিষয়কে জাতিসংঘের বিকল্প তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন।

গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওয়াশিংটনে তার ‘বোর্ড অব পিস’ বা শান্তি পর্ষদের প্রথম সম্মেলন করতে যাচ্ছেন। বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) হতে যাওয়া সম্মেলনের মাধ্যমে পর্ষদ নিয়ে সব ধোঁয়াশা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব বলে মনে করছেন ট্রাম্প। খবর আল জাজিরা।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনা অনুমোদনের প্রায় তিন মাস পর এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। পরিকল্পনায় যুদ্ধবিধ্বস্ত ফিলিস্তিনের পুনর্গঠন তদারকি এবং ‘ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স’ গঠনের জন্য শান্তি পর্ষদকে দুই বছরের জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়।

গত বছরের নভেম্বরে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ভোটের পর থেকেই এই পর্ষদ নিয়ে অস্বস্তি বিরাজ করছে। অনেকে ট্রাম্পের ক্ষমতাবলে শান্তি পর্ষদের গঠনের বিষয়কে জাতিসংঘের বিকল্প তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন।

এমনকি যারা সদস্য হিসেবে স্বাক্ষর করেছে, তারাও গাজায় পরিবর্তন আনা নিয়ে এই পর্ষদের সক্ষমতা নিয়ে সন্দিহান। এর মধ্যে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইসরায়েলের এই পর্ষদে যোগদান যেন উদ্বেগের মাত্রা অনেকাংশে বাড়িয়ে দিয়েছে। আবার এখন পর্যন্ত পর্ষদে ফিলিস্তিনের কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই।

ওয়াশিংটনে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন কর্মসূচির প্রধান ইউসেফ মুনায়ার আল জাজিরাকে বলেন, যারা গাজার ফিলিস্তিনিদের জীবনমান উন্নয়ন করতে চান, তাদের জন্য বর্তমানে এই শান্তি পর্ষদ একমাত্র পথ। তবে একইভাবে এটি ট্রাম্পের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। ফলে চলমান সংকটের দীর্ঘস্থায়ী সমাধানের ক্ষেত্রে এই পর্ষদটির স্থায়িত্ব গুরুতর সন্দেহ জাগছে ।

তিনি মনে করেন, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় সুযোগ হলো তাৎক্ষণিক প্রয়োজনগুলোকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখা। এর মধ্যে রয়েছে স্বাস্থ্য অবকাঠামো, চলাফেরার স্বাধীনতা, মানুষের জন্য আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা এবং যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অবসান ঘটানো।

অন্যদিকে, গাজাকে মধ্যপ্রাচ্যের পর্যটন কেন্দ্র বানানোর স্বপ্ন দেখা ট্রাম্প বৈঠকের আগে ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েছেন। রবিবার তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালের এক পোস্টে এই পর্ষদের অসীম সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে বলেন। তার আশা, এটি ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সংস্থা হিসেবে বিবেচিত হবে।

ট্রাম্প বলেন, গাজার পুনর্গঠন প্রচেষ্টায় ৫০০ কোটি ডলারের তহবিলের প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করা হবে। সদস্য রাষ্ট্রগুলো গাজাবাসীর নিরাপত্তা ও শান্তি বজায় রাখতে ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স ও স্থানীয় পুলিশ বাহিনীতে কর্মী নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

এদিকে, ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার জানুয়ারিতে গাজা নিয়ে ওয়াশিংটনের মহাপরিকল্পনার রূপরেখা প্রকাশ করেন। গাজার ফিলিস্তিনিদের কোনো মতামত ছাড়াই তৈরি এই পরিকল্পনা প্রকাশ করা হয়। সেখানে আবাসিক ভবন, সমুদ্রতীরবর্তী রিসোর্ট, পার্ক গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। এতে মূলত গাজার বর্তমান নগর কাঠামোই বিলীন হয়ে যাবে।

কুশনার বলেছিলেন, হামাসের পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ এবং ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর প্রত্যাহারের পর এটি শুরু হবে। তবে এই প্রকল্পের অর্থায়ন কীভাবে হবে তা এখনও স্পষ্ট নয়।

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন বিশাল পরিকল্পনার স্বপ্ন দেখলেও, স্বাক্ষরকারী ২৫টি সদস্য দেশ ও পর্যবেক্ষক দেশগুলোর সঙ্গে বৈঠকে বসার সময় তাদের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে। তাই পর্ষদের কার্যকারিতা প্রমাণের জন্যে ইসরায়েলের ওপর একতরফা চাপ প্রয়োগ করতে পারে যুক্তরাষ্ট্র।

এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কিছু দেশ স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, তারা এমন কোনো পুনর্গঠনে অর্থায়ন করবে না যা কয়েক বছরের মধ্যে আবারও ধ্বংস হয়ে যাবে।’

অনেকে বলছেন, পর্ষদের উদ্বোধনী সম্মেলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হবে যুদ্ধবিরতি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। কারণ যুদ্ধবিরতির মধ্যেও গাজায় থামছে না ইসরায়েলি আগ্রাসন। তাই গাজায় স্থিতিশীলতা আনা ছাড়া ট্রাম্পের শান্তি পর্ষদ অর্থবহ ভূমিকা রাখতে পারবে না। আর সেই স্থিতিশীলতার জন্য যুদ্ধবিরতি মেনে চলা প্রয়োজন।

এদিকে শান্তি পর্ষদের বিশাল কর্মপরিধি নিয়ে বিশেষজ্ঞরা খুঁটিয়ে দেখছেন। সেখানে পর্ষদ থেকে আমন্ত্রিত দেশগুলোকে পাঠানো সনদে গাজার কথা সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি। উল্টো শান্তি প্রতিষ্ঠায় তথাকথিত প্রক্রিয়া ও পরিকল্পনা নিয়ে সমালোচনা করা হয়েছে। সনদে বলা হয়েছে, বিদ্যমান পদ্ধতিগুলো দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা থেকে উত্তরণের ব্যবস্থা করে না, বরং চলমান সংকটকে জিইয়ে রাখে।

সমালোচকরা পর্ষদের প্রধান হিসেবে ট্রাম্পের অনির্দিষ্টকালের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তারা বলছেন, এটি জাতিসংঘের মতো সংস্থাগুলোর বহুপাক্ষিকতার নীতিকে ক্ষুণ্ন করে।

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প যদি তার স্বেচ্ছাতারিতা না দেখিয়ে বরং নমনীয় থাকেন এবং গাজার মানবিক সংকট নিরসনে সবার বক্তব্য শোনেন, তবে এই পর্ষদ একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক কাঠামো গড়তে ভূমিকা রাখবে।

আরও