অক্টোবর থেকে চলা বিক্ষোভ ও রাজনৈতিক অচলাবস্থার মুখে পাঁচ মাস প্রধানমন্ত্রীহীন থাকা ইরাকের সংসদ নতুন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করতে পেরেছে। গত বুধবার ইরাকের সংসদ নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সাদ্দাম হোসাইন বিরোধী সাংবাদিক, জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান ও মার্কিনপন্থি বলে পরিচিত মোস্তফা আল কাজেমিকে নির্বাচিত করেছে। সংসদে উপস্থিত ৩২৯ জন সদস্যের মধ্যে ২৩৩ ভোট পেয়ে জয়ী হন আল কাজেমি।
বেকারত্ব দূরীকরণ ও সরকারি দুর্নীতির বিরুদ্ধে গত ১ অক্টোবর থেকে গড়ে ওঠা সরকার বিরোধী বিক্ষোভের মুখে নভেম্বরে পদত্যাগ করেন প্রধানমন্ত্রী আদিল আব্দুল মাহদি। এরপরে প্রেসিডেন্ট বারহাম সালেহ মুহাম্মদ তৌফিক আলাউ ও আদাসা আল জুরফিকে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে মনোনয়ন দিলেও তারা সংসদ থেকে আস্থা ভোটে জিতে আসতে পারেননি।
আল জুরফি বিরোধীদের কাছে ইরানপন্থি বলে সমালোচনার মুখে জিততে পারেননি। প্রেসিডেন্ট মনোনিত তৃতীয় ব্যক্তি হিসাবে আল কাজেমি আস্থা ভোটে জয়ী হয়ে আসেন। আল কাজেমির প্রস্তাবিত ২২ সদস্যের মন্ত্রিসভার মধ্যে ১৫ জন আস্থাভোটে জয়ী হয়ে আসেন। বাকি সাতজনের মধ্যে পাঁচজন হেরে যান ও ২ জনের সিদ্ধান্ত স্থগিত রয়েছে। এখনো খালি রয়েছে তেল ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়।
নির্বাচিত হওয়া ১৫ জন সদস্যের ৯ জন শিয়া, ৫ জন সুন্নি ও একজন কুর্দি। তবে আল কাজেমির প্রস্তাবিত মন্ত্রিসভায় দক্ষিণ অঞ্চলের কোনো প্রতিনিধি নেই। অথচ সরকারবিরোধী বিক্ষোভ রাজধানী বাগদাদের বাইরে বেশি তীব্র ছিল দক্ষিণাঞ্চলে। প্রধান সমুদ্র বন্দরের নগরী ও অর্থনৈতিক রাজধানী বসরার সংসদ সদস্যরা তাই তেল মন্ত্রণালয়ের দাবি তুলছে।
ইরাকের সরকার বিরোধী বিক্ষোভ
গত সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া সরকারবিরোধী এই বিক্ষোভে সরকারি হিসাবে শতাধিক নিহত ও ৬ হাজারেরও বেশি আহত হয়েছে। যদিও বা বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে হতাহতের সংখ্যা কয়েকগুণ বলে দাবি করা হয়েছে। ইরাকে ঘটিত এই বিক্ষোভ সচরাচর বিক্ষোভ নয়। ব্যাপক সরকারি দমনপীড়নের মুখেও বিক্ষোভকারী সরে যায়নি।
ইরাকে যদিও একটি নির্বাচিত সরকার রয়েছে কিন্তু বিক্ষোভকারীরা সরকারের পদত্যাগ দাবি করেছে। বসরায় ইরানের কনস্যুলেটে হামলা হয়েছে। ইরাকের সাম্প্রতিক সময়ের বিক্ষোভে শিয়া ধর্মীয় নেতাদের ইন্ধন থাকলেও এবারের বিক্ষোভ ছিল স্বতন্ত্র। ফলে এই বিক্ষোভের পেছনে কারা মদদ দিচ্ছে তা স্পষ্ট নয়।
ইরাকের ৬০ শতাংশ জনসংখ্যার বয়স ২৫ বছরের কম। ৪০ শতাংশ শিক্ষিত লোক বেকার। প্রশাসনিক দুর্নীতি চরমে। বাজেটের বড় একটি অংশ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। স্বাস্থ্য পরিসেবা নাজুক। পুরো ইরাকে তীব্র বিদ্যুৎ সংকট। ওপেকভুক্ত এই দেশ প্রতিদিন ৩৬ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন করলেও জনগণের জীবন অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটের সম্মুখীন। পর্যাপ্ত উন্নয়ন ও জনকল্যাণে সরকার ব্যর্থ। ফলে এসব পুঞ্জীভূত ক্ষোভ তরুণদের বিক্ষোভ ও সহিংসতার দিকে নিয়ে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে ইরাকে সাদ্দাম হোসেনের বাথ পার্টির সদস্যরা এখনো দেশের নানা অঞ্চলে ছড়িয়ে রয়েছে। এছাড়া ইরাকের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও সৌদি আরব অখুশী। বিশেষ করে ইরান ও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন এই ব্লক ভালোভাবে নিচ্ছে না। ফলে এই বিক্ষোভকে পুঁজি করতে চেয়েছে পশ্চিমা ও সৌদি জোট। ইরাকের ইরানের প্রতি মার্কিন নিষেধাজ্ঞা না মানা, পারস্য উপসাগরের মার্কিন মহড়ায় অংশ না নেয়া, সিরিয়া-ইরাক সীমান্ত উন্মুক্ত রাখা এবং সর্বশেষ রাশিয়া থেকে এস-৩০০ এবং এস-৪০০ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার উদ্যোগ মার্কিন শিবিরকে বিচলিত করেছে।
কে এই নতুন প্রধানমন্ত্রী মোস্তফা আল কাজেমি
জটিল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে মোস্তফা আল কাজেমি নির্বাচিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বলেন, তার কাজ সংকট সমাধান করা, সংকট তৈরি করা নয়। সেই সঙ্গে ইরাককে অন্য দেশগুলোর যুদ্ধক্ষেত্র হতে দেবেন না বলেও প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি শিগগিরই নতুন নির্বাচনের কথা বলেন। যেখানে বর্তমান সংসদের মেয়াদ বাকি এক বছরেরও কম। তিনি সরকারি খরচকে যৌক্তিক পর্যায়ে নিয়ে আসার ও তেল রফতানি আয় উদ্ধারের সংকল্প করেন।
আইনের ছাত্র আল কাজেমি অনেকটা প্রগতিশীল চিন্তার অধিকারী। ৫৩ বছর বয়সী আল কাজেমি ১৯৮৫ সালে দেশ ছাড়েন। যুক্তরাজ্য ও জার্মানিতে থাকার পর ২০০৩ সালে মার্কিন জোটের হামলায় সাদ্দাম হোসাইনের পতন হলে তিনি দেশে ফিরেন। দেশে ফিরেই সাংবাদিক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন। সাদ্দাম হোসেনের বাথ পার্টির নানা অপকর্মের তথ্যচিত্র নির্মাণ করেন। মার্কিনপন্থি অল-মনিটরে কলাম লিখে আলোচনায় আসেন।
২০১৬ সালে ইরাকে যখন জঙ্গিগোষ্ঠী আইএসের উত্থান হয় তখন তাকে জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান করা হয়। ওই সময়ে মার্কিন বলয়ের ডজনখানেক দেশের সঙ্গে আল কাজেমির ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। ২০১৭ সালে ইরাকের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সৌদি আরব সফরে আল কাজেমিকে সৌদি যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে বেশ ঘনিষ্ঠ মুহূর্তে দেখা যায়।
ইরাকের ইরানপন্থি রাজনৈতিক গোষ্ঠী ইরাকি ফাতাহ জোট শুরুর দিকে আল কাজেমিকে ভেটো দিয়েছিল। এই জোট ইরাকের সংসদে দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ। কিন্তু করোনা ভাইরাস পরিস্থিতি ও তেলের মূল্য হ্রাসের কারণে আল ফাতাহ ও আল কাজেমি একটি রাজনৈতিক অংশীদারিত্বে আসতে সম্মত হয়। ফলে ইরান ও মার্কিন সমর্থন মাথায় নিয়ে প্রধানমন্ত্রী হতে হয়েছে আল কাজেমি। এটার আভাস মেলে আল কাজেমিকে দেয়া ইরানি শুভেচ্ছা বার্তায়। প্রথম পূর্বাঞ্চলীয় দেশ হিসেবে নতুন সরকারকে অভিনন্দন জানিয়ে ইরান ইরাকের ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সমর্থন রেখে দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নেয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে। ইরানের জন্য একটি স্থিতিশীল ইরাক গুরুত্বপূর্ণ, তা এই বার্তায় ফুটে ওঠে।
তবে ইরাকের ইরানপন্থি পপুলার মোবিলাইজেশন ইউনিটের শরিক দল কাতাইব হিজবুল্লাহ ইরানি জেনারেল কাশেম সোলাইমানি ও তাদের নেতা আবু মাহদি মার্কিন ড্রোন হামলায় নিহত হওয়ার পেছনে আল কাজেমি জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ করে আসছে। আল কাজেমি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরও কাতাইব হিজবুল্লাহ বিবৃতিতে বলেছে, ‘দেশের রাজনৈতিক সংকটে একজন মতৈক্যের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন তার মানে এই না যে তিনি হত্যার দায় থেকে মুক্তি পেয়েছেন।’
নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যত
বিক্ষোভে অংশ নেয়া তরুণদের দাবি ছিল বেকারত্ব দূরীকরণ, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংস্কার, প্রশাসনিক দুর্নীতি দমন। সবগুলোই আসলে দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। নতুন সরকারকে নানা গোষ্ঠীতে বিভক্ত ইরাকের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিক্ষুব্ধ তরুণদের চাকরি দেয়া, ইরান-মার্কিনের সঙ্গে কূটনৈতিক ভারসাম্য তৈরির চ্যালেঞ্জ নিতে হবে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে বাজেট সংকুলান।
ইরাকের অর্থনীতির ৬৭ শতাংশ-ই যোগান দেয় তেল বাণিজ্য। জাতীয় বাজেটের ৯০ শতাংশ আসে অপরিশোধিত তেল রফতানি আয় থেকে। কিন্তু করোনা ভাইরাসে বিশ্বব্যাপী লকডাউন ও তেলের বাজারে দর পতনে জাতীয় বাজেট যোগান দিতেই হিমশিম খাবে নতুন সরকার। বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল আমদানিকারক ও ইরাকের সবচেয়ে বড় তেল বাণিজ্য অংশীদার চীন গত জানুয়ারি থেকে লকডাউনে থাকার ফলে ইরাকের তেল রফতানি আয় হুমকির মুখে। সৌদি যুবরাজের তেলের দর নিয়ে বাগযুদ্ধের ফলে তেলের মূল্য এখন ব্যারেল প্রতি ২৫-৩০ ডলারে নেমে এসেছে।
ফলে সৌদি নেতৃত্বাধীন ওপেকের দ্বিতীয় তেল উত্তোলক দেশ ইরাকের অর্থনীতি এখন সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর সবচেয়ে বড় সংকটে। ২০২০ সালের বাজেটে ইরাক তেলের রফতানি মূল্য ধরেছে ব্যারেল প্রতি ৫৫ ডলার। বিশ্বব্যাংক তাদের হিসাবে বলছে, বর্তমানে তেলের মূল্য ব্যারেল প্রতি ৩০ ডলারের নিচে নেমে আসায় ইরাকে চলতি বছরে বাজেট ঘাটতি দেখা দেবে প্রায় ৫৪ বিলিয়ন ডলার।
ইরাকের বাজেটের অর্ধেক ব্যয় হয় সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতাদি ব্যয়ে। ফলে নতুন সরকার সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন দিতে হিমশিম খাবে। এই মুহূর্তে সরকারের সামনে দুইটি পথ খোলা আছে, হয় বৈদেশিক রিজার্ভ মুদ্রা ব্যয় করা নতুবা আইএমএফ ও নানা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ঋণ নেয়া।
গতবছর ইরাকের রিজার্ভ ছিল ৬৪ বিলিয়ন যা দশ মাসের আমদানি ব্যয়ের সমান। কিন্তু এরই মধ্যে সেখান থেকে ছয় মাসের আমদানি ব্যয় খরচ হয়ে গেছে। অন্যদিকে ২০১৬ সালে আইএমফের দেয়া অর্থনৈতিক সংস্কার পরিকল্পনায় ইরাক ব্যর্থ হওয়ায় আইএমএফ এবার সতর্ক পা ফেলবে। যদি ঋণ দেয়ও সেক্ষেত্রে রাজনৈতিক অঙ্গীকারে পড়তে হতে পারে নতুন সরকারকে।
আইএমফের সবচেয়ে বড় অর্থ যোগান দাতা যুক্তরাষ্ট্র। ইরাকের সংসদে ইরাক থেকে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি সরাতে বিল পাস হয়েছে। ফলে মোস্তফা আল কাজেমিকে ইরাক থেকে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি সরাতে উদ্যোগী হতে সংসদের চাপে থাকতে হবে। ইরানও আল কাজেমিকে দেয়া সমর্থনের বিনিময়ে সর্বোচ্চ রাজনৈতিক অর্জন ঘরে তুলে আনার চেষ্টা করবে। ফলে কঠিন ও সতর্ক ভারসাম্য সম্পর্কে এগোতে হবে আল কাজেমি সরকারকে।
ইরাককে এখনো স্থিতিশীল বলা যাচ্ছে না। আল জাজিরার কাছে বিক্ষোভকারীরা করোনা পরিস্থিতি শেষে ফের বিক্ষোভে নামার কথা বলছেন। আহমেদ কাদুম নামে এক বিক্ষোভকারী বলছেন, তারা হতাশ। তারা চাকরি চান। দুর্নীতি বন্ধ চান। যতক্ষণ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত অর্জন না আসছে তারা বিক্ষোভ চালিয়ে যাবেন। তারা আদিল আব্দুল মাহাদি ও মোস্তফা আল কাজেমির মধ্যে কোনো পার্থক্য খুঁজে পান না। বরং তারা আরও বৃহত্তর বিক্ষোভের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
বর্তমান করোনা ভাইরাসে চলমান কারফিউ ইরাকের রাজনৈতিক অস্থিতিশীল অবস্থার মধ্যে নিঃশ্বাস ফেলার বিরতি। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংস্কার পরবর্তী বিক্ষোভকে থামিয়ে দিতে পারে। কিন্তু সার্বিক পরিস্থিতি খুব একটা আশাবাদী করে না। তীব্র বিদ্যুৎ সংকটের ইরাকে গ্রীষ্মকাল আসছে। তরুণরা বিক্ষুব্ধ ও হতাশ। সরকারের বাজেট ঘাটতি। তেলের বাজারে কালোদিন। সব মিলিয়ে একটি সংকটময় ভবিষ্যত অপেক্ষা করছে নতুন সরকারের জন্য।
বাংলাদেশের এক লাখেরও বেশি শ্রমিক ইরাকে কর্মরত। ইরাকের সংকটে কর্মহীন হয়ে পড়তে পারে আমাদের এই প্রবাসীরাও।
লেখক: শাহাদাত হোসাইন স্বাধীন
গণমাধ্যমকর্মী ও শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়