হুমকিতে নতুন সন্ধান পাওয়া ৫ হাজারের অধিক প্রাণী

প্রশান্ত মহাসাগরের তলদেশের ক্ল্যারিয়ন ক্লিপারটন জোনে (সিসিজেড) সম্প্রতি পাঁচ হাজারের বেশি প্রজাতির প্রাণীর সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা।

প্রশান্ত মহাসাগরের তলদেশের ক্ল্যারিয়ন ক্লিপারটন জোনে (সিসিজেড) সম্প্রতি পাঁচ হাজারের বেশি প্রজাতির প্রাণীর সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। তবে অঞ্চলটি খনিজ কোম্পানির অনুসন্ধানের জন্য নির্ধারিত স্থান হওয়ায় এসব প্রাণী এরই মধ্যে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়েছে। কেননা যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জ থেকে মেক্সিকো পর্যন্ত বিস্তৃত ১৭ লাখ বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত এ অঞ্চলে শিগগিরই শুরু হতে যাচ্ছে খনিজ সম্পদ অনুসন্ধানের তৎপরতা। আর এ কার্যক্রম শুরু হলে স্বাভাবিকভাবেই অস্তিত্ব সংকটে পড়বে এসব নতুন আবিষ্কৃত প্রজাতি। খবর দ্য গার্ডিয়ান।

বিজ্ঞানীদের ‌পরিবেশসংক্রান্ত জরিপের তথ্যানুযায়ী, প্রশান্ত মহাসাগরের একটি অস্পৃশ্য অঞ্চলের সমুদ্র তলদেশে বসবাসকারী পাঁচ হাজারের বেশি নতুন প্রজাতি আবিষ্কৃত হয়েছে। স্থানটি গভীর সমুদ্র খনিজ সম্পদ অনুসন্ধানের একটি হটস্পট। গবেষকরা বলছেন, এ ধরনের প্রজাতির বিলুপ্তির ঝুঁকি মূল্যায়নের জন্য গবেষণাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা অঞ্চলটিতে খনিবিষয়ক কার্যক্রমের চুক্তির বিষয়টি নিয়ে আবার ভাবতে বাধ্য করবে।

অঞ্চলটিতে ঘুরে গবেষকরা যেসব প্রাণীকে চিহ্নিত করেছেন, তাদের অধিকাংশই বিজ্ঞানের কাছে নতুন। প্রায় সবই এ অঞ্চলের জন্য ব্যতিক্রমী। এসব প্রাণীর মধ্যে একটি মাংসভোজী স্পঞ্জ ও একটি সামুদ্রিক কুমড়াসহ মাত্র ছয়টি প্রাণী অন্য কোথাও দেখা গেছে।

সহস্র প্রজাতির প্রাণী ও খনিজ সম্পদের এক বিশাল ভাণ্ডার প্রশান্ত মহাসাগরের ক্ল্যারিয়ন ক্লিপারটোন জোন। গবেষণার তথ্য বলছে—নিকেল, ম্যাঙ্গানিজ, তামা, দস্তা ও কোবাল্টসহ বিভিন্ন খনিজের সমৃদ্ধ মজুত রয়েছে সিসিজেডের তলদেশে। ৭ লাখ ৪৫ হাজার বর্গ মাইল এলাকায় ১৭টি গভীর সমুদ্র খনির ঠিকাদারকে সিসিজেডের খনির অনুসন্ধানের জন্য চুক্তি প্রদান করা হয়েছে। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মতো দেশগুলোর সহায়তায় কোম্পানিগুলো কাজ করবে। আগামী জুলাইয়ে আন্তর্জাতিক সমুদ্রতল কর্তৃপক্ষ এসব কোম্পানির কাছ থেকে খনন কাজ চালানোর আবেদন গ্রহণ শুরু করবে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হবে খনন কাজ।

এ ধরনের সংকটাপন্ন বাস্তুতন্ত্র ও এর নতুন আবিষ্কৃত প্র‌জাতির আবাসস্থলে খনি অনুসন্ধানের প্রভাবকে আরো ভালোভাবে বুঝতে, বিজ্ঞানীদের একটি আন্তর্জাতিক দল অঞ্চলটিতে অভিযানের সব ধরনের তথ্য সংকলন করে প্রথম সিসিজেড প্রস্তুত করেছে। জীববিজ্ঞান সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক সাময়িকী কারেন্ট বায়োলজি জার্নালে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, এখানে ৫ হাজার ৫৭৮টি ভিন্ন প্রজাতি রয়েছে। যার মধ্যে ৮৮ শতাংশ থেকে ৯২ শতাংশ প্রাণী আগে কখনো দেখা যায়নি। এমনকি অনেক প্রজাতির নামকরণ এখনো করা হয়নি।

ক্ল্যারিয়ন ক্লিপারটন জোনে খননকাজ চালাতে ইচ্ছুক কানাডিয়ান প্রতিষ্ঠান দ্য মেটাল কোম্পানির শীর্ষ নির্বাহী গেরার্ড ব্যারন জানিয়েছেন, বাস্তুসংস্থানকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সিসিজেডে খননকাজ চালানো উচিত বলে মনে করে তার প্রতিষ্ঠান। পাশাপাশি অন্যান্য কোম্পানিরও বিষয়টিতে সচেতন থাকা প্রয়োজন।

যুক্তরাজ্যের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম (এনএইচএম) লন্ডনের গভীর সমুদ্রের বাস্তুসংস্থান বিশেষজ্ঞ ম্যুরিয়েল র‌্যাবনের নেতৃত্বে একটি দল সম্প্রতি এ সম্পর্কিত একটি গবেষণা প্রবন্ধ প্রস্তুত করেছেন। এ বিষয়ে ম্যুরিয়েল র‌্যাবন বলেন, ‘এ বিস্ময়কর জীববৈচিত্র্যের সঙ্গে আমরা আমাদের পৃথিবীকে ভাগ করে নিচ্ছি। এটিকে বোঝার ও রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের রয়েছে। এখন পর্যন্ত এ প্রজাতিগুলোর মধ্যে মাত্র ৪৩৮টির নামকরণ হয়েছে। বাকি ৫ হাজার ১৪২টি প্রানীর বৈজ্ঞানিক নাম এখনো দেয়া হয়নি। বিজ্ঞানীরা এসব প্রজাতিকে অঘোষিত বিভিন্ন নামে অভিহিত করে থাকেন। এমনকি নতুন এ প্রজাতির অনেকগুলোর পূর্ণাঙ্গ বিবরণও পাওয়া যায়নি। হয়তো এসব প্রজাতি কোন বর্গের তা আমরা বলতে পারব’, কিন্তু প্রজাতিগুলোর বিস্তারিত বৈজ্ঞানিক বিবরণ আমাদের অজানা।’

সিসিজেড অঞ্চলে নতুন যেসব প্রাণী পাওয়া গেছে সেগুলোর অধিকাংশই অর্থোপোডা বর্গের প্রাণী। এ বর্গের যেসব প্রাণী আমাদের চারপাশে দেখা যায়, সেসব হলো কাঁকড়া, কাঁকড়াবিছা, চিংড়ি, প্রজাপতি, শতপদী ইত্যাদি। সিসিজেডে যেসব নতুন প্রজাতির সন্ধান মিলেছে, এগুলোর বাস সমুদ্রের একেবারে গভীর তলদেশে। ফলে এতদিন পর্যন্ত এসব প্রজাতি সম্পর্কে কোনো তথ্য জানত না মানুষ।

প্রতিবেদন বলছে, আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল সিবেড অথরিটির উদ্যোগে এক দশক আগে ট্যাক্সোনমিক পদ্ধতিতে জরিপ চালানোর সময় প্রথম এসব প্রাণীর সম্পর্কে জানতে পারে মানুষ। অধিকাংশ প্রজাতিই বসবাস করে সমুদ্রের তলদেশে, যেখানে সূর্যের আলোও ঠিকমতো পৌঁছাতে পারে না। প্রসঙ্গত, সমুদ্রের ২০০ ফুট গভীর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে সূর্যালোক। ম্যুরিয়েল র‌্যাবনের মতে, সমুদ্রের কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় এতসংখ্যক প্রজাতির বসবাসের তথ্য এটাই প্রথম।

আরও