১৯৫৯ সালের মার্চ মাস। চীনা সেনাবাহিনী তখন তিব্বতে একটি গণ-বিদ্রোহ দমন করছে। আর সে সময়েই তেনজিন গিয়াতসো, অর্থাৎ ১৪তম দালাই লামা পালিয়ে ভারতে আসেন। তিনি তখন মাত্র কুড়ির কোঠার এক তরুণ। সামনে ছিল এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।
বিশ্বের খুব কম দেশই চীনের এই পদক্ষেপের বিরোধিতা করতে চেয়েছিল। তিব্বতের জনগণ ও সংস্কৃতিকে রক্ষার দায়িত্ব এসে পড়ে দালাই লামার কাঁধে। তবে কয়েক দশকের নির্বাসন সত্ত্বেও দালাই লামা শুধু তিব্বতিদের আধ্যাত্মিক নেতা নন, হয়ে উঠেছেন বিশ্বজুড়ে শান্তির প্রতীক এবং অন্যতম প্রভাবশালী ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব।
তিব্বতের অসহিংস আন্দোলনের জন্য ১৯৮৯ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত হন তিনি।
চীনা সরকার এখনো তাকে বিচ্ছিন্নতাবাদী বলে বিবেচনা করে। যদিও দালাই লামা বহুবার বলেছেন, তার লক্ষ্য তিব্বতের স্বাধীনতা নয়, আত্মনিয়ন্ত্রণ।
২০২৫ সালের জুনে ৯০ বছর পূর্ণ হওয়ার পর তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, তার মৃত্যুর পরও দালাই লামার প্রতিষ্ঠান টিকে থাকবে।
দালাই লামার জন্ম ১৯৩৫ সালের ৬ জুলাই, তিব্বতের সীমান্তবর্তী এক ছোট গ্রামে। তার আসল নাম ছিল লহামো ধোন্ডুপ। কৃষক পরিবারে জন্ম নেয়া এই শিশুকে মাত্র দুই বছর বয়সে ১৩তম দালাই লামার পুনর্জন্ম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
চার বছর বয়সে সিংহাসনে বসানো হয় এবং নাম হয় তেনজিন গিয়াতসো। শৈশব কেটেছে মঠে। পরে তিনি বৌদ্ধ দর্শনে সর্বোচ্চ উপাধি গেশে লারাম্পা ডিগ্রি লাভ করেন।
১৯৫০ সালে, মাত্র ১৫ বছর বয়সে তাকে এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়। চীনের নতুন কমিউনিস্ট সরকারের সৈন্যরা তিব্বতে ঢুকে পড়ে। ১৯৫১ সালে চীনের সঙ্গে এক ১৭ দফা চুক্তির মাধ্যমে তিব্বতকে চীনের অন্তর্ভুক্তির ভিত্তি স্থাপিত হয়।
১৯৫৯ সালের ১০ মার্চ, একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ার জন্য দালাই লামাকে আমন্ত্রণ জানান এক চীনা জেনারেল। তিব্বতিদের সন্দেহ হয়—এটি হয়তো অপহরণের ফাঁদ। তিব্বতি জনতা সেই জেনারেলের বাসভবন ঘিরে রাখে। অচিরেই তা রূপ নেয় বিক্ষোভে।
চীনা সেনা কঠোরভাবে দমন অভিযান চালায়। হাজার হাজার তিব্বতি নিহত হন বলে ধারণা করা হয়। কয়েক দিনের মধ্যে দালাই লামা বেশভূষা বদলে গোপনে সেই বাসভবন ছেড়ে পালিয়ে যান। হিমালয় পাড়ি দিয়ে ১৫ দিনের দীর্ঘ যাত্রার পর ভারত সীমান্তে পৌঁছান তিনি। ভারত সরকার তাকে আশ্রয় দেয়। তিনি ভারতের ধর্মশালায় তিব্বতের নির্বাসিত সরকার প্রতিষ্ঠা করেন। প্রায় ৮০ হাজার তিব্বতি তার সঙ্গে নির্বাসনে চলে আসে।
নির্বাসনে থেকেই তিব্বতের সংস্কৃতি রক্ষা ও আন্তর্জাতিক পরিসরে তিব্বতিদের দুর্দশা তুলে ধরার কাজ শুরু করেন দালাই লামা। জাতিসংঘে আবেদন করে ১৯৫৯, ১৯৬১ ও ১৯৬৫ সালে তিব্বতিদের সুরক্ষার জন্য প্রস্তাব পাশ করান। দালাই লামার প্রস্তাবিত ‘মধ্যপন্থা’ নীতি অনুযায়ী, তিব্বত চীনের অংশ হিসেবেই থেকে স্বশাসন ভোগ করবে।
আন্তর্জাতিক মহলে তিনি শান্তির প্রতীক হলেও কিছু তিব্বতি মনে করেন, বেইজিংয়ের প্রতি অতিরিক্ত নমনীয় দালাই লামা। ২০০৮ সালে লাসায় চীনা নিপীড়নের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে বহু মানুষ নিহত হয়।
২০২৩ সালে এক ভিডিওতে তাকে এক শিশুকে ‘জিভ চুষতে বলার’ দৃশ্য প্রকাশ পেয়ে বিতর্ক তৈরি করে। দালাই লামার দপ্তর জানায়, এটি ছিল ‘স্রেফ রসিকতার অংশ’। পরে অবশ্য দালাই লামা প্রকাশ্যে ক্ষমা চান।
২০১৯ সালে ‘নারী দালাই লামা হলে তাকে সুন্দরী হতে হবে’ মন্তব্যের জন্যও ক্ষমা প্রার্থনা করেন।
ঐতিহাসিকভাবে দালাই লামা ছিলেন তিব্বতিদের রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক নেতা। ২০১১ সালে তিনি রাজনৈতিক ক্ষমতা নির্বাচিত নির্বাসিত সরকারের কাছে হস্তান্তর করেন। বয়স ও স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত কারণে পরবর্তী প্রজন্মে উত্তরসূরির প্রশ্ন নিয়ে বাড়তে থাকে উদ্বেগ।
প্রথমে তিনি বলেছিলেন, পুনর্জন্ম নাও হতে পারে। তবে ৯০ বছরে পৌঁছে ঘোষণা দেন, দালাই লামার প্রতিষ্ঠান চলবে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ‘কেবল আমার দপ্তরই নতুন দালাই লামার পুনর্জন্ম স্বীকৃতি দিতে পারবে। অন্য কারো কোনো অধিকার নেই।‘
চীনের দাবির বিরুদ্ধে এটি ছিল কড়া বার্তা। বেইজিংও পাল্টা জানায়—পরবর্তী দালাই লামা তাদের অনুমোদন ছাড়া বৈধ হবেন না।
দালাই লামা অবশ্য বলেছেন, তার উত্তরসূরি চীনের বাইরে স্বাধীন বিশ্বে জন্ম নেবেন।
তবে সেই ব্যক্তি কে হবেন, তা এখনো অজানা।