নেতানিয়াহুর প্রতি ট্রাম্পের সমর্থন, ইরানে নতুন হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র?

নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে গত রোববার নেতানিয়াহুকে ‘দুর্ধর্ষ প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে উল্লেখ করেন ট্রাম্প। শান্তির ক্ষেত্রে বড় অংশীদার হিসেবেও বর্ণনা করেন। ইরান প্রসঙ্গে বলেন, দেশটিকে সামরিক ও আর্থিকভাবে পদ্ধতিগতভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। ইরান দ্রুত নিজেদের অবস্থান না বদলালে শিগগিরই বাকি কাজ শেষ করা হবে

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নির্বাচনী প্রচারে আনুষ্ঠানিক সমর্থন জানিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর আগে নির্বাচনী প্রচারে এ ধরনের সরাসরি সমর্থন জানানো থেকে বিরত ছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। এছাড়া দুই মিত্রের মধ্যে টানাপড়েনও লক্ষ্য করা যাচ্ছিল। এখন ট্রাম্পের ঘোষণার পর ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নতুন করে যৌথ হামলার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা জোরালো হয়েছে।

নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে গত রোববার নেতানিয়াহুকে ‘দুর্ধর্ষ প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে উল্লেখ করেন ট্রাম্প। শান্তির ক্ষেত্রে বড় অংশীদার হিসেবেও বর্ণনা করেন। ইরান প্রসঙ্গে বলেন, দেশটিকে সামরিক ও আর্থিকভাবে পদ্ধতিগতভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। ইরান দ্রুত নিজেদের অবস্থান না বদলালে শিগগিরই বাকি কাজ শেষ করা হবে।

ট্রাম্প লেখেন, ইসরায়েলের নেতৃত্বে নেতানিয়াহু না থাকলে ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান যুক্তরাষ্ট্রকেই চালাতে হতো। কিন্তু তিনি নিজে তা করতে আগ্রহী নন। নেতানিয়াহুর সাহস ও নেতৃত্বের প্রশংসা করে আসন্ন নির্বাচনে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার পুনর্নির্বাচনের প্রতি ‘পূর্ণ ও নিঃশর্ত সমর্থন’ ঘোষণা করেন।

ইসরায়েলে আগামী ২৭ অক্টোবর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। দেশটির সংবাদমাধ্যম হারেৎজের পূর্বাভাস অনুযায়ী, রোববার পর্যন্ত গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট নেসেটে ১২০ আসনের মধ্যে ৫২টি আসন পেতে পারে। অন্যদিকে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির নেতৃত্বাধীন জোট পেতে পারে ৫১টি আসন।

ব্রিটিশ গবেষণাপ্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউজের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির পরিচালক সানাম ভাকিল বলেন, দুই নেতার মধ্যে কয়েক মাসের টানাপড়েনের পর ট্রাম্পের এ সমর্থন রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে ওয়াশিংটনের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্কের ক্ষেত্রে নিজেকে অপরিহার্য হিসেবে তুলে ধরতে পারবেন নেতানিয়াহু। তবে ইসরায়েলি ভোটারদের মধ্যে তার নেতৃত্ব নিয়ে বিভক্তি রয়েছে। ফলে এ সমর্থনের নির্বাচনী প্রভাব অতিরঞ্জিত করা ঠিক হবে না।

লন্ডনের কিংস কলেজের নিরাপত্তা অধ্যয়ন বিভাগের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক আন্দ্রেয়াস ক্রিগও ট্রাম্পের সমর্থনকে নেতানিয়াহুর জন্য ‘রাজনৈতিক উপহার’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তবে ডানপন্থী দলগুলোর বিভক্তি, কট্টর অর্থোডক্স ভোটারদের অসন্তোষ এবং ৭ অক্টোবরের ঘটনাপ্রবাহ নেতানিয়াহুর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ বলে উল্লেখ করেন তিনি।

হরমুজ প্রণালি। ছবি: রয়টার্স

ইরান যুদ্ধে কী প্রভাব পড়বে

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে গত ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধ বর্তমানে অচলাবস্থায় রয়েছে। বিশ্বের মোট অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি যুদ্ধ শুরুর পর কার্যত বন্ধ করে দেয় তেহরান। পরে ইরানি জাহাজ চলাচলে নৌ অবরোধ আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের জাহাজে হামলার ঘটনায় প্রণালি দিয়ে তেল রফতানি আরো ব্যাহত হয়েছে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি রোববার বলেন, হরমুজ প্রণালি খুলে দেয়ার প্রস্তাব এখনো বহাল রয়েছে। ওয়াশিংটন তেহরানের শর্ত মেনে নিলে ছয় দিনের মধ্যে প্রণালি খুলে দেয়া সম্ভব এবং পরদিনই আলোচনা শুরু হতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও নৌ অবরোধ তুলে নেয়ার শর্তসহ সাতটি দাবি বিবেচনা না করায় আগের আলোচনা ব্যর্থ হয়েছিল।

আরাঘচি অভিযোগ করেন, কারাগারে যাওয়া এড়াতে নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানে নতুন করে হামলা চালাতে প্ররোচিত করছেন।

ক্রিগের মতে, ট্রাম্পের সমর্থন মানেই কূটনীতির বদলে যুদ্ধ বেছে নেয়া নয়। তার ধারণা, নৌ অবরোধের চাপে ইরান শেষ পর্যন্ত পারমাণবিক বিষয়ে ছাড় দিতে এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে রাজি হবে বলে মনে করছে ওয়াশিংটন।

এরপর কী হতে পারে

ভাকিল বলেন, ট্রাম্পের ঘোষণায় ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক সমন্বয় জোরালো হয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে দুই নেতা নতুন সামরিক অভিযানে একমত হয়েছেন। বরং এর ফলে যুদ্ধ থেকে নিজেদের দূরে রাখার সুযোগ ট্রাম্পের জন্য আরো সীমিত হতে পারে।

ট্রাম্প বলেছেন, নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানে হামলা চালাবেন না। তবে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কর্মকর্তাদের বরাতে দুই নেতা নির্বাচনের আগে ইরানে বড় ধরনের নতুন অভিযানের বিষয়ে আলোচনা করেছেন।

ক্রিগের ধারণা, জবাব দেয়া জরুরি হয়ে পড়েছে ইরান যদি এমন কোনো হামলা না করে তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নতুন হামলার সম্ভাবনা আপাতত কম। তবে ৩ নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ঝুঁকি বাড়তে পারে। তার মতে, হরমুজ প্রণালিতে অনিয়ন্ত্রিত উত্তেজনা তৈরি হলে দুই নেতা রাজনৈতিকভাবে প্রস্তুত হওয়ার আগেই যুক্তরাষ্ট্র সামরিক পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হতে পারে।

আল জাজিরার প্রতিবেদন থেকে সংক্ষেপিত

আরও