আল জাজিরার বিশ্লেষণ

ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংসের দাবি যুক্তরাষ্ট্রের, তবু কীভাবে হামলা চালাচ্ছে ইরান

হোয়াইট হাউস দাবি করে, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে।

বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ইরান এখনো হামলা চালাতে সক্ষম। সোমবার কাতার জানিয়েছে, তারা ইরান থেকে ছোড়া একটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে। একই সময় সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনও সতর্কতা জারি করে। আবুধাবিতে একটি ক্ষেপণাস্ত্র একটি গাড়িতে আঘাত করলে একজন নিহত হন।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি করছে ওয়াশিংটন। তবে বাস্তবে ইরান এখনো প্রতিবেশী দেশ ও ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়ে যাচ্ছে। এতে প্রশ্ন উঠেছে, কীভাবে এই হামলা চালিয়ে যাচ্ছে তেহরান।

হোয়াইট হাউস শনিবার এক বিবৃতিতে দাবি করে, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে এবং দেশটির নৌবাহিনী যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষমতা হারিয়েছে। একই সঙ্গে তারা জানায়, আকাশপথে ইরানের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। 'অপারেশন এপিক ফিউরি' নামে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান বড় ধরনের ফল দিচ্ছে বলেও উল্লেখ করা হয়।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রোববার বলেন, মার্কিন বাহিনী ইরানের ড্রোন উৎপাদন সক্ষমতাও প্রায় ধ্বংস করে দিয়েছে।

হামলার সংখ্যা কমেছে

তবে বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ইরান এখনো হামলা চালাতে সক্ষম। সোমবার কাতার জানিয়েছে, তারা ইরান থেকে ছোড়া একটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে। একই সময় সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনও সতর্কতা জারি করে। আবুধাবিতে একটি ক্ষেপণাস্ত্র একটি গাড়িতে আঘাত করলে একজন নিহত হন।

যুদ্ধ শুরুর পর প্রথম ২৪ ঘণ্টায় ইরান সংযুক্ত আরব আমিরাতের দিকে ১৬৭টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ৫৪১টি ড্রোন নিক্ষেপ করেছিল। কিন্তু যুদ্ধের ১৫তম দিনে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র চারটি ক্ষেপণাস্ত্র ও ছয়টি ড্রোনে।

ইসরায়েলের দিকেও হামলার মাত্রা কমেছে। যুদ্ধের প্রথম দুই দিনে প্রায় ১০০টি প্রজেক্টাইল ছোড়া হলেও সাম্প্রতিক দিনগুলোয় তা এক অঙ্কে নেমে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম দিনের তুলনায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ৯০ শতাংশ এবং ড্রোন হামলা ৮৬ শতাংশ কমেছে।

বিশাল মজুত এখনো রয়েছে

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের হাতে এখনো উল্লেখযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র মজুত রয়েছে। ২০২২ সালের এক মূল্যায়নে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা জানিয়েছিল, মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে বড় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার রয়েছে ইরানের।

ইসরায়েলি গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, ইরানের কাছে প্রায় ৩ হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ছিল, যা গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধে কমে প্রায় ২,৫০০-তে নেমে আসে।

এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রধান লক্ষ্য ছিল ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা ধ্বংস করা। প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের সময় বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটে, যা স্যাটেলাইট ও রাডারের মাধ্যমে শনাক্ত করা সম্ভব।

ইসরায়েলি সামরিক সূত্রের মতে, আনুমানিক ৪১০ থেকে ৪৪০টি উৎক্ষেপণ ব্যবস্থার মধ্যে প্রায় ২৯০টি অচল করে দেয়া হয়েছে।

পুরো সক্ষমতা ধ্বংস করা কঠিন

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরান ভৌগোলিকভাবে বিশাল দেশ হওয়ায় সম্পূর্ণভাবে তাদের হামলার ক্ষমতা ধ্বংস করা সহজ নয়।

ওয়াশিংটনের ন্যাশনাল ডিফেন্স ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ডেভিড ডেস রোশেস বলেন, 'ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র শনাক্ত করা সবসময় সহজ নয়। অনেক ক্ষেপণাস্ত্র এমন জায়গায় লুকিয়ে রাখা হয়েছিল, যেগুলো আগে সামরিক স্থাপনা হিসেবে পরিচিত ছিল না।'

তার মতে, এখন ইরান একসঙ্গে বড় হামলা চালানোর সক্ষমতা হারিয়েছে। ফলে তারা এক বা দুটি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে ছোট আকারে হামলা করছে, বিশেষ করে উপসাগরীয় দেশগুলোর বেসামরিক অবকাঠামোর দিকে।

তিনি বলেন, সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে এসব হামলা বড় নয়; বরং এগুলো মূলত প্রতিপক্ষকে চাপের মধ্যে রাখা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ক্লান্ত করার কৌশল।

ইরানের কৌশল: দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান এখন দীর্ঘমেয়াদি ক্ষয়ক্ষতির যুদ্ধের কৌশল নিয়েছে। জার্মান ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাফেয়ার্সের গবেষক হামিদরেজা আজিজি বলেন, তেহরানের ধারণা—উপসাগরীয় দেশ ও ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা হয়তো আগে শেষ হয়ে যেতে পারে।

তার মতে, ইরান এখন মোবাইল লঞ্চার ব্যবহার করছে, যা সহজে শনাক্ত করা যায় না। ফলে বিমান হামলা চালিয়েও সব উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা ধ্বংস করা কঠিন।

ড্রোন যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক চাপ

ইরান তুলনামূলক সস্তা কিন্তু কার্যকর ড্রোন তৈরি করতে দক্ষ। ‘শাহেদ-১৩৬’ ধরনের ড্রোন দ্রুত এবং বড় সংখ্যায় তৈরি করা যায়। এগুলো ধীরগতির হলেও একসঙ্গে ছোড়া হলে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে ফেলতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের লক্ষ্য শুধু সামরিক ক্ষতি নয়, বরং অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করা। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি সরবরাহ হয়, আর এই অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়ার ফলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের বেশি হয়ে গেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, যদি ইরান বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে চাপ সৃষ্টি করতে পারে, তবে তা যুক্তরাষ্ট্রের ওপরও বড় ধরনের অর্থনৈতিক প্রভাব ফেলতে পারে।

আরও