ইসরায়েলে নারীর অধিকার দ্রুত অবনতির যাচ্ছে। এর পেছনে নেতানিয়াহুর কট্টর ডানপন্থী সরকারের নীতিকে দায়ী করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে লিঙ্গসমতার ক্ষেত্রে ইসরায়েলের বৈশ্বিক অবস্থান নাটকীয়ভাবে নেমে গেছে। জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয় প্রণীত ২০২৫-২৬ সালের ‘উইমেন, পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি ইনডেক্সে’ এ ইসরায়েলের অবস্থান ১৮১টি দেশের মধ্যে ৮৪তম। এই অবস্থান আলবেনিয়া, রাশিয়া ও সৌদি আরবেরও নিচে। অথচ বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার তিন বছর আগে ইসরায়েলের অবস্থান ছিল ২৭তম। খবর সিএনএন।
গাজা যুদ্ধ শুরুর আগের বছরে নারী অধিকার বিষয়ে ইসরায়েল সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা হয়েছিল। প্রতিবাদী নারীরা এর নাম দিয়েছিলেন ‘উইমেন ইন রেড’। লাল পোশাক ও সাদা টুপি পরে, মুখ নিচু করে তারা নীরব প্রতিবাদ-মিছিল করেছিলেন। মার্গারেট অ্যাটউডের ডিস্টোপিয়ান উপন্যাস ‘দ্য হ্যান্ডমেইডস টেল’ থেকে অনুপ্রেরণা নেয়া এই প্রতীকী প্রতিবাদের মাধ্যমে তারা একটি সতর্কবার্তা দিতে চেয়েছেন যে, সরকারের প্রস্তাবিত বিচারব্যবস্থা সংস্কার নারীর অধিকার নিয়ে গত কয়েক দশকের অর্জনকে ধ্বংস করে দিতে পারে।
তখন সরকার এই প্রতিবাদকে নাটকীয় অতিরঞ্জন বলে উড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু সেই প্রতীকী প্রতিবাদ এখন অনেকের কাছে দূরদর্শী পূর্বাভাস হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে। অতি রক্ষণশীল ধর্মীয় দলগুলোর সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ডানপন্থী সরকার ইসরায়েলকে ক্রমশ আরো ধর্মভিত্তিক ও রক্ষণশীল ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
ইসরায়েলে নারীর সমতার দীর্ঘদিনের প্রধান ভরসা সুপ্রিম কোর্টকে দুর্বল করার বৃহত্তর প্রচেষ্টার পাশাপাশি, নারীর অধিকারের ওপর সরাসরি হুমকিও দেখা দিয়েছে। নেতানিয়াহুর ধর্মীয় জোটসঙ্গীরা এমন সব বিল উত্থাপন করছে, যা নাগরিক জীবনে ধর্মীয় কর্তৃত্ব বিস্তৃত করবে। এর মধ্যে রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও শিক্ষাক্ষেত্রে লিঙ্গভিত্তিক বিভাজন।
এ সব বিলে নেতানিয়াহুর সরকার সমর্থন প্রত্যাহার করলে সরকার পতনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ফলে এই ক্ষমতা হাতে থাকায় ধর্মীয় দলগুলো প্রধানমন্ত্রীকে নিজেদের ইচ্ছার কাছে নত হতে বাধ্য করতে পারছে।
এই দ্রুত পতনের সঙ্গে সঙ্গে জনজীবনে নারীদের প্রতিনিধিত্বও তীব্রভাবে কমে গেছে। বর্তমানে ইসরায়েলের ৩৩ জন মন্ত্রীর মধ্যে মাত্র ছয়জন নারী। এসব নারীদের খুব কমই গুরুত্বপূর্ণ বা জ্যেষ্ঠ দায়িত্বে আছেন। বর্তমান সরকার ৩০টিরও বেশি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একটিতেও কোনো নারীকে স্থায়ীভাবে ডিরেক্টর-জেনারেল পদে নিয়োগ দেয়নি।
এ মুহূর্তে দেশটির কোনো বড় রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে কোনো নারী নেই। তাছাড়া নেতানিয়াহুর জোট সরকারে এমন দুটি দল রয়েছে, যাদের প্রার্থী তালিকায় একজন নারীও নেই।
তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও জেন্ডার স্টাডিজ অনুষদের অধ্যাপক ডাফনা হ্যাকার বলেন, 'ইসরায়েলের লিঙ্গসমতা সূচকে এই অবনমন নজিরবিহীন। এটি আমাদের বিশ্বব্যাপী দেশগুলোর নিম্নার্ধে নামিয়ে দিয়েছে।’
ইসরায়েল যে পদক্ষেপগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, সেগুলোকে অধ্যাপক ডাফনা হ্যাকার ‘ইহুদিবাদের সবচেয়ে চরম রূপ’ বলে অভিহিত করেছেন। আর নারীদের জন্য এর প্রভাব হবে গভীর ও সুদূরপ্রসারী। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো সহিংসতা ও নারীনিধনের দ্রুত বৃদ্ধি। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ইসরায়েলে ৪৪ জন নারী খুন হয়েছেন, যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ বার্ষিক সংখ্যা। এটি ২০২৪ সালে নিহত ৩৫ জন নারীর তুলনায় বেশি।