সেন নদীর পাড়ে একা হেঁটে বেড়াচ্ছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ— এমন একটি দৃশ্য সোমবার সকালে ফ্রান্সজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিল। কালো ওভারকোটে মোড়া, দূরে নিরাপত্তারক্ষীদের ঘেরা মাখোঁর এই নিভৃত হাঁটাচলা যেন প্রতীক হয়ে উঠেছে এক নেতার রাজনৈতিক নিঃসঙ্গতার।
দূর থেকে ভিডিওতে ধারণ করা এবং ফরাসি টিভিতে প্রচারিত এই দৃশ্য ১৯৬০-এর দশকের শেষের দিকে পদত্যাগের পর চার্লস দ্য গলের উইন্ড-সুইপ্ট সমভূমিতে সান্ত্বনা খোঁজার দৃশ্য মনে করিয়ে দেয়— ইতিহাস যেন নিজেকে পুনরাবৃত্তি করছে; এক যুগের অবসান আসন্ন।
সেন নদীর তীরে মাখোঁ। ছবি- ভিডিও থেকে নেয়া
মাখোঁ ২০২৭ সাল পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট থাকবেন। কিন্তু মাত্র দুই বছরে পঞ্চমবারের মতো প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ তার শেষ মেয়াদ পূর্ণ করার সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তার শেষ প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নুর মন্ত্রিসভা মাত্র একদিনের বেশি স্থায়ী হতে পারেনি।
সোমবার মাখোঁকে অবশ্য এই পরিণতি এড়াতে বদ্ধপরিকর বলে মনে হয়েছে। তিনি লেকর্নুকে রাজনৈতিক অচলাবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজতে বিরোধী দলের সঙ্গে শেষ মুহূর্তের আলোচনা চালানোর জন্য দু'দিনের সময় দিয়েছেন। লেকর্নুকে শেষ চেষ্টা করার সুযোগ দিয়ে মাখোঁ ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, তিনি অন্য দুটি বিকল্পকে ঘৃণা করেন—একটি হলো আগাম সংসদ নির্বাচন, যা অতি ডানপন্থীদের হাতে ক্ষমতা তুলে দিতে পারে; আর অন্যটি হলো তার নিজের পদত্যাগ, যা তিনি বারবার প্রত্যাখ্যান করেছেন।
তার বিকল্প পথগুলো সংকীর্ণ হওয়ায় ক্রমশ অজনপ্রিয় হয়ে ওঠা মাখোঁ এখন অভ্যন্তরীণভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। তার একসময়ের মিত্ররাও ২০২৭ সালের নির্বাচনে সফল হওয়ার জন্য নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে তার থেকে দূরত্ব তৈরি করছেন। এল্যাব পোল ফর বিএফএমটিভি-এর একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, প্রায় অর্ধেক ফরাসি জনগণ (৪৯%) বর্তমান সংকটের জন্য মাখোঁকেই দায়ী করেন। আর ৫১% বিশ্বাস করেন, তার পদত্যাগ এই অচলাবস্থা ভাঙতে পারে।
অতি ডানপন্থী ন্যাশনাল র্যালির আইনপ্রণেতা ফিলিপ ব্যালার্ড এক্স-এ পোস্ট করেছেন, ‘মাখোঁ এখন নিজেকে বিচ্ছিন্ন, দিকনির্দেশনাহীন এবং সমর্থনহীন অবস্থায় খুঁজে পাচ্ছেন। তাকে এর পরিণতি টানতে হবে: হয় পদত্যাগ, নয়তো পার্লামেন্ট ভেঙে দেয়া।‘
সংকটের মূল বীজ বোনা হয়েছিল গত বছরের সেই বিফল আগাম নির্বাচনে। সংসদে তিনটি বিপরীতমুখী শিবির তৈরি হয়, কোনো পক্ষই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। সেই থেকেই মাখোঁ টিকে আছেন সংখ্যালঘু সরকার দিয়ে, যা বারবার ব্যর্থ হয়েছে বাজেট ঘাটতি মোকাবেলায়।
সবশেষে ডানপন্থী নেতা ব্রুনো রেতাইয়োর বিদ্রোহে সেই ভাঙনের ষোলকলা পূর্ণ হয়। লেকর্নুর সদ্য ঘোষিত মন্ত্রিসভাকে তিনি প্রকাশ্যে কটাক্ষ করেন, আর সেটাই ছিল চূড়ান্ত আঘাত।
এখন মাখোঁর একমাত্র আশা — লেকর্নু যদি আবারও রেতাইয়োদের ফিরিয়ে আনতে পারেন। তা না হলে, তাকে বামপন্থীদের সঙ্গে হাত মেলাতে হতে পারে। কিন্তু তাদের সম্পদকর পুনরুজ্জীবন ও পেনশন সংস্কার বাতিলের দাবিতে সেই সমীকরণও অসম্ভব প্রায়।
ফরাসি ডানপন্থী নেতা মেরিন ল্য পেন নতুন নির্বাচনের দাবি তুলেছেন। জরিপে তার দল ন্যাশনাল র্যালি এখন এগিয়ে। বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপন্থী জোটের পতনে তারা লাভবান হচ্ছে।
কান শহরের মেয়র ও উদীয়মান রক্ষণশীল নেতা ডেভিড লিসনার্ড সরাসরি বলেছেন, ‘জাতীয় স্বার্থেই মাখোঁর উচিত নিজের পদত্যাগের তারিখ ঘোষণা করা। এতে প্রতিষ্ঠানগুলো রক্ষা পাবে ও অচলাবস্থা ভাঙবে।‘
তবু মাখোঁ দৃঢ়: তিনি মেয়াদ পূর্ণ করতেই চান। কিন্তু ইতিহাস বলছে, কখনো কখনো এক নেতার নীরব হাঁটাচলাও ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দেয়। হয়তো সেন নদীর বাতাসেই ঘুরছে সেই সিদ্ধান্তের প্রতিধ্বনি।
রয়টার্স অবলম্বনে