রাখাইন সমীকরণ

চীন বাংলাদেশ ভারত যেভাবে নতুন করে মিয়ানমারের ভবিষ্যৎ লিখছে

আরাকান আর্মি এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যা মিয়ানমারের ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। জাতিগত স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে গড়ে ওঠা একটি সশস্ত্র বিদ্রোহী সংগঠন থেকে তারা এখন রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে অগ্রসর একটি রাজনৈতিক-সামরিক শক্তিতে রূপ নিয়েছে।

তাদের এ উচ্চাকাঙ্ক্ষা মিয়ানমারের রাজনৈতিক মানচিত্রকে পুনর্গঠনের সক্ষমতা রাখে। বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী অঞ্চলটি ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয় আরাকান আর্মি। এর পর থেকে কার্যকর আরাকান পিপলস রেভল্যুশনারি গভর্নমেন্ট (এপিআরজি) প্রতিষ্ঠা এবং চিন ও কাচিন রাজ্য ছাড়াও মাগওয়ে, সাগাইং, আয়েয়ারওয়াদি ও বাগো অঞ্চলে সামরিক অভিযান সম্প্রসারণের মাধ্যমে আরাকান আর্মি আর কেবল একটি বিদ্রোহী সংগঠন নয়; বরং কার্যত একটি সার্বভৌম রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে।

আগামী এক দশকে মিয়ানমারের রূপান্তর অবশ্য শুধু আরাকান আর্মিকে ঘিরে আবর্তিত হবে না। এ সময়ে চীন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা কীভাবে আরাকান আর্মির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে সেটা স্পষ্ট হবে। কনফেডারেশন প্রতিষ্ঠার যে স্বপ্ন আরাকান আর্মি লালন করছে, তা কোনো বিচ্ছিন্ন বাস্তবতায় সফল হতে পারবে না। এটি নির্ভর করছে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বিদ্যমান সূক্ষ্ম শক্তির ভারসাম্যের ওপর। ফলে এটি আর কেবল মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধের সমীকরণ নয়; বরং একটি আঞ্চলিক দাবার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে, যেখানে রোহিঙ্গা সংকট সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত হাতিয়ার।

কেবল একটি সামরিক গ্রুপ থেকে আরাকান আর্মির কার্যকর শাসন ব্যবস্থা পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের গল্পটি বিরল ঘটনা। ২০২৫ সালের শুরুর দিকেই বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে আসে যে আরাকান আর্মি তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় স্থানীয় প্রশাসন গড়ে তুলেছে, কর আহরণ এবং নিজস্ব বিচার ব্যবস্থাও পরিচালনা করছে। এ রূপান্তরের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো নিজেদের ব্যাংকিং ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ, যার মাধ্যমে তারা জান্তা সরকারের কিয়াতনির্ভর আর্থিক কাঠামো থেকে বেরিয়ে আসতে চেষ্টা করছে। এ উদ্যোগ অনেকটা ইউনাইটেড ওয়া স্টেট আর্মির মডেলের প্রতিফলন। তবে আরাকান আর্মিকে আরো কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। কারণ তাদের আয়ের বড় একটি অংশ এখনো চোরাচালান ও মাদক পাচারের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

আরাকান আর্মি চলতি মাসের শুরুতে স্থানীয়ভাবে ‘লাওং পাও’ নামে পরিচিত লটারি চালু করেছে। এ উদ্যোগকে তাদের অর্থনৈতিক কৌশলের এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা বলা যায়। এটি কোনো সাধারণ তহবিল সংগ্রহের উদ্যোগ নয়; বরং রাষ্ট্রীয় রাজস্ব আহরণের একটি ব্যবস্থা। রাখাইনের ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত প্রথম ড্রয়ে কিয়াউকতাউ এলাকার এক বাসিন্দা প্রথম পুরস্কার হিসেবে ৫ কোটি কিয়াত পেয়েছেন। দ্বিতীয় ও তৃতীয় পুরস্কারের অর্থমূল্য ছিল যথাক্রমে ৩ কোটি ও ২ কোটি কিয়াত। এছাড়া ৫০ লাখ থেকে শুরু করে ৫ লাখ কিয়াত পর্যন্ত আরো কয়েক ডজন পুরস্কার দেয়া হয়। পুরস্কারের এ বিপুল অংক থেকে বোঝা যায়, আরাকান আর্মি স্থানীয় অর্থনীতিতে বিদ্যমান উল্লেখযোগ্য তারল্য নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছে। লটারির আয় থেকে অর্ধেক অর্থ স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নে ব্যয় করার ঘোষণা দিয়ে আরাকান আর্মি কার্যত নিজেদের কল্যাণমূলক রাষ্ট্র ব্যবস্থার অর্থায়নের ভিত্তি তৈরি করছে। এ ব্যবস্থা বাইরের সহায়তা কিংবা অবৈধ বাণিজ্যের ওপর তাদের নির্ভরতা কমাতে পারে।

একই সঙ্গে বৈধ পরিচয়পত্র ও পারিবারিক নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা এবং অপরাধীদের পুরস্কার না দেয়ার হুঁশিয়ারির মাধ্যমে আরাকান আর্মি (এএ) বিচারিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। লটারি-সংক্রান্ত যেকোনো বিরোধ এএর আদালতেই নিষ্পত্তি হবে—এমন ঘোষণাও রাখাইনে তাদের একক আইনি কর্তৃত্বকে সুদৃঢ় করেছে। এত বড় পরিসরের একটি লটারি আয়োজন আন্তর্জাতিক মহলের কাছেও একটি বার্তা বহন করে—এএ শুধু আর গেরিলা বাহিনী নয়, বৃহৎ পরিসরে জনগণের অর্থ ব্যবস্থাপনায় সক্ষম একটি পরিণত প্রশাসনিক কাঠামো হয়ে উঠেছে।

এ ধরনের আর্থিক উদ্যোগের পাশাপাশি এপিআরজি স্থানীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পেশাজীবীদের নিয়োগ দিচ্ছে। জান্তা সরকারের ওপর নির্ভরতা কমানো, আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার মাধ্যমে যুদ্ধ পরিচালনার অর্থায়ন নিশ্চিত করা এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে নিজেদের একটি বিশ্বাসযোগ্য প্রশাসনিক অংশীদার হিসেবে তুলে ধরার জন্য এ পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এদিকে মধ্যাঞ্চলে স্টিয়ারিং কাউন্সিল ফর দি এমার্জেন্স অব আ ফেডারেল ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নের সঙ্গে সমন্বয় করে সামরিক অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত এএর কৌশলগত অবস্থানে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। মাগওয়ে, সাগাইং, আয়েয়ারওয়াদি ও বাগো অঞ্চলে অভিযান বিস্তারের পাশাপাশি চিন ও কাচিন রাজ্যেও লড়াইয়ের মাধ্যমে এএ দেখিয়ে দিচ্ছে, তারা শুধু রাখাইনভিত্তিক একটি সংগঠন নয়, বরং জাতীয় পর্যায়ের বিপ্লবী জোটের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। জান্তা সরকার এখন পশ্চিমে এএ এবং মধ্যাঞ্চলে পিপলস ডিফেন্স ফোর্সেসের (পিডিএফ) মধ্যে কার্যত চাপে পড়ে কৌশলগত অচলাবস্থার মুখে রয়েছে।

আরাকান আর্মির সর্বাধিনায়ক তোয়ান মারত নাইং ধারাবাহিকভাবে সার্বভৌমত্ব ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের কথা বললেও স্বাধীন রাখাইন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি স্পষ্টভাবে উত্থাপন করেননি। বরং তার লক্ষ্য যেন এমন একটি কনফেডারেল ইউনিয়ন, যেখানে রাখাইনের নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর তাদের প্রায় পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখবে, কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে এটি একটি শিথিল কাঠামোর মিয়ানমার রাষ্ট্রের অংশ হিসেবেই থাকবে। এ কৌশল কূটনৈতিকভাবে বাস্তববাদী। এর মাধ্যমে কিয়াকফিউ বন্দরসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনা চালানোর সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি পূর্ণমাত্রার আন্তর্জাতিক অবরোধের ঝুঁকিও কমে যাবে। এভাবে আরাকান আর্মি নিজেদের বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তি হিসেবে নয়, বরং শান্তি প্রতিষ্ঠার সম্ভাব্য অংশীদার হিসেবে উপস্থাপন করতে সক্ষম হচ্ছে।

আরাকান আর্মির উত্থান মিয়ানমারকে ভারত ও চীনের কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার আরো গভীরে ঠেলে দিয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ এ প্রতিযোগিতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্য নির্ধারক রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো ভারত ও বাংলাদেশ এখনো আরাকান আর্মির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেনি। এর পরিবর্তে উভয় দেশই বাস্তববাদী বিবেচনায় অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগের পথ বেছে নিয়েছে। এমন ‘গ্রে জোন’ কূটনীতি ঢাকা ও নয়াদিল্লিকে একদিকে নিজেদের কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা করতে দিচ্ছে, অন্যদিকে মিয়ানমারের জান্তা সরকারের সঙ্গে প্রকাশ্য কূটনৈতিক সংকট কিংবা আন্তর্জাতিক রীতিনীতির লঙ্ঘনের ঝুঁকিও এড়িতে পারছে।

চীন এখনো আরাকান আর্মির সবচেয়ে বড় অস্ত্র সরবরাহকারী। বিশেষ করে রাখাইনে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে তাদের অন্যতম অর্থনৈতিক অংশীদার। বেইজিং এরই মধ্যে অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে আরাকান আর্মির সঙ্গে কাজ করছে, যা কার্যত তাদের স্থানীয় কর্তৃপক্ষ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ারই শামিল। প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে সম্ভবত একমাত্র চীনই আরাকান আর্মিকে রোহিঙ্গা সংকটের একটি সমাধানের দিকে এগোতে চাপ দিতে পারে। বেইজিং এএকে সতর্ক করতে পারে যে জাতিগত নিধনের মতো পরিস্থিতি সীমান্তে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করবে এবং তাদের বন্দরভিত্তিক কৌশলগত বিনিয়োগও ঝুঁকির মুখে ফেলবে। তবে রোহিঙ্গা প্রশ্নে চীন যদি অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করে তাহলে আরাকান আর্মির সঙ্গে তাদের দূরত্ব তৈরি হওয়ার ঝুঁকিও থাকবে। সেক্ষেত্রে এএ ভারত কিংবা পশ্চিমা দেশগুলোর দিকে ঝুঁকতে পারে, যা এ অঞ্চলে চীনের কৌশলগত অবস্থান দুর্বল করে দিতে পারে।

ভারতের কৌশলের মূল ভিত্তি সতর্ক বাস্তববাদ। আনুষ্ঠানিক দূতাবাস বা রাষ্ট্রদূত বিনিময়ের কোনো সম্পর্ক না থাকলেও নয়াদিল্লি নেপথ্য কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে আরাকান আর্মির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। মিজোরাম ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে কেন্দ্র করে গোয়েন্দা ও কূটনৈতিক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে ভারত কালাদান মাল্টি-মোডাল ট্রানজিট ট্রান্সপোর্ট প্রকল্পের নিরাপত্তা এবং অনানুষ্ঠানিক সীমান্ত বাণিজ্য নিয়ে এএর সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখছে। তবে আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে যদি গণহত্যার অভিযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে ভারত প্রকাশ্যে তাদের সমর্থন করতে পারবে না। কারণ এতে মুসলিম বিশ্ব এবং বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আবার চীনের একচ্ছত্র প্রভাবাধীন একটি স্থিতিশীল রাখাইনও ভারতের কৌশলগত স্বার্থের অনুকূল নয়। তাই অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ বজায় রেখে ভারত একদিকে কালাদান করিডোরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং প্রয়োজনীয় গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করতে পারছে, অন্যদিকে আরাকান আর্মিকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়ার বাধ্যবাধকতাও এড়িয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের অবস্থান এ ভূরাজনীতিতে আরো জটিল। দেশটি ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে। এ সংকট অর্থনৈতিক ও সামাজিক উভয় দিক থেকেই ঢাকার জন্য বোঝায় পরিণত হচ্ছে। এ বাস্তবতায় ঢাকা নীরব ও অনানুষ্ঠানিক কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে চীন ও আরাকান আর্মির সঙ্গে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে চীনের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে বাংলাদেশ এ বার্তাও দিচ্ছে যে যদি নয়াদিল্লি ও পশ্চিমা দেশগুলো প্রত্যাবাসনের কার্যকর সমাধান নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে বেইজিংয়ের ওপর নির্ভর করা ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো বিকল্প থাকবে না।

স্থল সীমান্তের প্রশ্নে বাংলাদেশের হাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত তাস রয়েছে। ঢাকা যদি সীমান্ত পুরোপুরি বন্ধ করে দেয় অথবা রোহিঙ্গাদের সীমান্তবর্তী বনাঞ্চলের দিকে ছড়িয়ে পড়তে দেয়, তাহলে এমন একটি মানবিক বিপর্যয় তৈরি হতে পারে, যা চীনের পক্ষে উপেক্ষা করা সম্ভব হবে না। বাংলাদেশের আশঙ্কা, আরাকান আর্মি যদি পুরো রাখাইনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রোহিঙ্গাদের অধিকার প্রশ্নে কোনো রাজনৈতিক সমাধান ছাড়া একটি বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রীয় কাঠামো প্রতিষ্ঠা করে, তাহলে রোহিঙ্গাদের স্থায়ীভাবে বাস্তুচ্যুত হওয়ার প্রক্রিয়া আরো ত্বরান্বিত হবে। সে কারণেই ঢাকা কার্যত বেইজিংকে এ বার্তা দিচ্ছে, যদি তারা কিয়াকফিউ বন্দরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায়, তাহলে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন অথবা তাদের জন্য গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক সমাধান নিশ্চিত করতে আরাকান আর্মির ওপর চাপ প্রয়োগ করতে হবে।

সামরিক ও রাজনৈতিক সাফল্য সত্ত্বেও আরাকান আর্মির কনফেডারেল রাষ্ট্র ব্যবস্থার ধারণার সামনে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে রোহিঙ্গা সংকট। মংডু ও বুথিডং এলাকায় রোহিঙ্গা বেসামরিক জনগণের বিরুদ্ধে হত্যা, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি এবং অন্যান্য গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে এএর নামে। ২০২৪ ও ২০২৫ সালের বিভিন্ন প্রতিবেদনে রোহিঙ্গা গ্রামে লক্ষ্যভিত্তিক হামলা, বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে ড্রোন ব্যবহার এবং গ্রাম ধ্বংসের অভিযোগ উঠে এসেছে। এসব ঘটনায় যুক্তরাজ্য, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও আঞ্চলিক কয়েকটি পক্ষও আরাকান আর্মির সমালোচনা করেছে।

এমন প্রেক্ষাপটে চীন, বাংলাদেশ ও ভারতের পারস্পরিক সম্পর্কই এখন আরাকান আর্মির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হয়ে উঠেছে। চীন যদি নিজেদের বন্দর ও কৌশলগত বিনিয়োগ সুরক্ষার স্বার্থে রোহিঙ্গা প্রশ্নে আরো অন্তর্ভুক্তিমূলক অবস্থান নিতে এএর ওপর চাপ সৃষ্টি করে তাহলে অনিচ্ছাকৃতভাবে তা বাস্তবায়ন করলেও সংগঠনটির আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে। আবার ভারত ও বাংলাদেশ যদি রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনকে অন্তর্ভুক্ত করে রাখাইনে একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠনের বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছতে পারে, তাহলে সেটি আরাকান আর্মির জন্য একটি কূটনৈতিক উত্তরণের পথ তৈরি করবে। সেক্ষেত্রে তারা দাবি করতে পারবে, প্রতিবেশী দেশগুলোর সহায়তায় সব জাতিগোষ্ঠীর জন্য একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক অঞ্চল গড়ে তোলা হচ্ছে। বিপরীতে যদি চীন ও ভারতের প্রতিযোগিতা আরো তীব্র হয়ে ওঠে কিংবা বাংলাদেশ নিজেকে প্রতারিত মনে করে সীমান্ত বন্ধ করে দেয়, তাহলে আরাকান আর্মি একটি ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের মধ্যে আটকে যেতে পারে। সে পরিস্থিতিতে তাদের কনফেডারেল রাষ্ট্র ব্যবস্থার স্বপ্নও ভেঙে পড়ার আশঙ্কা থাকবে।

স্বল্পমেয়াদে আরাকান আর্মি সম্ভবত রাখাইনে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরো সুসংহত করবে। তারা একটি কার্যকর প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোও গড়ে তুলবে। একই সময়ে সামরিক অচলাবস্থাও অব্যাহত থাকতে পারে। জান্তা সরকার গুরুত্বপূর্ণ নগর কেন্দ্রগুলোর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখলেও গ্রামীণ অঞ্চলগুলোয় তাদের প্রভাব আরো কমতে থাকবে। ভারত ও বাংলাদেশও কৌশলগত নমনীয়তা বজায় রাখতে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি না দিয়ে নেপথ্য যোগাযোগের মাধ্যমেই আরাকান আর্মির সঙ্গে সম্পর্ক অব্যাহত রাখবে। লটারি ও নতুন ব্যাংকিং ব্যবস্থার সাফল্য এএর বৈধতা বাড়াতে পারে। তবে সেই অর্থ যদি অবৈধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে প্রমাণিত হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর বাড়তি নজরদারির মুখেও পড়তে হতে পারে।

মধ্যমেয়াদে জান্তা সরকারের ক্ষমতা আরো দুর্বল হলে আরাকান আর্মি যেকোনো সম্ভাব্য ফেডারেল রাজনৈতিক আলোচনায় অংশগ্রহণের দাবি জোরালোভাবে তুলবে। সে আলোচনায় তাদের প্রধান দাবি হবে কনফেডারেল মডেল, যার মাধ্যমে রাখাইনের জন্য ব্যাপক স্বায়ত্তশাসন ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা হবে। যদি চীন, ভারত ও বাংলাদেশ এ বিষয়ে একটি অভিন্ন অবস্থানে পৌঁছতে পারে, তাহলে রোহিঙ্গাদের অধিকার নিশ্চিত করে রাখাইনে একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে, যা পরবর্তী সময়ে মিয়ানমারের অন্যান্য জাতিগত অঞ্চলগুলোর জন্যও একটি দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে। আরাকান আর্মি যদি স্থিতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়, ভারত ও বাংলাদেশ একসময় তাদের সঙ্গে বিদ্যমান অনানুষ্ঠানিক সম্পর্ককে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক স্বীকৃতিতে উন্নীত করতে পারে, তাহলে সেটি হবে মিয়ানমারের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়।

দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে সম্ভাব্য চিত্র হতে পারে একটি খণ্ডিত মিয়ানমার, যেখানে কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব কেবল নামমাত্র থাকবে এবং প্রকৃত ক্ষমতা আধাস্বায়ত্তশাসিত বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে আরাকান আর্মির নেতৃত্বাধীন রাখাইন সম্ভবত সবচেয়ে স্থিতিশীল ও তুলনামূলকভাবে উন্নত অঞ্চল হিসেবে আবির্ভূত হবে। তবে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান করতে ব্যর্থ হলে কিংবা অবৈধ বাণিজ্যের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়লে পুরো মিয়ানমার প্রতিদ্বন্দ্বী সশস্ত্র গোষ্ঠী ও বিদেশী প্রক্সি শক্তির সংঘাতে জর্জরিত একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

আরাকান আর্মি ইতিহাসের এক উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ কৌশলগত খেলায় নেমেছে। পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি থেকে সরে এসে কনফেডারেল কাঠামোর পক্ষে অবস্থান নেয়ার মাধ্যমে মিয়ানমারে তারা নিজেদের সবচেয়ে বাস্তববাদী এবং সম্ভাবনাময় রাজনৈতিক শক্তিগুলোর একটি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত সামরিক অভিযান পরিচালনা এবং যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতার জটিল বাস্তবতা সামাল দেয়ার ক্ষেত্রে তাদের সক্ষমতা নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য।

তবে এ প্রকল্পের প্রকৃত পরীক্ষা নির্ভর করছে ভারত-চীন-বাংলাদেশ ত্রিভুজের ওপর। যদি এ তিন দেশ রোহিঙ্গা সংকটের একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানে সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারে, তাহলে আরাকান আর্মির কনফেডারেল মডেল মিয়ানমারের অন্যান্য জাতিগত অঞ্চলের জন্যও একটি অনুসরণযোগ্য কাঠামো হয়ে উঠতে পারে। সেটি প্রমাণ করবে যে পূর্ণ স্বাধীনতা ছাড়াও স্বায়ত্তশাসন সম্ভব, আঞ্চলিক চাপের মাধ্যমে সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষা করা যায় এবং অর্থনৈতিক একীকরণ অনেক ক্ষেত্রে জাতিগত দ্বন্দ্বকে অতিক্রম করতে পারে। কিন্তু রাখাইন ঘিরে ত্রিপক্ষীয় সমীকরণ ভেঙে পড়লে সেখানে বহু জাতিগোষ্ঠীর দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ শুরু হতে পারে, যেখানে কোনো পক্ষেরই সুস্পষ্ট বিজয় নিশ্চিত হবে না।

ভবিষ্যতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তাই দুটি। আরাকান আর্মি কি বাংলাদেশ ও ভারতকে বোঝাতে পারবে যে তারা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার অংশীদার, কোনো নিরাপত্তা হুমকি নয়? আর চীনকে কি বোঝানো সম্ভব হবে যে স্বল্পমেয়াদি কৌশলগত নিয়ন্ত্রণের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ? এ প্রশ্নগুলোর উত্তর শুধু রাখাইনের নয়, গোটা মিয়ানমারের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।

(শান হেরাল্ড এজেন্সিতে প্রকাশিত মিয়ানমারের রাজনৈতিক বিশ্লেষক সাই ওয়ানসাইয়ের ‘দ্য রাখাইন ইকুয়েশন: হাউ ইন্ডিয়া, চায়না অ্যান্ড বাংলাদেশ আর ডিফাইনিং মিয়ানমার’স ফিউচার’ নিবন্ধের অনুবাদ)

আরও