ভারতের জনসংখ্যার নতুন সমীকরণ

শিশু জন্মের হার কম, এবার কি বার্ধক্যের চ্যালেঞ্জের মুখে ভারতের অর্থনীতি?

জনসংখ্যার ‘বিস্ফোরণ’ থেকে ‘সংকোচন’: ভারতের সামনে নতুন বাস্তবতা কেন?

ভারতের সর্বশেষ নমুনা নিবন্ধন পদ্ধতির (এসআরএস) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশটির মোট জন্মহার কমে দাঁড়িয়েছে ১.৯ এ। অথচ দীর্ঘমেয়াদে জনসংখ্যা ধরে রাখার জন্য এই হার অন্তত ২.১ থাকা প্রয়োজন। ২০০০ সালের দিকেও এ হার ছিল প্রায় ৩ দশমিক ৩। অর্থাৎ পরিবর্তনটি শুধু দৃশ্যমানই নয়, বরং বেশ দ্রুতও।

এক সময় ভারতের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ ছিল জনসংখ্যা বিস্ফোরণ। পরিবার ছোট রাখতে সরকারকে নিতে হয়েছিল নানা কর্মসূচি। এমনকি সত্তরের দশকে বিতর্কিত জোরপূর্বক বন্ধ্যাকরণ কর্মসূচিও চালানো হয়েছিল। কিন্তু কয়েক দশক পর সেই দেশই এখন ঠিক উল্টো এক বাস্তবতার মুখোমুখি।

নতুন সরকারি জরিপ বলছে, ভারতে জন্মহার এমন এক পর্যায়ে নেমে এসেছে, যেখানে দীর্ঘমেয়াদে জনসংখ্যা আর স্থিতিশীল থাকবে না। ফলে অর্থনীতি, শ্রমবাজার ও ভবিষ্যতের সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

ভারতের সর্বশেষ নমুনা নিবন্ধন পদ্ধতির (এসআরএস) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশটির মোট জন্মহার কমে দাঁড়িয়েছে ১.৯ এ। অথচ দীর্ঘমেয়াদে জনসংখ্যা ধরে রাখার জন্য এই হার অন্তত ২.১ থাকা প্রয়োজন। ২০০০ সালের দিকেও এ হার ছিল প্রায় ৩ দশমিক ৩। অর্থাৎ পরিবর্তনটি শুধু দৃশ্যমানই নয়, বরং বেশ দ্রুতও।

কেন কমছে জন্মহার?

প্রশ্ন হলো, এত দ্রুত জন্মহার কমল কেন? অর্থনীতিবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, এর পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। নারীদের শিক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধি, জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সহজলভ্যতা এবং পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীদের স্বাধীনতা বাড়ার কারণেই এই পরিবর্তন এসেছে। একই সঙ্গে শিশু মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাওয়াও বড় একটি কারণ।

২০১৯ সালে প্রতি হাজার জীবিত জন্মে যেখানে ৩০টি শিশুমৃত্যু ঘটত, ২০২৪ সালে তা কমে ২৪ জনে দাঁড়িয়েছে। সন্তান বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা বাড়ায় বেশি সন্তান নেয়ার প্রবণতাও কমেছে।

তবে ভারতের সব রাজ্যের চিত্র এ রকম নয়। বিহার ও উত্তর প্রদেশের মতো দরিদ্র এবং কম শিক্ষিত রাজ্যগুলোতে জন্মহার এখনো যথাক্রমে ২.৯ এবং ২.৬। অন্যদিকে উন্নত স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ব্যবস্থার কারণে রাজধানী নয়াদিল্লিতে এই হার মাত্র ১.২ এবং দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য কেরালা ও তামিলনাড়ুতে ১.৩। এছাড়া আধুনিক যুগে সন্তান লালন-পালনের ক্রমবর্ধমান খরচও অনেক পরিবারকে ছোট সংসারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

জন্মহার কমার সবচেয়ে বড় প্রভাব কোথায়?: শ্রমবাজার থেকে অর্থনীতি

ভারতের জন্মহার অর্থাৎ জনসংখ্যা পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে দেশটির অর্থনীতিতে। কারণ ২০০৫ সাল থেকে ভারত তথাকথিত ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বা জনমিতিক লভ্যাংশের যুগে প্রবেশ করেছে। এর অর্থ হলো এ দেশে কর্মক্ষম মানুষের (১৫-৬৪ বছর) সংখ্যা নির্ভরশীল শিশু ও বয়স্কদের তুলনায় বেশি। অতীতে জাপান, সিঙ্গাপুর, হংকং ও পরে চীন এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে দ্রুত অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জন করেছিল। ভারতও এ সুবিধা পেয়েছে, কিন্তু এখনো বিপুলসংখ্যক মানুষ বেকার এবং দেশটি উন্নত অর্থনীতির কাতারে পৌঁছাতে পারেনি।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, জন্মহার কমতে থাকলে কয়েক দশক পর কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমে যাবে। আর বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দ্রুত বাড়বে। তখন শ্রমবাজার ও অর্থনীতি দুটিই চাপে পড়তে পারে।

অসম জন্মহার ও রাজনীতির নতুন মেরুকরণ

জন্মহার নিয়ে ভারতের রাজনীতিও নতুন মোড় নিচ্ছে। উত্তর ভারতের জনসংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকায় ভবিষ্যতে সংসদীয় আসন পুনর্বিন্যাসে দক্ষিণের রাজ্যগুলোর প্রতিনিধিত্ব কমে যেতে পারে এমন আশঙ্কা রয়েছে। ভারতের দক্ষিণের রাজ্যগুলো এরই মধ্যে অভিযোগ করছে, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সফল হওয়ায় কেন্দ্রীয় অনুদানে তারা বৈষম্যের শিকার হচ্ছে।

এদিকে চলতি বছরে শুরু হওয়া নতুন আদমশুমারি শেষে ২০২৭ সালে যখন লোকসভার আসন পুনর্বিন্যাস বা ‘ডিলিমিটেশন’ করা হবে, তখন দক্ষিণের রাজ্যগুলোর রাজনৈতিক ক্ষমতা কমে যাওয়ার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে।

অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় অর্থ বরাদ্দ নিয়েও নতুন বিতর্ক তৈরি হতে পারে। এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে মুসলিমদের জন্মহার নিয়ে যে রাজনৈতিক প্রচারণা চলে আসছে, সাম্প্রতিক তথ্য সেটিকেও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, ১৯৯২ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে মুসলিমদের প্রজনন হার ৪ দশমিক ৪১ থেকে ২ দশমিক ৩৬ এ নেমেছে, যা অন্য যেকোনো ধর্মীয় গোষ্ঠীর তুলনায় দ্রুত। একই সময়ে হিন্দুদের ক্ষেত্রে জন্মহার ৩ দশমিক ৩ থেকে ১ দশমিক ৯৪ এ নেমে এসেছে। অর্থাৎ প্রায় সব ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যেই জন্মহার দ্রুত কমছে।

শুধু ভারত নয়, একই সংকটে আরও কয়েকটি এশীয় দেশ

পরিস্থিতি সামাল দিতে ভারতের কিছু রাজ্য এরই মধ্যে পদক্ষেপ নেয়া শুরু করেছে। যেমন অন্ধ্রপ্রদেশ সরকার তৃতীয় ও চতুর্থ সন্তানের জন্মের জন্য যথাক্রমে ৩০ হাজার ও ৪০ হাজার রুপি আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে। এছাড়া গোয়া ও কর্ণাটকের মতো রাজ্যগুলোতে সরকারি খরচে আইভিএফ চিকিৎসার সুবিধাও দেয়া হচ্ছে।

তবে সামাজিক বিশ্লেষকরা বলছেন, কেবল সন্তান জন্মদানে উৎসাহ দেওয়াই যথেষ্ট নয়। ভারতকে এখনই এমন এক দূরদর্শী জাতীয় নীতি গ্রহণ করতে হবে যা ভবিষ্যৎ প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, পেনশন ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে।

তাই জনসংখ্যা অসামঞ্জস্যতার ভয় কাটিয়ে ভারত এখন চীন, তাইওয়ান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলোর মতো জনমিতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। এটি দেশটির অর্থনীতি ও রাজনীতিকে নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে। আর এই রূপবদল কেবল একটি সংখ্যাগত পরিবর্তন নয়। বরং এটিই আগামী দিনের ভারতের শ্রমবাজার ও সামাজিক স্থিতিশীলতার মূল নিয়ামক। তাই ভবিষ্যৎ সংকট এড়াতে এখনই সঠিক দূরদর্শী পরিকল্পনা ও জনগণের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।

—আলজাজিরা ও রয়টার্সসহ আরো বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে

আরও