আল জাজিরা

ক্লিনটন থেকে ট্রাম্প: মার্কিন প্রেসিডেন্টদের সঙ্গে পুতিনের শুরুতে সখ্যতা ও পরে হতাশার গল্প

জ্যাজ কনসার্ট ও মাছ ধরার সফরও যে শেষমেশ হুমকি ও উত্তেজনার দিকে যেতে পারে, সেসব ইঙ্গিত পাওয়া যাবে অতীতের এসব সাক্ষাতে।

স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী সময় থেকে ২০০০ সালের শুরুর দিক পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া বন্ধুত্বের প্রত্যাশা প্রতিফলিত হওয়ায় প্রাথমিক সাক্ষাৎগুলো ছিল তুলনামূলকভাবে উষ্ণ। কিন্তু এর পরের বছরগুলোতে, বিশেষত ওবামা ও বাইডেনের সঙ্গে পুতিনের সম্পর্ক ক্রমেই শীতল হয়েছে।

রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে আলাস্কায় শীর্ষ বৈঠকে বসার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখন তিনি এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্টদের সঙ্গে ৪৮টি সাক্ষাতের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পারেন। গত ২৫ বছরে রাশিয়ার নেতা হিসেবে পুতিন পাঁচজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও কাজ করেছেন— বিল ক্লিনটন, জর্জ ডব্লিউ বুশ, বারাক ওবামা, ট্রাম্প এবং জো বাইডেন।

স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী সময় থেকে ২০০০ সালের শুরুর দিক পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া বন্ধুত্বের প্রত্যাশা প্রতিফলিত হওয়ায় প্রাথমিক সাক্ষাৎগুলো ছিল তুলনামূলকভাবে উষ্ণ। কিন্তু এর পরের বছরগুলোতে, বিশেষত ওবামা ও বাইডেনের সঙ্গে পুতিনের সম্পর্ক ক্রমেই শীতল হয়েছে। কারণ হিসেবে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অবনতির কথা বলা যায়।

এখানে আগের কিছু গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাতের সারসংক্ষেপ দেয়া হলো। জ্যাজ কনসার্ট ও মাছ ধরার সফরও যে শেষমেশ হুমকি ও উত্তেজনার দিকে যেতে পারে, সেসব ইঙ্গিত পাওয়া যাবে অতীতের এসব সাক্ষাতে।

জুন ২০০০: পুতিন-ক্লিনটন

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণের তিন মাসেরও কম সময় পর, পুতিন মস্কোতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনকে আতিথ্য দেন। তিনি ক্লিনটনকে ক্রেমলিন ঘুরিয়ে দেখান, এরপর এক রুশ জ্যাজ ব্যান্ড তাদের সামনে পারফর্ম করে।

ক্লিনটন রাশিয়ার দুটি অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি অনুমোদনের সিদ্ধান্তকে অভিনন্দন জানান। তিনি বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ইয়েলৎসিন রাশিয়াকে স্বাধীনতার পথে নিয়ে গেছেন। প্রেসিডেন্ট পুতিনের নেতৃত্বে রাশিয়ার কাছে এখন সমৃদ্ধি ও শক্তি গড়ে তোলার সুযোগ আছে, সেইসঙ্গে স্বাধীনতা ও আইনের শাসন রক্ষারও।‘

বিল ক্লিনটনের সঙ্গে পুতিন। ছবি-এপি

পুতিন যুক্তরাষ্ট্রকে ‘আমাদের অন্যতম প্রধান অংশীদার’ বলে উল্লেখ করে প্রতিশ্রুতি দেন, মস্কো আর কখনো ওয়াশিংটনের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘাতে যাবে না।

তবে ক্লিনটন স্বীকার করেন, চেচনিয়া নিয়ে তাদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। ১৯৯৯ সালে একাধিক অ্যাপার্টমেন্ট বিস্ফোরণে ৩০০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। সে ঘটনায় মস্কো চেচেন বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দায়ী করেছিল।

২০০০ সালে এই বৈঠকটি ছিল পুতিন-ক্লিনটনের মধ্যে চারবারের সাক্ষাতের প্রথমটি। বাকিগুলো ছিল বহুপাক্ষিক ইভেন্টের ফাঁকে।

নভেম্বর ২০০১: পুতিন-বুশ

১১ সেপ্টেম্বর হামলার পর, পুতিন ছিলেন প্রথম বিশ্বনেতা যিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশকে ফোন করে সমর্থন জানান। দুই মাস পরে, বুশ পুতিনকে টেক্সাসের ক্রফোর্ডে তার র‍্যাঞ্চে আতিথ্য দেন।

বুশ বলেন, ‘যখন আমি হাইস্কুলে ছিলাম, রাশিয়া ছিল শত্রু। এখন হাইস্কুলের শিক্ষার্থীরা রাশিয়াকে বন্ধু হিসেবে দেখতে পারবে; আমরা একসঙ্গে কাজ করছি পুরনো সম্পর্ক ভাঙতে, নতুন সহযোগিতা ও বিশ্বাসের মনোভাব গড়ে তুলতে, যাতে আমরা একসঙ্গে বিশ্বকে আরো শান্তিপূর্ণ করতে পারি।‘

জর্জ ডব্লিউ বুশ ও ভ্লাদিমির পুতিন। ছবি-এপি

বুশ নিজে পিকআপ ট্রাক চালিয়ে পুতিনকে র‍্যাঞ্চের একটি জলপ্রপাত দেখাতে নিয়ে যান।

তবে নভেম্বর ২০০২-এ রাশিয়ায় তাদের পরবর্তী বৈঠকের সময়, ন্যাটো সম্প্রসারণের মার্কিন প্রচেষ্টা সম্পর্কের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি করেছিল।

জুলাই ২০০৭: পুতিন-বুশ

২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক আক্রমণ দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা আরো বাড়ায়। তবুও ব্যক্তিগত সম্পর্কে উষ্ণতা বজায় রাখেন বুশ। তিনি পুতিনকে তার বাবা-মায়ের বাড়ি, কেনেবাঙ্কপোর্ট, মেইনে আমন্ত্রণ জানান।

তারা উভয়েই মতপার্থক্যের বিষয়গুলো স্বীকার করলেও পরস্পরের স্বচ্ছতার প্রশংসা করেন। বুশ পুতিনকে নিয়ে মাছ ধরতে যান। একমাত্র পুতিনই একটি মাছ ধরেন — যা পরে ছেড়ে দেয়া হয়েছিল বলে পুতিন জানান।

এপ্রিল ২০০৮: পুতিন-বুশ

প্রেসিডেন্ট হিসেবে বুশ ও পুতিনের শেষ বৈঠক হয় রাশিয়ার সোচিতে। মূল আলোচ্য ছিল ইউরোপে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা, যা রাশিয়া বিরোধিতা করছিল। কোনো সমাধান হয়নি তখন। দুই নেতা একমত হয়েছিলেন যে, এ বিষয়ে একমত হওয়া সম্ভব নয়। তবে ব্যক্তিগত সম্পর্ক অটুট ছিল। বুশ-পুতিন মোট ২৮ বার সাক্ষাৎ করেন, যা বুশের সঙ্গে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের সাক্ষাতের চেয়েও বেশি।

জুলাই ২০০৯: পুতিন-ওবামা

এ সময় পুতিন রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী, আর প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা মস্কো সফরে পুতিনের সঙ্গে দেখা করেন।

২০০৮ সালে রাশিয়ার জর্জিয়া আক্রমণের বিরোধিতা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র, যা সম্পর্ককে তিক্ত করে। ওবামা বলেন, ‘আমরা হয়তো সব বিষয়ে একমত হতে পারব না, তবে আমরা পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও পরামর্শের সুর বজায় রাখতে পারি, যা আমেরিকান ও রুশ জনগণের জন্য ভালো হবে।‘

জুন ২০১৩: পুতিন-ওবামা

উত্তর আয়ারল্যান্ডে জি-৮ সম্মেলনের ফাঁকে পুতিন ও ওবামার সাক্ষাৎ হয়। তাদের হতাশা প্রকাশ পায় একটি বিব্রতকর ছবিতে, যা শিরোনাম হয়েছিল।

ছবি-এপি

সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্ররা চান প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ পদত্যাগ করুন, কিন্তু রাশিয়া তাকে সমর্থন করছিল।

ওবামা সে ব্যাপারে বলেন, ‘সিরিয়াকে ঘিরে আমাদের ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি আছে, তবে আমরা সহিংসতা কমাতে, রাসায়নিক অস্ত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং সেগুলো যাতে ব্যবহার বা ছড়িয়ে না পড়ে তা নিশ্চিত করতে আগ্রহী।‘

নভেম্বর ২০১৬: পুতিন-ওবামা

এপেক সম্মেলনে, পেরুতে তাদের নবম ও শেষ বৈঠক প্রায় কোনো সৌহার্দ্য ছাড়াই অনুষ্ঠিত হয়।

রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ২০১৪ সালে ইউক্রেনের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ভিক্টর ইয়ানুকোভিচের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান ঘটানোর অভিযোগ করে। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ক্রিমিয়া দখলের জন্য রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেয়।

এ বৈঠকে ওবামা পুতিনকে মিনস্ক চুক্তির প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার আহ্বান জানান, যা ইউক্রেনে শান্তি আনার জন্য করা হয়েছিল। পুরো কথোপকথন ছিল মাত্র চার মিনিটের।

জুলাই ২০১৮: পুতিন-ট্রাম্প

প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার দেড় বছর পর, ট্রাম্প হেলসিঙ্কিতে পুতিনের সঙ্গে দেখা করেন। ২০১৬ সালের মার্কিন নির্বাচনে রাশিয়ার হস্তক্ষেপের অভিযোগ তখনো ট্রাম্পের বিজয়কে বিতর্কিত করে রেখেছিল।

দুই নেতা দোভাষীদের মাধ্যমে কথা বলেন। সেখানে আর কেউ উপস্থিত ছিল না। বৈঠকের পর পুতিন বলেন, ‘স্নায়ুযুদ্ধ অতীত। বিশ্ব আজ পরিবেশ সংকট থেকে সন্ত্রাসবাদ পর্যন্ত নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, যা আমরা একসঙ্গে কাজ করেই মোকাবেলা করতে পারি।‘

ছবি-এপি

তবে সংবাদ শিরোনামে আসে ট্রাম্পের বক্তব্য। তিনি স্বীকার করেন যে, নির্বাচনে রুশ হস্তক্ষেপের অভিযোগ নিয়ে পুতিনের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তবে তিনি বলেন, ‘আমার গোয়েন্দা সংস্থার ওপর যথেষ্ট আস্থা আছে, তবে আজ প্রেসিডেন্ট পুতিন খুবই দৃঢ় ও শক্তিশালীভাবে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, এটা রাশিয়া নয়। আমি বলব, এর কোনো কারণ দেখি না যে এটা রাশিয়া হবে।‘

প্রথম মেয়াদে ট্রাম্প মোট ছয়বার পুতিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

জুন ২০২১: পুতিন-বাইডেন

মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন জেনেভায় পুতিনের সঙ্গে একমাত্র সরাসরি বৈঠকে মিলিত হন। সম্পর্ক তখন পৌঁছেছিল তলানিতে। কারণ কয়েক মাস আগে বাইডেন পুতিনকে ‘খুনি’ বলেছিলেন। তার জেরে উভয় দেশই রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার করে নেয়।

জো বাইডেনের সঙ্গে পুতিন। ছবি-এপি

জেনেভা বৈঠকে সম্পর্ক কিছুটা পুনঃস্থাপিত হয়। রাষ্ট্রদূত পুনঃনিয়োগে রাজি হয় উভয় দেশ। তবে বাইডেন রুশ নির্বাচনী হস্তক্ষেপ ও সাইবার হামলা নিয়ে স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিয়ে জানান, ওয়াশিংটন প্রয়োজনে পাল্টা সাইবার হামলা চালাতে পারে।

সেসময়ই রাশিয়া ইউক্রেন সীমান্তে সেনা সমাবেশ শুরু করেছিল। দুই দেশের সম্পর্কে উত্তেজনার বড় কারণ ছিল এটি।

আট মাস পর, ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আক্রমণ চালায় রাশিয়া। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ এটি। এ যুদ্ধ শেষ করতে ১৫ আগস্ট আলাস্কায় বৈঠকে বসার কথা ট্রাম্পের।

আরও