এ বছরের সবচেয়ে শক্তিশালী গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড় 'রাগাসা' বুধবার (২৪ সেপ্টেম্বর) চীনের দক্ষিণাঞ্চলের কোটি কোটি মানুষের দিকে ধেয়ে যাওয়ার আগে তাণ্ডব চালায় তাইওয়ানে। ঘূর্ণিঝড়টি তাইওয়ানে অন্তত ১৪ জনের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। নিখোঁজ হয়েছে বহু মানুষ। এর প্রভাবে হংকংয়েও প্রবল বাতাস ও ভারি বৃষ্টিপাত হয়েছে।
তাইওয়ানের পূর্বাঞ্চলীয় হুয়ালিয়েন কাউন্টিতে এই হতাহতের ঘটনাগুলোর মধ্যে একটি বড় কারণ ছিল 'ব্যারিয়ার লেক' ফেটে জলোচ্ছ্বাস। তাইওয়ানের ফায়ার ডিপার্টমেন্ট জানিয়েছে, ঘূর্ণিঝড় রাগাসায় সৃষ্ট ভারি বৃষ্টিপাতের কারণে একটি ব্যারিয়ার লেক উপচে জলরাশি একটি শহরের দিকে ছুটে যায়। এতে নিখোঁজ হন বহু মানুষ।
তাইওয়ানের পূর্বাঞ্চলীয় হুয়ালিয়েন কাউন্টিতে পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসে একটি উপত্যকা আটকে গিয়ে তৈরি হয়েছিল বাঁধসদৃশ একটি হ্রদ, যাকে ব্যারিয়ার লেক বলা হয়। জুলাই মাসে প্রথম স্যাটেলাইট চিত্রে হ্রদটির অস্তিত্ব ধরা পড়ে। স্বাভাবিকভাবে কোনো নদী বা উপত্যকা জুড়ে যখন পাথর, ভূমিধসের ধ্বংসাবশেষ বা অন্যান্য প্রাকৃতিক বাধা একটি বাঁধের মতো তৈরি করে জলপ্রবাহকে আটকে দেয়, তখনই ব্যারিয়ার লেকের সৃষ্টি হয়। এই হ্রদটি মাটাই'আন ক্রিক-এর একটি উপনদীর ওপর গুয়াংফু শহরের উপরে পর্বতের একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত ছিল।
প্ল্যানেট ল্যাবসের স্যাটেলাইট চিত্রের রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, হ্রদটি ১৭ জুলাই থেকে ২৫ জুলাইয়ের মধ্যে গঠিত হতে শুরু করে। ২৫ জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে হ্রদটির পৃষ্ঠের ক্ষেত্রফল প্রায় পাঁচ গুণ বৃদ্ধি পায়। স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে রয়টার্স জানিয়েছে, সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে হ্রদটি ০.৯২ বর্গ কিলোমিটার আয়তনে পৌঁছেছিল।
ছবি- রয়টার্স
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, হ্রদের পাড়ের প্রাকৃতিক বাঁধের উচ্চতা ছিল প্রায় ১২০ মিটার। পানির আয়তন ৫০০ মিটার লম্বা ও ১,৬৫০ মিটার চওড়া এলাকায় বিস্তৃত ছিল। সর্বমোট প্রায় ৯১ মিলিয়ন টন পানি জমে ছিল সেখানে—যা ৩৬ হাজার অলিম্পিক সুইমিং পুল পূর্ণ করার মতো। অতিবৃষ্টিতে বাঁধ উপচে পড়লে একসঙ্গে প্রায় ৬০ মিলিয়ন টন পানি নেমে আসে নিচে। হ্রদটি ফেটে যাওয়ার পর এর আকার প্রায় ৭৫ শতাংশ কমে যায়।
গুয়াংফুর পোস্টম্যান হসিহ চিয়েন-তুং বলেন, জলরাশি ‘সুনামির’ মতো আঘাত হেনেছিল। তিনি অল্পের জন্য পোস্ট অফিসের দ্বিতীয় তলায় পালাতে সক্ষম হন। পরে বাড়ি ফিরে তিনি দেখেন যে তার গাড়ি ভেসে তার বসার ঘরে চলে এসেছে।
গত সপ্তাহে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের উপর ঘূর্ণিঝড় 'রাগাসা'র সৃষ্টি হয়। উষ্ণ সমুদ্র এবং অনুকূল বায়ুমণ্ডলীয় পরিস্থিতির কারণে এটি দ্রুত শক্তি সঞ্চয় করে এবং সোমবার এটি ক্যাটাগরি ৫ সুপার টাইফুন-এ পরিণত হয়, যেখানে বাতাসের গতিবেগ ছিল ২৬০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টার (১৬২ মাইল প্রতি ঘণ্টা) বেশি।
তাইওয়ানের পার্বত্য অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড় রাগাসা প্রবল বৃষ্টিপাত ঘটিয়েছে বলে স্যাটেলাইট বিশ্লেষণ থেকে জানা যায়। এই হ্রদটি যে দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে অবস্থিত ছিল, তার কারণে এর জলের স্তর কমানো বা ধ্বংসাবশেষ সরানোর জন্য কর্তৃপক্ষের প্রচেষ্টা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তাইওয়ানের গত ২৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় ৭.২ মাত্রার ভূমিকম্প গত বছর এই অঞ্চলে আঘাত হানার পর হুয়ালিয়েনের কিছু অংশে এখনো পাহাড়ের মাটি দুর্বল ও অস্থিতিশীল রয়েছে।