জ্বালানি উৎপাদনে ফসলের দিকে ঝুঁকছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও জ্বালানি নিরাপত্তার স্বার্থে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোয় বায়োফুয়েল বা জৈব জ্বালানির ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছে।

তবে এ আকস্মিক সিদ্ধান্তে অঞ্চলটিতে খাদ্য সরবরাহ ও পণ্য রফতানি নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলো জ্বালানি তেল সংকট মোকাবেলায় ভোজ্যতেলসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য জ্বালানি উৎপাদনে ব্যবহার করছে। ফলে খাদ্য, ভোজ্যতেল, পশুখাদ্য ও আন্তর্জাতিক বাজারে রফতানির জন্য প্রয়োজনীয় ফসল সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। এ পরিস্থিতির ফলে স্থানীয় বাজারে পণ্যের দাম একদিকে বাড়ছে, অন্যদিকে আঞ্চলিক বাজারও অস্থির হয়ে উঠছে। খবর নিক্কেই এশিয়া।

গত মার্চে ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর জ্বালানি সংকট তীব্র রূপ নেয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো নিজেদের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সরবরাহে স্থানীয় ফসলের মিশ্রণ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। এ নীতি জ্বালানি নিরাপত্তা সাময়িকভাবে বাড়ালেও তা অভ্যন্তরীণ সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে। এরই মধ্যে থাইল্যান্ডের খুচরা বাজারে সাধারণ ক্রেতাদের জন্য ভোজ্যতেল কেনার ওপর সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এ রূপান্তরের কারণে বিশ্ববাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে।

বিশ্বের শীর্ষ পাম অয়েল উৎপাদনকারী দেশ ইন্দোনেশিয়া এ প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে আগ্রাসী ভূমিকা পালন করছে। দেশটির সরকার ১ জুলাইয়ের মধ্যে ডিজেলে পাম অয়েলের মিশ্রণ ৪০ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ বা বি-ফিফটি করার নির্দেশ দিয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো এ সিদ্ধান্তের সপক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।’ সরকারি কর্মকর্তাদের দাবি, এ উদ্যোগের ফলে এ বছর জ্বালানি আমদানি বাবদ দেশের প্রায় ৭৯০ কোটি ডলার সাশ্রয় হবে এবং চলতি বছরের শেষ নাগাদ প্রায় ৯০ হাজার নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।

ইন্দোনেশিয়ার জ্বালানি তেল শোধনাগারগুলো এখন তাদের সর্বোচ্চ উৎপাদনক্ষমতার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। ইন্দোনেশিয়ার ২৬টি বায়োডিজেল শোধনাগারের বর্তমানে বার্ষিক উৎপাদনক্ষমতা ২ কোটি ২০ লাখ কিলোলিটার। নতুন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে দেশটির আরো প্রয়োজন হবে প্রায় ১ কোটি ৯৫ লাখ কিলোলিটার। ফলে রক্ষণাবেক্ষণ জনিত বা অন্য উৎপাদন জনিত বিঘ্ন মোকাবেলায় খুবই সামান্য সুযোগ থাকবে।

অন্যদিকে মালয়েশিয়াও বায়োডিজেলের মান ১০ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করায় পাম অয়েল ঘাটতিতে পড়েছে। সীমিত জমির কারণে সেখানে হুট করে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। ফিলিপাইনেও নারকেলভিত্তিক জৈব জ্বালানি উৎপাদন বাড়াতে গিয়ে রফতানি খাতগুলো কাঁচামাল সংকটের মুখে পড়েছে।

খাদ্য ও বাণিজ্য খাতের পাশাপাশি সাধারণ ভোক্তাদের মধ্যেও এ নতুন জ্বালানি নিয়ে ক্ষোভ ও সংশয় বাড়ছে। জ্বালানিতে উদ্ভিজ্জ উপাদানের মিশ্রণ বেশি হলে তা গাড়ির ইঞ্জিনের কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং রক্ষণাবেক্ষণ খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয়। ইন্দোনেশিয়ার একজন খনি প্রকৌশলী জানান, নতুন এ বায়োডিজেল উচ্চমাত্রায় ব্যবহারের কারণে রক্ষণাবেক্ষণ খরচ প্রায় ১৮ শতাংশ বেড়েছে। ভিয়েতনামের গাড়ি চালকরাও ইঞ্জিনের ক্ষতির আশঙ্কায় পেট্রলের সঙ্গে ইথানল মিশ্রিত জ্বালানি ব্যবহারে অনীহা প্রকাশ করছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্ববাজারে পাম অয়েলের দাম বাড়লে স্থানীয় বাজারে ভোজ্যতেলের দামও বাড়বে, যা নিম্নবিত্ত পরিবার ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে। এছাড়া জৈব জ্বালানির চাহিদা মেটাতে বিপুল পরিমাণ পাম অয়েল দেশে রেখে দেয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে রফতানি অনেক কমে যাবে। ফলে ইন্দোনেশিয়া সরকার প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ রফতানি শুল্ক হারাতে পারে। এতে জ্বালানি স্বনির্ভরতা অর্জন করতে গিয়ে দেশগুলোকে এখন অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

আরও