জার্মানির পূর্বাঞ্চলে অভিবাসনবিরোধী ডানপন্থিদের জয় কি বার্তা দিচ্ছে?

সাক্সনি-আনহাল্টের ফল জার্মানির ইতিহাসের কারণেও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং নাৎসি শাসনের অবসানের পর এত বড় ব্যবধানে কোনো কট্টর জাতীয়তাবাদী ডানপন্থী দল জার্মানির কোনো অঞ্চলে ক্ষমতায় যাওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা তৈরি করতে পারেনি

জার্মানির পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য সাক্সনি-আনহাল্টের নির্বাচন সাধারণত ইউরোপজুড়ে এত আলোচনার জন্ম দেয়ার কথা নয়। দেশটির ১৬টি রাজ্যের মধ্যে এটি তুলনামূলক ছোট। কিন্তু রোববারের নির্বাচনে অভিবাসনবিরোধী ও কট্টর ডানপন্থী অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি) যে ফলাফল অর্জন করেছে, তা জার্মানির রাজনীতির সীমানা ছাড়িয়ে ইউরোপের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। চূড়ান্ত ফলে দলটি ৪৩ দশমিক ৮ শতাংশ ভোট পেয়েছে। ২০২১ সালের নির্বাচনের তুলনায় যা দ্বিগুণেরও বেশি। বিপরীতে চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎসের ক্ষমতাসীন ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নের (সিডিইউ) ভোট নেমেছে ১৭ দশমিক ২ শতাংশে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম এ ফলকে ‘ভূমিকম্প’, ‘সামাজিক-রাজনৈতিক কম্পন’ কিংবা ‘জার্মান রাজনীতির মোড় ঘোরানো মুহূর্ত’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, জার্মানির অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জন্য এর তাৎপর্য অনেক বড়। সাক্সনি-আনহাল্টে মাত্র প্রায় ১৭ লাখ ভোটার থাকলেও এএফডির বড় জয় বার্লিনের কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎসের জন্য এ ফল বড় রাজনৈতিক ধাক্কা। ক্ষমতায় এসে তিনি এএফডির জনপ্রিয়তা কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু স্থানীয় নির্বাচনের ফল দেখাচ্ছে, উল্টো দলটির প্রভাব আরো বাড়ছে।

সাক্সনি-আনহাল্টের ফল জার্মানির ইতিহাসের কারণেও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং নাৎসি শাসনের অবসানের পর এত বড় ব্যবধানে কোনো কট্টর জাতীয়তাবাদী ডানপন্থী দল জার্মানির কোনো অঞ্চলে ক্ষমতায় যাওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা তৈরি করতে পারেনি। জার্মান কর্তৃপক্ষ এএফডির কিছু অংশকে গণতন্ত্রবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সাক্সনি-আনহাল্টসহ দলটির কয়েকটি আঞ্চলিক শাখাকে কট্টর ডানপন্থী চরমপন্থী বলেও বিবেচনা করা হয়।

এএফডি দীর্ঘদিন ধরেই পূর্ব জার্মানিতে বেশি জনপ্রিয়। তবে এখন জাতীয় পর্যায়ের জনমত জরিপেও দলটি সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে উঠে আসছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, জার্মানির মূলধারার দলগুলো কেন এত ভোটারকে ধরে রাখতে পারছে না।

এএফডির সাফল্যে আগ্রহ দেখিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও। নির্বাচনের পরপরই তিনি নিজের ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে সাক্সনি-আনহাল্টের বুথফেরত জরিপের ফল শেয়ার করেন। এএফডির অভিবাসনবিরোধী, জাতীয়তাবাদী ও ‘জার্মানি আগে’ ধরনের বক্তব্যের সঙ্গে ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ রাজনীতির মিল রয়েছে। ইউরোপের আরো কয়েকটি জাতীয়তাবাদী দলও ট্রাম্পের রাজনৈতিক কৌশল থেকে বিভিন্ন উপাদান গ্রহণ করেছে—মূলধারার সংবাদমাধ্যমকে প্রশ্নবিদ্ধ করা, বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি করা এবং জাতীয় গৌরব পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতি তার মধ্যে রয়েছে।

রাশিয়াও এ ফল গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে। রুশ বিনিয়োগ তহবিলের প্রধান কিরিল দিমিত্রিয়েভ এএফডির ফলকে ‘ঐতিহাসিক’ বলে বর্ণনা করেছেন এবং জার্মান সরকারকে ‘বিশ্বাসযোগ্যতা হারানো’ বলে মন্তব্য করেছেন।

এর পেছনে মস্কোরও স্বার্থ রয়েছে। জার্মানি ইউক্রেনের অন্যতম বড় সহায়তাকারী। বিপরীতে এএফডি ইউক্রেনে সামরিক সহায়তা বন্ধ, রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং আবারও তুলনামূলক সস্তা রুশ জ্বালানি কেনার পক্ষে। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার হামলার পর রুশ জ্বালানি আমদানি বন্ধ করায় জার্মানির জ্বালানিনির্ভর শিল্প বড় ধরনের অর্থনৈতিক ধাক্কা খেয়েছে।

পূর্ব জার্মানিতে এএফডির রাশিয়ামুখী অবস্থানের বাড়তি আবেদনও রয়েছে। পুনরেকত্রীকরণের পর বিপুল অর্থ ব্যয় করেও পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানির অর্থনৈতিক বৈষম্য পুরোপুরি দূর হয়নি। সাক্সনি-আনহাল্ট দেশটির দরিদ্র অঞ্চলগুলোর একটি। সেখানে সাবেক কমিউনিস্ট আমলের তুলনামূলক স্থিতিশীল সময়ের প্রতি এক ধরনের নস্টালজিয়াও এখনো দেখা যায়।

এ নির্বাচনের দিকে নজর ছিল ইউরোপীয় ইউনিয়নেরও। আগামী ১২ মাসে ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন ও পোল্যান্ডসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ইউরোপীয় দেশে নির্বাচন হওয়ার কথা। ব্রাসেলসের আশঙ্কা, এসব নির্বাচনে ডান ও বাম—দুই দিকেরই প্রচলিত ব্যবস্থাবিরোধী রাজনৈতিক শক্তি আরো লাভবান হতে পারে।

স্পেনের জাতীয়তাবাদী ভক্স পার্টির নেতা সান্তিয়াগো আবাসকাল এএফডির ফলকে ‘জার্মানি ও ইউরোপের জন্য বড় আশা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। বিপরীতে ফ্রান্সের ইউরোপবিষয়ক মন্ত্রী বেঞ্জামিন হাদাদ সতর্ক করে বলেছেন, জার্মানির একটি অঞ্চলে কট্টর ডানপন্থীদের জয় ইউরোপের জন্য গুরুতর মুহূর্ত।

যদিও ইউরোপের সব কট্টর ডানপন্থী বা জাতীয়তাবাদী দল একই ধরনের নয়। এমনকি ফ্রান্সের মেরিন লে পেনের ন্যাশনাল র‍্যালি দুই বছর আগে এএফডিকে ‘অতি উগ্র’ মনে করে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের নিজস্ব জোট থেকে বের করে দিয়েছিল। তবে এসব দলের মধ্যে কিছু অভিন্ন বৈশিষ্ট্য রয়েছে—অভিবাসনের বিরোধিতা, শক্তিশালী জাতীয়তাবাদী বক্তব্য এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতি সংশয়।

ব্রাসেলসের উদ্বেগ এখানেই। ‘জার্মানি ফার্স্ট’, ‘ইতালি ফার্স্ট’ কিংবা ‘ফ্রান্স ফর দ্য ফ্রেঞ্চ’ ধরনের জাতীয়তাবাদী রাজনীতি এমন সময়ে ইউরোপের ঐক্যে চাপ সৃষ্টি করছে, যখন রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনকে ঘিরে বাইরের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সদস্য দেশগুলোর সমন্বয় আগের চেয়ে বেশি প্রয়োজন।

তবে এএফডির উত্থানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা সম্ভবত ইউরোপের মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য। যুদ্ধ, জীবনযাত্রার ব্যয়, স্বাস্থ্যসেবার দুর্বলতা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, অভিবাসন ও নিরাপত্তা নিয়ে অনেক ভোটার উদ্বিগ্ন। দীর্ঘদিন ধরে যেসব দলকে তারা সমর্থন করেছে, তাদের ওপর আস্থাও কমছে। ফলে ডান বা বাম বিকল্পের দিকে ঝুঁকে পড়া সব ভোটারকে চরমপন্থী হিসেবে দেখলে তাদের অসন্তোষের কারণ বোঝা যাবে না।

সাক্সনি-আনহাল্টে এএফডির নির্বাচনী স্লোগান ছিল—‘সবকিছুই সম্ভব’। এর সঙ্গে ছিল জার্মানদের আবার নিজেদের দেশ নিয়ে গর্বিত করার প্রতিশ্রুতি। এখন পর্যন্ত সরকার পরিচালনায় পরীক্ষিত না হলেও ক্রমেই বেশি সংখ্যক ভোটার দলটিকে সেই সুযোগ দিতে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। আর এ কারণেই ছোট একটি জার্মান রাজ্যের ফল এখন পুরো ইউরোপের রাজনীতির জন্য বড় সতর্কসংকেত হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আরও