আধুনিক যুদ্ধ নিয়ে দীর্ঘদিনের বিশ্বাস, আকাশপথে শক্তিশালী হামলা চালালেই দ্রুত জয় নিশ্চিত করা যায়। মাটিতে দীর্ঘ লড়াই, সৈন্যের ক্ষয়ক্ষতি এসব যেন অতীতের বিষয়। প্রযুক্তি, নিখুঁত লক্ষ্যভেদ ও দূর থেকে আঘাত এ তিনের সমন্বয়েই নাকি যুদ্ধের ফল নির্ধারিত হবে। এ ধারণার পেছনে কাজ করে আকর্ষণীয় যুক্তি, যাকে দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত এক কলামে ‘পুরোনো ভ্রম’ হিসেবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন মার্কিন সাংবাদিক আরাম রোস্টন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান-সংক্রান্ত সামরিক কৌশল এবং তার প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের আক্রমণাত্মক বক্তব্যের শিকড় খুঁজতে যাওয়া যেতে পারে ১০৫ বছর আগে। ১৯২২ সালে সহযোগীদের নিয়ে রোম অভিমুখে যাত্রা করেন ফ্যাসিস্ট বেনিতো মুসোলিনি। এর এক বছর আগে ইতালীয় জেনারেল জুলিও দুয়ে প্রকাশ করেন বিখ্যাত বই ‘দ্য কমান্ড অব দ্য এয়ার’। সেখানে যুদ্ধ জয়ের নতুন এক ধারণা দেন তিনি ।
প্রতিপক্ষ নির্মূলে কড়া ভাষাও ব্যবহার করেন এ জেনারেল। লেখেন, ‘আপনি যদি কোনো প্রজাতিকে নিশ্চিহ্ন করতে চান, তবে আকাশে ওড়া পাখিগুলোকে গুলি করলেই হবে না। ডিম ও বাসাগুলো ধ্বংস করতে হবে’
তার মতে, ভবিষ্যতের বিজয় আর প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মতো ক্লান্তিকর ট্রেঞ্চ যুদ্ধ থেকে আসবে না। বরং ব্যাপক আকাশ হামলা থেকেই তা আসবে। যেখানে শুধু সৈন্য নয় বেসামরিক মানুষ, অবকাঠামো ও সরবরাহ ব্যবস্থাও লক্ষ্যবস্তু হবে। জুলিও দুয়ে লিখেছিলেন, ‘একটি ট্রেঞ্চে বোমা ফেলা বা গুলি চালানোর তুলনায় রেলস্টেশন, বেকারি, যুদ্ধ কারখানা ধ্বংস করা বা সরবরাহ বহরের ওপর হামলা করা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’
ইতালীয় সেনাদের সঙ্গে জুলিও দুয়ে (ডান থেকে দ্বিতীয়)। ছবি; ভিনটেজ এভিয়েশন নিউজ
প্রতিপক্ষ নির্মূলে কড়া ভাষাও ব্যবহার করেন এ জেনারেল। লেখেন, ‘আপনি যদি কোনো প্রজাতিকে নিশ্চিহ্ন করতে চান, তবে আকাশে ওড়া পাখিগুলোকে গুলি করলেই হবে না। ডিম ও বাসাগুলো ধ্বংস করতে হবে।’
দুয়ের এ তত্ত্ব বেসামরিক জনগণের মনোবল ভেঙে দেয়ার ওপর জোর দেয়। জার্মান শাসক অ্যাডলফ হিটলারের আকাশ থেকে হামলায় এ কৌশলে প্রভাব ফেলেছিল। যার উদাহরণ গের্নিকা ধ্বংস ও লন্ডনে দীর্ঘমেয়াদি বোমাবর্ষণে দেখা যায়। কৌশলটি একইসঙ্গে মার্কিন সামরিকবিদদেরও আকৃষ্ট করে। এর মধ্যে আছেন কুর্টিস লেমে। জাপানের অনেক শহরে অগ্নিবোমা হামলা, অপারেশন স্টারভেশন ও হিরোশিমা-নাগাসাকিতে পরমাণু হামলার তত্ত্বাবধারে ছিলেন তিনি।
জুলিও দুয়ের বই মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ পড়েছেন কিনা তা স্পষ্ট নয়। তবে ট্রাম্পের ইরানবিরোধী ‘এপিক ফিউরি’ বিমান অভিযানের বিষয়ে তার জোরালো ব্রিফিংগুলোয় সেই পুরনো ধারণার ছাপ স্পষ্ট। হেগসেথের দাবি, নতুন ধরনের কৌশল প্রয়োগ করছেন তারা। যা কি-না ‘ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাণঘাতী ও নিখুঁত আকাশ অভিযান’। কিন্তু বাস্তবে এটি নতুন কিছু নয়, বরং পুরনো ধারণারই পুনরাবৃত্তি।
জুলিও দুয়ে যেমন দ্রুততম সময়ে সর্বোচ্চ ক্ষতির কথা বলেছিলেন, হেগসেথও একই সুরে কথা বলেন। তার মতে, সংখ্যাই নিজেই একটি গুণ। তাই ইরানে মার্কিন হামলার পরিমাণ ক্রমাগত বাড়ানো হচ্ছে
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও পিট হেগসেথ। ছবি: রয়টার্স
১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধ, ১৯৯৯ সালের সার্বিয়ার বিরুদ্ধে আকাশযুদ্ধ এবং ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধ প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, নতুন প্রযুক্তি ও শক্তিশালী আকাশ ব্যবস্থা যুদ্ধের ধরন বদলে দেবে বলে সামরিক নেতারা বিশ্বাস করেছেন। কিন্তু বাস্তবে সেই ‘বিপ্লব’ বারবারই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি।
জুলিও দুয়ে যেমন দ্রুততম সময়ে সর্বোচ্চ ক্ষতির কথা বলেছিলেন, হেগসেথও একই সুরে কথা বলেন। তার মতে, সংখ্যাই নিজেই একটি গুণ। তাই ইরানে মার্কিন হামলার পরিমাণ ক্রমাগত বাড়ানো হচ্ছে।
দুয়ে বিশ্বাস করতেন, বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করলে নিজেদের সরকারকে যুদ্ধ বন্ধে বাধ্য করবে জনগণ। হেগসেথও সেই মনোবল ভাঙার কথা বলেন, যদিও সরাসরি বেসামরিকদের লক্ষ্য করার কথা বলেননি।
তবে সমালোচকদের মতে, এই ধারণার বড় সীমাবদ্ধতা হলো ‘মানুষের অপরিবর্তিত স্বভাব’। সাবেক সরকারি কর্মকর্তা উইনসলো হুইলারের ভাষায়, প্রযুক্তি যত উন্নত হোক, মানুষের প্রতিক্রিয়া অনিশ্চিতই থাকে। অনেক সময় বোমা হামলা আত্মসমর্পণ নয়, বরং প্রতিরোধ ও ঐক্য বাড়ায়। যেমন জার্মানির হামলা ব্রিটিশদের দুর্বল করেনি, বরং আরো ঐক্যবদ্ধ করেছিল।
১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধে প্রথমবারের মতো টিভিতে ‘নিখুঁত’ আকাশ হামলার দৃশ্য দেখানো হয়। কিন্তু পরে দেখা যায়, সেই সাফল্যের অনেক দাবিই অতিরঞ্জিত ছিল
ভিয়েতনাম যুদ্ধেও ‘আকাশ থেকে নিয়ন্ত্রণ’ ধারণার প্রয়োগ করে যুক্তরাষ্ট্র। ভেবে নেয়া হয়েছিল, উন্নত সেন্সর প্রযুক্তি দিয়ে হো চি মিন ট্রেইল বা সরবরাহ ব্যবস্থা বন্ধ করা যাবে। কিন্তু উত্তর ভিয়েতনামের যোদ্ধারা খুব সাধারণ কৌশলে প্রযুক্তিকে বিভ্রান্ত করে দেয়। ওই সময়ে মানুষের রক্ত, প্রস্রাব ও ঘাম শনাক্ত করে হামলা করা হতো। কিন্তু ভিয়েতনামি যোদ্ধারা সেন্সরকে ধোঁকা দিতে পশুর প্রস্রাবও ব্যবহার করেছে।
১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধে প্রথমবারের মতো টিভিতে ‘নিখুঁত’ আকাশ হামলার দৃশ্য দেখানো হয়। কিন্তু পরে দেখা যায়, সেই সাফল্যের অনেক দাবিই অতিরঞ্জিত ছিল। ১৯৯৬ সালের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, এফ-১১৭এ জেট বিমানের সাফল্যের হার দাবিকৃত ৮০ শতাংশ নয়, বরং ৪১-৬০ শতাংশের মধ্যে।
সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রে প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটি। ছবি: রয়টার্স
১৯৯৯ সালের কসোভো যুদ্ধে হাজার হাজার বোমা ফেলেও সার্বিয়ার ৩০০ ট্যাংকের মধ্যে মাত্র ১৩টি ধ্বংস করা সম্ভব হয়। ২০০৩ সালের ‘শক অ্যান্ড অ’ অভিযানেও একই চিত্র দেখা যায়। প্রাথমিক আকাশ হামলা সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতা থেকে সরাতে পারেনি; শেষ পর্যন্ত স্থলবাহিনী প্রয়োজন হয়।
সমালোচকদের মতে, ভিয়েতনাম, ইরাক বা কসোভো কোনো ক্ষেত্রেই আকাশ শক্তি একাই যুদ্ধ জেতাতে পারেনি। এখন নতুন দাবি হলো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই যুদ্ধের চিত্র বদলে দেবে। পিট হেগসেথ বলছেন, ‘আমাদের অনেক স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা আছে, যেগুলো স্মার্ট এআই দ্বারা পরিচালিত।’
কিন্তু প্রশ্ন রয়ে যায়, এবার কি সত্যিই সেই পুরনো সমস্যার সমাধান হয়েছে? নাকি ‘আকাশপথে সহজ জয়ের’ সেই শতবর্ষ পুরনো ভ্রমই ফের যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন এক জটিল ও সহিংস সংঘাতে জড়িয়ে ফেলছে?