এপির বিশ্লেষণ

আমেরিকার সঙ্গে চুক্তির টেবিলে ইরান, মাঠে ক্ষেপণাস্ত্র ও হুতিদের হামলা

এইসব সামরিক আগ্রাসনের মধ্যেও ইরান জানাচ্ছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি পরমাণু চুক্তি করতে চায়। গত সপ্তাহে রোমে নির্ধারিত আলোচনা বাতিল হলেও ইরানের পররাষ্ট্রনীতি এখনো সমঝোতার দিকেই।

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার মধ্যেই আবারো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরমাণু চুক্তির আলোচনা চায় ইরান। অথচ একই সময়ে তারা শক্তি প্রদর্শনের পথেও হাঁটছে—সম্প্রতি একে একে বেশ কয়েকটি ঘটনাই তা প্রমাণ করছে। বার্তা সংস্থা এপি তাদের বিশ্লেষণে একে সংঘাত ও আলোচনার এই দ্বৈত কৌশল হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।

গত কয়েক দিনে তেহরান ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ইসরায়েলের দিকে চালানো ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় সমর্থন দিয়েছে। এ ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা ব্যুহ ভেদ করে বেন গুরিয়ন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে আঘাত হানে। ইরান নিজেও একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার ভিডিও প্রচার করে। একইসঙ্গে দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের হুঁশিয়ারির জবাবে বলেন, ‘ইরানের ইতিহাস পড়ুন, হুমকির ভাষায় কথা বলবেন না।‘

এছাড়া ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি সংগঠন ইসরায়েলের মানচিত্রের ওপর হুতিদের ঐতিহ্যবাহী ছুরি ‘জাম্বিয়া’ আকৃতির ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে লক্ষ্যবিন্দু চিহ্নিত করে একটি দেয়ালচিত্রও উন্মোচন করেছে।

তবে এইসব সামরিক আগ্রাসনের মধ্যেও ইরান জানাচ্ছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি পরমাণু চুক্তি করতে চায়। গত সপ্তাহে রোমে নির্ধারিত আলোচনা বাতিল হলেও ইরানের পররাষ্ট্রনীতি এখনো সমঝোতার দিকেই। অথচ ট্রাম্প প্রশাসন স্পষ্ট জানিয়েছে, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের শর্তে ইরানকে পরমাণু সমৃদ্ধকরণ পুরোপুরি ত্যাগ করতে হবে—যা তেহরান বহুবার ‘অশ্রাব্য দাবি’ হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেছে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলায় ইসরায়েলে ১,২০০ জন নিহত ও ২৫০ জনকে জিম্মি করা হয়। এরপর গাজায় ইসরায়েলের ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ শুরু হয়। এই যুদ্ধেই পাল্টে যায় ইরানের আঞ্চলিক প্রভাবের সমীকরণ। ইরানের মিত্র হামাস, হিজবুল্লাহসহ বিভিন্ন গোষ্ঠী ইসরায়েলি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এমনকি সিরিয়াতেও ইরানঘনিষ্ঠ বাশার আল-আসাদের দীর্ঘ পাঁচ দশকের শাসন পতনের মুখে পড়ে। এখন একমাত্র হুতি বিদ্রোহীরা ইরানের পাশে থাকলেও ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন অভিযান তাদের বিরুদ্ধেও চাপ বাড়িয়েছে।

ইরানি গণমাধ্যমে বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে হামলার খবর গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করা হলেও ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এটিকে হুতিদের ‘স্বতন্ত্র সিদ্ধান্ত’ বলে দাবি করেছে। তবে তেহরানের পক্ষ থেকে হুতিদের অস্ত্র সরবরাহ ও সহায়তা বহুদিন ধরেই আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত।

ইরান এখনো পরমাণু সমঝোতাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। অর্থনৈতিক অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, শুধুমাত্র আলোচনার খবরেই ইরানি রিয়াল কিছুটা শক্তিশালী হয়েছে। একসময় যেখানে ১ ডলারে ১০ লাখ রিয়াল লাগত, এখন তা নেমে এসেছে ৮ লাখ ৪০ হাজারে।

তবে সমঝোতা থেকে এখনো অনেক দূরে দুই পক্ষ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মার্চে ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে একটি চিঠি দেন, যাতে ২ মাসের সময়সীমা উল্লেখ থাকে। একই সময় যুক্তরাষ্ট্র হুতিদের বিরুদ্ধে অভিযানে নেমেছে এবং গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ আরো তীব্রতর হচ্ছে—যা তেহরানের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।

এরমধ্যে ট্রাম্প প্রশাসন হুঁশিয়ারি দিয়েছে, কেউ ইরানের তেল কিনলে তাদের বিরুদ্ধেও নিষেধাজ্ঞা আসবে। আবার ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুও আগের মতোই ইরানের পরমাণু কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে বন্ধের পক্ষে সোচ্চার।

রোমের আলোচনা স্থগিত হলেও ইরান বার্তা পাঠানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ইসলামাবাদে গিয়ে পাকিস্তানি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করেছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি প্রধান কায়া কাল্লাস তেহরানকে রাশিয়াকে সামরিক সহায়তা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন এবং ইউরোপীয় নাগরিকদের আটক ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

তিনি এক্সে লিখেছেন, ‘রাশিয়াকে সামরিক সহায়তা বন্ধে আমি ইরানকে আহ্বান জানিয়েছি। ইউরোপ-ইরান সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এসব বিষয়ে অগ্রগতির ওপর।‘

আরও