স্টকহোমভিত্তিক থিংকট্যাংক প্রতিষ্ঠানের পর্যবেক্ষণ

বিশ্বব্যাপী অর্ধশতকের মধ্যে সবচেয়ে দুরবস্থায় সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা

আইডিইএর নিয়মিত বার্ষিক প্রকাশনা গ্লোবাল স্টেট অব ডেমোক্রেসি রিপোর্টের ২০২৫ সংস্করণে ১৭৪টি দেশের তথ্য নিয়ে প্রকাশিত এক সমীক্ষার ফলাফলে দেখা গেছে, ২০২৪ সালে এর মধ্যে এক-চতুর্থাংশ দেশে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে।

বিশ্বব্যাপী নাটকীয়ভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে গণতান্ত্রিক পরিবেশ। ফলে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এখন ৫০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে দুরবস্থায় রয়েছে। স্টকহোমভিত্তিক থিংকট্যাংক প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর ডেমোক্রেসি অ্যান্ড ইলেক্টোরাল অ্যাসিস্ট্যান্সের (আইডিইএ) এক পর্যবেক্ষণে এমন বক্তব্য উঠে এসেছে।

আইডিইএর নিয়মিত বার্ষিক প্রকাশনা গ্লোবাল স্টেট অব ডেমোক্রেসি রিপোর্টের ২০২৫ সংস্করণে ১৭৪টি দেশের তথ্য নিয়ে প্রকাশিত এক সমীক্ষার ফলাফলে দেখা গেছে, ২০২৪ সালে এর মধ্যে এক-চতুর্থাংশ দেশে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে।

সংস্থাটির দাবি, ১৯৭৫ সালে এ প্রতিবেদন প্রকাশ শুরুর পর থেকে বর্তমানেই সবচেয়ে বেশি খারাপ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বৈশ্বিক গণমাধ্যমের স্বাধীনতা। এর কারণ হিসেবে বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্রের ক্রমাবণতিকে দায়ী করছে আইইডিএ। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে বিশ্বের ৯৪টি দেশে গণতন্ত্রের অবনতি ঘটেছে। অগ্রগতি অর্জন করতে পেরেছে মাত্র এক-তৃতীয়াংশ দেশ।

এ বিষয়ে থিঙ্কট্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠানটির মহাসচিব কেভিন কাসাস-জামোরা বলেন, ‘বিশ্বব্যাপীগণতন্ত্র এখন বড় এক ঝড়ের মুখে। ব্যাপক আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় পুনরুত্থান ঘটছে স্বৈরশাসনের। এর সঙ্গে সঙ্গে দেখা দিয়েছে গভীর অনিশ্চয়তাও। এ পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে হলে গণতান্ত্রিক দেশগুলোকে নির্বাচন ও আইনের শাসনের মতো গণতন্ত্রের মৌলিক উপাদানগুলোর সুরক্ষা দিতে হবে। এর সঙ্গে সঙ্গে সরকারি কাঠামোর মধ্যেও গভীর সংস্কার আনতে হবে, যাতে তা ন্যায়বিচার, অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থা ও সম্মিলিতভাবে সবার সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পারে।’

আইইডিএর হিসাবে, ২০২৪ সালে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচকে সবচেয়ে বেশি অবনতি হয়েছে আফগানিস্তান, বারকিনা ফাসো এবং মিয়ানমারে। গৃহযুদ্ধ, দারিদ্র্য ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে দেশগুলো এখন ব্যাপক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এর পর সবচেয়ে বড় পতন দেখা গেছে দক্ষিণ কোরিয়ায়। সেখানে সাবেক প্রেসিডেন্ট ইউন সুক ইয়ল সমালোচনামূলক সংবাদমাধ্যমকে বারবার টার্গেট করেছেন। সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধে মানহানির মামলাকে বারবার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন তিনি। পরে চলতি বছরের শুরুর দিকে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়।

আবার ভিন্ন প্রেক্ষাপটের সমস্যাও মোকাবেলা করতে হচ্ছে বৈশ্বিক গণমাধ্যমকে। নিউজিল্যান্ডে সংকট তৈরি হয়েছে গণমাধ্যমের ক্ষেত্র সংকুচিত হয়ে যাওয়ার কারণে। সেখানে পাঁচজন নিয়োগকর্তার মধ্যে মাত্র একজনের অধীনেই চার-পঞ্চমাংশ সাংবাদিক কাজ করছেন। ফিলিস্তিনে ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে প্রায় ২০০ সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। আর ইসরায়েল গাজা উপত্যকায় আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের স্বাধীন প্রবেশাধিকার রুদ্ধ করে রেখেছে।

প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়, ‘ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ উভয়েই ২০২৪ ও ২০২৫ সালের মধ্যে আল জাজিরাকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে। তারা জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগ এবং কিছু ঘটনার কভারেজ নিয়ে টানাপড়েনের কারণে আল জাজিরার কার্যক্রম স্থগিত করেছে।’

মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় ২০২১ সালের পর থেকে সবচেয়ে বেশি উন্নতি করেছে চিলি। সাংবাদিক এবং তাদের পরিবারের নিরাপত্তা বাড়ানোর উদ্যোগ থেকে করা এক খসড়া আইন এক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে।

আইডিইএর প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, দীর্ঘদিন ধরে বৈশ্বিক গণতন্ত্রের প্রধানতম সমর্থক হিসেবে দেখা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রকে। কিন্তু দেশটি এ বছর থেকে বিশ্বব্যাপী গণতান্ত্রিক সহায়তায় কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা এবং আর্থিক সহায়তা— দুটোই উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমিয়ে দিয়েছে। বিষয়টি আন্তর্জাতিক গণতন্ত্রায়ন প্রচেষ্টাকে দুর্বল করে দিয়েছে। বিগত ছয় মাসেরও কম সময়ের যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের প্রতীকী মর্যাদা অনেকটাই হারিয়ে ফেলেছে। দেশটি এখন ক্রমশ নির্বাহী ক্ষমতার সীমা লঙ্ঘনের দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়াচ্ছে এবং গণতন্ত্রপন্থী আশাবাদীদের চেয়ে পপুলিস্ট নেতাদেরই বেশি উৎসাহ জোগাচ্ছে।’

সংস্থাটি ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রথমবারের মতো ‘পিছিয়ে পড়া’ গণতন্ত্রের তালিকায় যুক্ত করে। ২০১৯ সাল থেকেই সেখানে ‘দৃশ্যমান অবনতি’ দেখা যাচ্ছে বলে মনে করছে আইডিইএ।

আরও