হিমালয়কন্যা নেপালের রাজনৈতিক মানচিত্রে এক অভাবনীয় পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে। গত ৫ মার্চের সাধারণ নির্বাচনে দেশটির প্রথাগত বড় দলগুলোকে হারিয়ে নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছে চার বছর আগে প্রতিষ্ঠিত ‘রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি’ (আরএসপি)। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স ও বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিনিধি সভার ২৭৫টি আসনের মধ্যে ১৮২টিতে জয়লাভ করে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে আরএসপি। এই জয় নেপালের কয়েক দশকের পুরনো জোট রাজনীতির অবসান ঘটিয়ে এক নতুন রাজনৈতিক যুগের সূচনা করল।
নির্বাচনের পটভূমি ও ‘জেন-জি’ আন্দোলন
এ নির্বাচনের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে। ডয়েচে ভেলের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সে সময় নেপালের তরুণ প্রজন্মের (জেন-জি) নেতৃত্বে এক নজিরবিহীন গণঅভ্যুত্থান ঘটে। মূলত ব্যাপক দুর্নীতি, বেকারত্ব এবং সরকারের সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে কয়েক লাখ তরুণ রাস্তায় নেমে আসেন। সেই আন্দোলনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। এরপর সাবেক প্রধান বিচারপতি সুশীলা কার্কির নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়, যাদের প্রধান দায়িত্ব ছিল ছয় মাসের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন করা।
রয়টার্স ও বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভোটাররা পুরনো দলগুলোর প্রতি অনাস্থা জানিয়ে আরএসপির ‘ঘণ্টা’ (বেল) প্রতীকে বিপুল ভোট দিয়েছেন। যাকে এখন দেশটির গণমাধ্যমগুলো ‘বেল বিপ্লব’ হিসেবে অভিহিত করছে।
পরাজিত হেভিওয়েট প্রার্থীরা
সিএনএনের তথ্যমতে, নেপালের ইতিহাসে এবারই প্রথম কোনো নতুন ধারার রাজনৈতিক দল এমন বিশাল ব্যবধানে জয়ী হলো। দেশটির সবচেয়ে পুরনো দল নেপালি কংগ্রেস মাত্র ৩৮টি আসন পেয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। অন্যদিকে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ওলির দল সিপিএন-ইউএমএল মাত্র ২৫টি আসন পেয়ে বিশাল বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। এমনকি ওলি নিজে ঝাপা-৫ আসনে আরএসপির প্রার্থী বালেন শাহর কাছে প্রায় ৫০ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন। গগণ থাপার মতো হেভিওয়েট নেতারাও এবার সাধারণ মানুষের অনাস্থার মুখে পড়ে নিজ নিজ আসনে হেরে গেছেন। সিএনএন ও ডয়েচে ভেলে এই ফলাফলকে নেপালের পুরনো রাজনৈতিক ধারায় একটি বড় ধাক্কা হিসেবে বর্ণনা করেছে।
নির্বাচনী প্রচারণায় বালেন শাহ। ছবি: বালেন শাহর কার্যালয়
কে এই বালেন শাহ?
নির্বাচনে বিজয়ী এবং নেপালের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মনোনীত ৩৫ বছর বয়সী বালেন্দ্র শাহ, যিনি বালেন শাহ নামে সমধিক পরিচিত, এখন দেশটির নতুন আইকন। তিনি পেশায় একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার এবং জনপ্রিয় র্যাপার। ২০২২ সালে কাঠমান্ডুর মেয়র হিসেবে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচিত হয়ে তিনি প্রথম আলোচনায় আসেন। মেয়রের দায়িত্ব পালনকালে তার স্বচ্ছ ভাবমূর্তি ও দুর্নীতিবিরোধী কঠোর অবস্থান তাকে তরুণদের কাছে জনপ্রিয় করে তুলেছে। বালেন শাহ হতে যাচ্ছেন নেপালের ইতিহাসের কনিষ্ঠতম এবং প্রথম ‘মাধেসি’ বংশোদ্ভূত প্রধানমন্ত্রী।
সরকার গঠন ও পরবর্তী সম্ভাবনা
একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় কোনো জোট ছাড়াই সরকার গঠন করতে যাচ্ছে আরএসপি। দলটি তাদের ইশতেহারে আগামী পাঁচ বছরে নেপালের অর্থনীতিকে দ্বিগুণ করার এবং প্রতিটি দুর্নীতির মামলা তদন্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী সুশীলা কার্কি শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক আরো জোরালো করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন শাহ। দীর্ঘ তিন দশকে ৩২ বার সরকার পরিবর্তনের অস্থিরতা কাটিয়ে নেপালের মানুষ এখন এক নতুন স্থিতিশীল ও কর্মসংস্থানমুখী সরকারের অপেক্ষায় দিন গুনছে।