মাত্র দুই দশকের ব্যবধানে বিশ্ব রাজনীতির ব্যাকরণ কতটা বদলে যেতে পারে, তার এক চরম দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি। ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের পরিকল্পনা যখন সাজিয়েছিলেন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ, তখন তাকে নিজ দেশে এবং আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র বাদানুবাদ ও প্রবল বিরোধিতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। কিন্তু আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ইরানের বিরুদ্ধে তার চেয়েও বড় এবং সম্ভাব্য ভয়াবহ এক ‘প্রি-এম্পটিভ’ বা আগাম যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখন বিশ্বজুড়ে এক রহস্যময় ও গভীর নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। আটলান্টিকের দুই পাড়েই এখন প্রতিবাদের কোনো জোরালো কণ্ঠস্বর নেই।
স্মৃতির পাতায় ফিরে তাকালে দেখা যায়, ২৩ বছর আগে বুশ প্রশাসনকে তাদের প্রতিটি সামরিক পদক্ষেপের জন্য জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে রাশিয়ার পাশাপাশি নিজেদের প্রধান মিত্রদের কাছেও জবাবদিহি করতে হয়েছিল। ফ্রান্সের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডমিনিক দ্য ভিলপ্যাঁ তখন প্রকাশ্যেই বলেছিলেন, বিশ্ববিবেক ও আন্তর্জাতিক আইনের পাহারাদার হিসেবে শান্তি স্থাপনই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য। কিন্তু আজকের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। ট্রাম্প প্রশাসন জাতিসংঘকে কোনো ‘পবিত্র স্থান’ নয়, বরং এক প্রকার পরিত্যক্ত প্রতিষ্ঠানের মতো বিবেচনা করছে। ট্রাম্প সরাসরি ঘোষণা করেছেন যে, তার কোনো আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োজন নেই এবং তিনি জাতিসংঘের বিকল্প হিসেবে নিজেই ‘বোর্ড অব পিস’ গঠন করেছেন— যার আজীবন চেয়ারম্যান তিনি নিজেই। এই একচ্ছত্র আধিপত্যই বিশ্বজুড়ে এক ধরনের ভীতি ও জড়তা তৈরি করেছে।
ইউরোপীয় দেশগুলো বর্তমানে রয়েছে এক অদ্ভুত ‘স্নেকবাইট’ বা সাপে কামড়ানো আতঙ্কের মধ্যে। গ্রিনল্যান্ড দখল কিংবা ইউক্রেন থেকে সমর্থন প্রত্যাহারের মতো ট্রাম্পের একের পর এক অভাবনীয় হুমকিতে ইউরোপীয় নেতারা এখন এতটাই কোণঠাসা যে, ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন রণসজ্জা নিয়ে তারা টু শব্দ করতেও সাহস পাচ্ছেন না। ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক চার্লস কুপচানের মতে, ইউরোপীয়রা এখন ওয়াশিংটনের সঙ্গে আর কোনো নতুন ‘মল্লযুদ্ধে’ জড়াতে চায় না। ২০০৩ সালে যেখানে ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা ছিল, এখন সেখানে তথ্যের আদান-প্রদান নেই বললেই চলে। ট্রাম্প কী করতে যাচ্ছেন, তার বিন্দুমাত্র ধারণাও মিত্রদের দেয়া হচ্ছে না, আর তারাও ভয়ে কোনো প্রশ্ন তুলছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও প্রতিবাদের ভাষা এখন অত্যন্ত ক্ষীণ। মধ্যবর্তী নির্বাচনের আর মাত্র আট মাস বাকি থাকলেও ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পের এই সামরিক প্রস্তুতির আইনি বৈধতা নিয়ে জোরালো কোনো চ্যালেঞ্জ ছুড়তে পারছেন না। এমনকি এলিজাবেথ ওয়ারেনের মতো কট্টর শান্তিবাদী হিসেবে পরিচিত নেতারাও সম্প্রতি স্টেট অব দ্য ইউনিয়নে ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের আগ্রাসী বক্তব্য চলাকালে দাঁড়িয়ে হাততালি দিয়েছেন। সিনেটররা তথ্যের অভাব নিয়ে মৃদু অভিযোগ করলেও, যুদ্ধের পরিকল্পনা নস্যাৎ করার মতো কোনো শক্ত পদক্ষেপ ডেমোক্র্যাট শিবিরের পক্ষ থেকে দেখা যাচ্ছে না। ২০ বছর আগে জো বাইডেন যেখানে বুশ প্রশাসনকে ঠেকানোর জন্য মরিয়া চেষ্টা করেছিলেন, আজকের ডেমোক্র্যাটরা যেন সেখানে কেবল দর্শক হয়ে বসে আছেন।
বর্তমান পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে এখন একাধারে বিচারক, জুরি এবং জল্লাদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। গত এক বছরে ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্রে হামলা থেকে শুরু করে ভেনিজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে বন্দি করার অভিযান—সবকিছুই ট্রাম্প করেছেন একতরফাভাবে। প্রায় সিকি শতাব্দীর এই ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধ’ বিশ্ববাসীকে হয়তো এমন এক মানসিকতায় অভ্যস্ত করে ফেলেছে যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট যা খুশি করতে পারেন এবং তার জন্য কারো অনুমতির প্রয়োজন নেই। একসময়ের আন্তর্জাতিক আইন আর মিত্রদের সম্মিলিত শক্তির যে প্রভাব ছিল, তা আজ ট্রাম্পের একক ক্ষমতার জোয়ারে ধুয়ে মুছে গেছে। এই মৌনতা কি কোনো আসন্ন মহাপ্রলয়ের সংকেত, নাকি এক নতুন বিশ্বব্যবস্থার আত্মসমর্পণ—সেই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।