ভারত-পাকিস্তানের তথ্যের লড়াই: কার দাবি কতটা সত্য

৭ মে ভোরে পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর ও পাকিস্তান ভূখণ্ডে ভারতীয় বিমান হামলার পর পরই শুরু হয় পাল্টাপাল্টি বক্তব্য, সংবাদ সম্মেলন আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবির ঝড়।

ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা এবার শুধু সীমান্তে নয়, রয়েছে তথ্যের ময়দানেও। ৭ মে ভোরে পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর ও পাকিস্তান ভূখণ্ডে ভারতীয় বিমান হামলার পর পরই শুরু হয় পাল্টাপাল্টি বক্তব্য, সংবাদ সম্মেলন আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবির ঝড়। কে সত্য বলছে আর কে জনগণের সামনে কেবল নিজেদের সাফল্য তুলে ধরছে—তা বোঝা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে।

লক্ষ্যবস্তু কোথায় ছিল

ভারত দাবি করেছে, গত মাসে পেহেলগামে প্রাণঘাতী হামলার জবাবে তারা পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণাধীন কাশ্মীর ও সীমান্তবর্তী নয়টি জায়গায় ‘জঙ্গি অবকাঠামো’ লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। পেহেলগামের ওই হামলায় ২৬ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হন বলে জানায় দিল্লি। ভারতের অভিযোগ, এ হামলার পেছনে ছিল পাকিস্তান।

কিন্তু ইসলামাবাদ অভিযোগ অস্বীকার করে, নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানায় এবং ভারতের কাছে প্রমাণ চায়।

পাকিস্তান বলেছে, তাদের ছয়টি শহর ও পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে এক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভারতীয় বাহিনীর হামলায় তিন বছর বয়সী এক শিশুসহ ৩১ জন বেসামরিক নিহত হন।

ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিং এবং বিমানবাহিনীর উইং কমান্ডার ভিমিকা সিং দাবি করেন, হামলাগুলো ছিল নিখুঁত পরিকল্পিত এবং বেসামরিক প্রাণহানির কোনো ঘটনা ঘটেনি।

ভারতীয় সেনারা কি সাদা পতাকা উড়িয়েছে

পাকিস্তানের সরকারি এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্টে দাবি করা হয়েছে, নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর একটি পোস্টে সাদা পতাকা উড়িয়ে আত্মসমর্পণের ইঙ্গিত দেয় ভারতীয় সেনারা। পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারারও একই দাবি করে বলেন, ‘(ভারত) তদন্ত থেকে পালিয়েছে, এবার মাঠ থেকেও পালাল।‘

ভারতের পক্ষ থেকে এই দাবি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে অস্বীকার বা স্বীকৃত কোনোটাই দেয়া হয়নি।

যেহেতু দুই দেশ এখনো আনুষ্ঠানিক যুদ্ধে নেই, তাই আত্মসমর্পণের প্রয়োজনই বা কী—এই প্রশ্নও উঠেছে বিশ্লেষকদের মধ্যে।

কতগুলো যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হলো এবং সেগুলোর মালিকানা কার

পাকিস্তানের সেনা মুখপাত্র আহমেদ শরীফ চৌধুরী দাবি করেন, পাঁচটি ভারতীয় যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়েছে এবং সবগুলোই ভারতীয় ভূখণ্ডে। কোনো পক্ষ থেকেই কেউ সীমান্ত অতিক্রম করেনি বলে জানান তিনি।

ভারতের নিরাপত্তা সূত্র বলেছে, তিনটি যুদ্ধবিমান ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে ভূপাতিত হয়েছে, তবে কোন দেশের তা নিশ্চিত নয়।

চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল টাইমসে ভারতীয় বিমান ভূপাতিত হওয়ার যে খবর ছাপা হয়েছে, তা ভারতীয় দূতাবাস ‘ভুয়া তথ্য’ বলে নাকচ করেছে।

দাবি ও পাল্টা দাবির ঐতিহাসিক চক্র

ভারত-পাকিস্তানের অতীত উত্তেজনাগুলোর দিকে তাকালেও দেখা যায় একই ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য যুদ্ধ। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে পুলওয়ামায় আত্মঘাতী হামলায় ৪০ জন ভারতীয় জওয়ান নিহত হওয়ার পর ভারত দাবি করে, তারা পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের বালাকোটে জইশ-ই-মোহাম্মদের ঘাঁটি গুঁড়িয়ে দিয়েছে। পাকিস্তান বলে, হামলা হয়েছে নির্জন বনাঞ্চলে, তেমন কিছুই হয়নি।

২০১৬ সালের উরি হামলার পরও ভারত দাবি করেছিল, তারা ‘সন্ত্রাসীদের’ ঘাঁটি বরাবর সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ চালিয়েছে। এ দাবিকে ‘ভ্রান্ত কল্পনা’ বলে উড়িয়ে দেয় পাকিস্তান।

আজকের লড়াই আর আগের মতো নয়

ওয়াশিংটনের ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের বিশ্লেষক মাধিহা আফজাল বলেন, ভারত-পাকিস্তানের ৭৭ বছরের পুরনো দ্বন্দ্বে ‘তথ্য নিয়ন্ত্রণ’ সবসময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে সোশ্যাল মিডিয়া আর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের যুগে এই নিয়ন্ত্রণ আগের চেয়ে অনেক কঠিন হয়ে গেছে।

তবুও তিনি বলেন, ‘দুই দেশের স্থানীয় মিডিয়া যেহেতু অনেকাংশেই রাষ্ট্রের ইচ্ছানুযায়ী সংবাদ পরিবেশন করে, তাই জনগণের মানসিকতা নিয়ন্ত্রণ করে সমর্থন আদায় করাটা রাষ্ট্রের জন্য এখনো বেশ সহজ।‘

সূত্র: আল জাজিরা

আরও