মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কর্মকর্তারা এমন ইঙ্গিতপূর্ণ বক্তব্য দিচ্ছেন, যাতে মনে হয় ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান পুরোপুরি ধর্মীয় যুদ্ধ। গত মঙ্গলবার বিষয়টি নিয়ে নিন্দা জানিয়েছে মুসলিম নাগরিক অধিকার সংগঠন কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস (সিএআইআর)। তারা বলছে, পেন্টাগনের এ ধরনের ভাষা ব্যবহার ‘বিপজ্জনক’ ও ‘মুসলিমবিরোধী’।
একটি মার্কিন নজরদারি সংস্থা জানিয়েছে, দেশটির সেনাদের বলা হয়েছে এ যুদ্ধের উদ্দেশ্য বাইবেলে বর্ণিত ‘শেষ সময়’। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, ইরান পরিচালনা করছে ‘ধর্মীয় উগ্রপন্থী উন্মাদরা’।
মার্কিন ও ইসরায়েলি নেতারা কী বলছেন?
অলাভজনক সংগঠন মিলিটারি রিলিজিয়াস ফ্রিডম ফাউন্ডেশন (এমআরএফএফ) মার্কিন সেনাদের ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষার জন্য কাজ করে। সংস্থাটি জানিয়েছে, তারা ইমেইলে অভিযোগ পেয়েছে। যেখান থেকে জানা যাচ্ছে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের উদ্দেশ্য হিসেবে সেনাদের কাছে ‘আর্মাগেডন’ ঘটানো অর্থাৎ বাইবেলে উল্লেখিত পৃথিবীর শেষ সময়ে উপনীত হওয়াকে বর্ণনা করা হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ননকমিশনড অফিসার এমআরএফএফকে লিখেছেন, ‘এটি ঈশ্বরের ঐশ্বরিক পরিকল্পনার অংশ’ এমন উক্তির মাধ্যমে সেনা সদস্যদের উদ্দীপ্ত করার নির্দেশ নিয়েছেন এক কমান্ডার। ওই কমান্ডার বাইবেলের ‘বুক অব রেভেলেশন’ থেকে একাধিক উদ্ধৃতি উল্লেখ করেছেন। আর্মাগেডন ও যিশু খ্রিস্টের আসন্ন প্রত্যাবর্তনের কথা বলেন তিনি।
ওই অফিসার আরো দাবি করেন, ইউনিটকে বলেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিযুক্ত করেছেন যিশু, যাতে তিনি ইরানে ‘অগ্নি সংকেত’ দিয়ে আর্মাগেডন ঘটান এবং পৃথিবীতে যিশুর প্রত্যাবর্তনের সূচনা করেন।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের নেতারাও প্রকাশ্য বক্তব্যে ধর্মীয় ভাষা ব্যবহার করে আসছেন। গত মাসে ইসরায়েলে মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হ্যাকাবে রক্ষণশীল মার্কিন ভাষ্যকার টাকার কার্লসনকে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ইসরায়েল যদি ‘পুরো মধ্যপ্রাচ্য’ নিয়ে নেয় তাতেও সমস্যা নেই। কারণ বাইবেলে এ ভূমি তাদের জন্য প্রতিশ্রুত। যদিও তিনি যোগ করেন, ইসরায়েল এমন কিছু করার চেষ্টা করছে না।
গত মঙ্গলবার সাংবাদিকদের মার্কো রুবিও বলেন, ‘ইরান পরিচালিত হচ্ছে উন্মাদদের হাতে, ধর্মীয় উগ্রপন্থী পাগলরা। তাদের পারমাণবিক অস্ত্র পাওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা রয়েছে।’
এর এক দিন আগে পেন্টাগনে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, ‘ইরানের মতো পাগল শাসনব্যবস্থা, যারা ভবিষ্যদ্বাণীমূলক ইসলামি বিভ্রমে আচ্ছন্ন, তাদের পারমাণবিক অস্ত্র থাকা চলবে না।’
সিএআইআর বলেছে, হেগসেথের মন্তব্যটি সম্ভবত শিয়া বিশ্বাসের ওই ধারণার দিকে ইঙ্গিত, যেখানে শেষ সময়ের কাছাকাছি ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের আবির্ভাবের কথা বলা হয়।
গত রোববার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ধর্মীয় গ্রন্থ তোরাহ উল্লেখ করে ইরানকে বাইবেলের এক প্রাচীন শত্রু আমালেকের সঙ্গে তুলনা করেন। ইহুদি ঐতিহ্যে ‘আমালেক’ হলো ‘অশুভের প্রতীক’।
তোরাহ উদ্ধৃত করেন তিনি, ‘মনে রাখো আমালেক তোমার সঙ্গে কী করেছিল।’ এরপর জানান, আমালেক কী করেছে মনে রাখা হয়েছে এবং পদক্ষেপও নেয়া হচ্ছে।
সিএআইআর বলেছে, ‘আমরা অবাক নই যে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আবারো আমালেকের বাইবেলীয় কাহিনি ব্যবহার করছেন। যেখানে বলা হয়েছে, ঈশ্বর ইসরায়েলিদের নির্দেশ দিয়েছিলেন এমন এক পৌত্তলিক জাতির প্রতিটি পুরুষ, নারী, শিশু ও পশুকে হত্যা করতে; যারা তাদের আক্রমণ করেছিল। তিনি গাজায় যেমন করেছিলেন, তেমনিভাবে এখন ইরানে বেসামরিক মানুষ হত্যাকে ন্যায্যতা দিতে এটি ব্যবহার করছেন।’
সংগঠনটি আরো বলছে, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে ন্যায্যতা দিতে মার্কিন সামরিক বাহিনী, হেগসেথ ও নেতানিয়াহু যে ‘পবিত্র যুদ্ধের’ ভাষা ব্যবহার করছেন, তাতে প্রত্যেক মার্কিন নাগরিকেরই গভীরভাবে উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত।
‘ইসলামপন্থী ভবিষ্যদ্বাণীমূলক বিভ্রম সম্পর্কে হেগসেথের তাচ্ছিল্যপূর্ণ মন্তব্য সম্ভবত শিয়া বিশ্বাসের প্রতি ইঙ্গিত, যা গ্রহণযোগ্য নয়। একইভাবে মার্কিন সামরিক কমান্ডাররা যেভাবে বলেন ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বাইবেলীয় আর্মাগেডনের পথে একটি ধাপ, এটিও গ্রহণযোগ্য নয়।’
কেন এ সংঘাতকে ধর্মীয় যুদ্ধ হিসেবে তুলে ধরছেন নেতারা?
যুক্তরাজ্যের ডারহাম ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জলিয়ন মিচেল বলেন, এ সংঘাতকে পবিত্র যুদ্ধ হিসেবে উপস্থাপন করার মাধ্যমে নেতারা ধর্মীয় বিশ্বাসকে ব্যবহার করছেন। যা কোনো পদক্ষেপকে ন্যায্যতা, রাজনৈতিক সমর্থন জোগাতে ও জনমত সংগঠিত করতে ব্যবহৃত হয়।
তিনি বলেন, ‘এ সংঘাতের উভয় পক্ষের অনেকেই বিশ্বাস করেন যে ঈশ্বর তাদের পাশে আছেন। অনেক সংঘাতের মতো এখানেও ঈশ্বরকে সহিংসতার সমর্থনে ব্যবহার করা হচ্ছে। শত্রুকে দানবায়িত করা ও মানবিকতা থেকে বঞ্চিত করা ভবিষ্যতে শান্তি প্রতিষ্ঠাকে আরো কঠিন করে তোলে।’
কাতারের নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ইব্রাহিম আবু শরীফ বলেন, ‘এর পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে এবং এগুলো বিভিন্ন স্তরে কাজ করে। স্থানীয় জনসমর্থন জোগানো, সভ্যতার সংঘাতের কাঠামো তৈরি ও কৌশলগত বয়ান নির্মাণ।’
চলতি সপ্তাহে সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো এক ভিডিওতে খ্রিস্টান জায়নবাদী পাদ্রি ও টেলিভ্যাঞ্জেলিস্ট জন হাগে ইরান হামলার সমর্থনে বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, রাশিয়া, তুরস্ক, ‘ইরানের যা অবশিষ্ট থাকবে’ এবং ‘ইসলামি গোষ্ঠীগুলো’ ইসরায়েলের দিকে অগ্রসর হবে। তখন ইসরায়েলের ‘শত্রুদের’ ধ্বংস করবেন ঈশ্বর।
আবু শরীফ বলেন, ‘ধর্মীয় ভাষা স্থানীয় সমর্থন জোগাতে সাহায্য করে।’ বিষয়টি তিনি এভাবে ব্যাখ্যা করেন, যুক্তরাষ্ট্রে এটি বিশেষভাবে ইভাঞ্জেলিকাল খ্রিস্টান ও খ্রিস্টান জায়নবাদীদের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত। কারণ তারা মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধগুলোকে ধর্মীয় ‘শেষ সময়ের’ কাহিনির অংশ হিসেবে দেখেন।
‘শেষ সময়, বুক অব রেভেলেশন বা বাইবেলের শত্রুদের উল্লেখ কোনো আকস্মিক বিষয় নয়; এগুলো এমন এক সাংস্কৃতিক বয়ানকে সক্রিয় করে যা এরই মধ্যে মার্কিন রাজনৈতিক ধর্মতত্ত্বে বিদ্যমান।’
সভ্যতার সংঘাতের কাঠামো তৈরি করা বলতে বোঝায় ‘আমরা বনাম তারা’ বিভাজন। যেখানে সংঘাতকে শুধু সীমান্ত বা নীতিগত বিরোধ নয়, বরং জীবনধারা বা বিশ্বাসের সংঘর্ষ হিসেবে দেখানো হয়। এ কারণেই হেগসেথের ‘ইসলামি ভবিষ্যদ্বাণীমূলক বিভ্রম’ মন্তব্যের মতো বক্তব্য সাধারণ মানুষের কাছে যুদ্ধের বিষয়টিকে সহজভাবে উপস্থাপন করে।
আবু শরীফ বলেন, ‘জটিল কৌশলগত ভাষায় যুদ্ধকে ন্যায্যতা দেয়া কঠিন। কিন্তু যখন সংঘাতকে “সভ্যতা বনাম উগ্রতা” বা বাইবেলীয় “ভালো বনাম মন্দ” হিসেবে দেখানো হয়, তখন জটিল আঞ্চলিক সংঘর্ষ সাধারণ মানুষের কাছে সহজবোধ্য নৈতিক দ্বন্দ্বে পরিণত হয়।’
তিনি আরো জানান, ইসরায়েলি নেতৃত্ব দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক ভাষা হিসেবে বাইবেলকে উল্লেখ করে আসছে। ইসরায়েলি রাজনৈতিক আলোচনায় এ ভাষা সমসাময়িক সংঘাতকে ইহুদি জাতির ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত করে এবং এটিকে অস্তিত্বগত লড়াই হিসেবে তুলে ধরে।
আগেও সংঘাত প্রসঙ্গে নেতারা ধর্মের আশ্রয় নিয়েছিল?
নেতানিয়াহু ও অন্যান্য ইসরায়েলি কর্মকর্তা এর আগে গাজায় ফিলিস্তিনিদের প্রসঙ্গেও ‘আমালেক’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। যুদ্ধ বা সামরিক সংঘর্ষের সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও শীর্ষ কর্মকর্তারাও বাইবেলের উল্লেখ বা খ্রিস্টীয় ভাষা ব্যবহার করেছেন।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর টুইন টাওয়ার হামলার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ একই ধরনের ভাষা ব্যবহার করেছিলেন। ওই বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর তিনি বলেন, ‘এ ক্রুসেড, এ সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ, কিছুটা সময় নেবে।’
১১শ-১৩শ শতকের মধ্যে সংঘটিত একাধিক ধর্মীয় যুদ্ধ হলো ক্রুসেড, যেখানে পোপের নেতৃত্বে মুসলিম শাসকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালিত হয়।
পরে হোয়াইট হাউজ এ ধরনের শব্দ ব্যবহার থেকে দূরত্ব তৈরি করার চেষ্টা করে। এটা স্পষ্ট করতে যে বুশ মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেননি।
আবু শরীফ বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ মূলত ক্ষমতা ও রাজনীতির বিষয়। কিন্তু ধর্মীয় ভাষা ব্যবহার করলে সমর্থকরা আরো উজ্জীবিত হয় এবং সংঘাতকে ‘নৈতিক’ রূপ দেয়া যায়।
তিনি বলেন, ‘যুদ্ধ নিজে ধর্মতাত্ত্বিক নয়; এটি ভূরাজনৈতিক। কিন্তু এর চারপাশের ভাষা ক্রমশ পবিত্র প্রতীক ও সভ্যতার বর্ণনা থেকে ধার নিচ্ছে।’
‘এ ভাষা সমর্থকদের সংগঠিত করতে পারে এবং সংঘাতকে নৈতিকভাবে চূড়ান্তরূপে উপস্থাপন করতে পারে। তবে এতে ঝুঁকিও আছে। একবার কোনো যুদ্ধকে পবিত্র ভাষায় তুলে ধরা হলে রাজনৈতিক সমঝোতা কঠিন হয়ে যায়। প্রত্যাশা বেড়ে যায় এবং সংঘাত সম্পর্কে বৈশ্বিক ধারণাও এমনভাবে বদলে যেতে পারে যা কূটনীতিকে জটিল করে তোলে।’