লন্ডন থেকে ঢাকা— সব বড় শহরে বাসা ভাড়া পাওয়া সোনার হরিণের মতো ব্যাপার। এ কঠিন সময়ে কোনো বন্ধুর ফ্ল্যাটে একটি রুম ভাড়া নেয়া বা পরিচিত কারও বাসায় সাবলেট থাকাটা আশীর্বাদ মনে হয়। পরিচিত পরিবেশ, হয়তো কিছুটা কম ভাড়া, আর আস্থার জায়গা সব মিলিয়ে একে উইন-উইন পরিস্থিতি মনে হওয়া স্বাভাবিক। তবে বাস্তব চিত্র বলছে, যেখানে টাকা আর সম্পর্কের লেনদেন হয়, সেখানে বন্ধুত্ব বিষাদে রুপ নেয়।
সমান থেকে অসমের লড়াই
বন্ধুর সঙ্গে সম্পর্ক সবসময় সমানে-সমান হয়। কিন্তু যখন একজন বাড়ির মালিক বা প্রধান ভাড়াটিয়া আর অন্যজন কেবল একটি রুমের বাসিন্দা, তখন সম্পর্কে এক ধরনের অদৃশ্য ‘হায়ারার্কি’ বা শ্রেণিবিন্যাস তৈরি হয়। দেখা যায়, বন্ধুত্বের দোহাই দিয়ে মালিকপক্ষ অনেক সময় এমন কিছু নিয়ম চাপিয়ে দেন, যা সাধারণ ভাড়াটিয়া হলে হয়তো দিতেন না। আবার ভাড়াটিয়া বন্ধুটিও অনেক সময় ভুল বুঝাবুঝির শঙ্কায় মুখ ফুটে নিজের অসুবিধার কথা বলতে পারেন না।
ছোট ছোট বিষয়ে বড় অশান্তি
রান্নাবান্না, অতিথি আসা, গ্যাস বা বিদ্যুৎ বিলের মতো বিষয়গুলো নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিবাদ বাধে। হয়তো মালিক বন্ধুটি চান না বাসায় বেশি অতিথি আসুক বা রান্নায় অধিক গ্যাস ব্যবহার করা হোক। গভীর রাত পর্যন্ত লাইট জ্বালিয়ে রাখা নিয়েও ঝামেলা দেখা দেয়। অনেক সময় মালিকপক্ষ অনুমতি ছাড়াই ভাড়াটিয়া বন্ধুর রুমে ঢুকে পড়েন বা তার ব্যক্তিগত জিনিসে হস্তক্ষেপ করেন। ছোট ছোট বিরক্তিগুলো জমতে জমতে এক সময় বড় ধরনের বিবাদে রূপ নেয়।
উপকারের আড়ালে শোষণ
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, বন্ধুত্বের খাতিরে কিছুটা কম ভাড়া দেয়ার সুযোগ নিয়ে মালিক বন্ধুটি ভাড়াটিয়া বন্ধুর ওপর ঘরের অতিরিক্ত কাজ চাপিয়ে দেন। বাজার করে দেয়া, ঘর পরিষ্কার রাখা বা বিল জমা দেয়ার মতো কাজগুলো অনেক সময় অলিখিতভাবে ভাড়াটিয়া বন্ধুর ওপর বর্তায়। এটাকে এক ধরনের ‘ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল’ হিসেবে দেখেন সমাজবিজ্ঞানীরা। টাকার বদলে সেবা দেয়ার এ মানসিকতা বন্ধুত্বের চির ধরানোর জন্য যথেষ্ট।
আইনি সুরক্ষার অভাব
বাংলাদেশে পরিচিতদের মধ্যে রুম ভাড়া নেয়ার ক্ষেত্রে সাধারণত কোনো লিখিত চুক্তি হয় না। সব চলে ‘মুখের কথায়’। এর ফলে বিপদে পড়লে ভাড়াটিয়া বন্ধুর কোনো আইনি সুরক্ষা থাকে না। যেকোনো ছোট অজুহাতে বা সম্পর্কের অবনতি ঘটলে মাঝরাতে বা হুট করে বাসা ছেড়ে দেয়ার নির্দেশ আসার নজিরও কম নয়। একটি অপরিচিত বাড়িওয়ালার চেয়ে বন্ধুর কাছ থেকে পাওয়া এমন ব্যবহার মানসিকভাবে বেশি বিপর্যস্ত করে তোলে।
সম্পর্কের মৃত্যু
সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, যখন এ আবাসন ব্যবস্থাটি কাজ করে না, তখন কেবল মাথার ওপরের ছাদই হারায় না। বরং দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বও চিরতরে শেষ হয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, টাকা-পয়সার হিসেব মেলাতে গিয়ে পুরোনো বন্ধুদের মধ্যে মুখ দেখাদেখিও বন্ধ হয়ে গেছে।
উত্তরণের উপায় কী?
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বন্ধুর বাড়িতে থাকতে হলেও কিছু বিষয়ে পেশাদারিত্ব বজায় রাখা জরুরি:
- লিখিত চুক্তি: বন্ধু হলেও ঘর ভাড়ার ক্ষেত্রে একটি ছোট লিখিত শর্তাবলী থাকা ভালো।
- সীমানা নির্ধারণ: ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও ঘরের কাজ নিয়ে শুরুতেই স্পষ্ট কথা বলে নেয়া উচিত।
- টাকা ও সম্পর্ক আলাদা রাখা: ভাড়ার টাকা বা বিল সবসময় নির্দিষ্ট সময়ে পরিশোধ করা, যাতে সম্পর্কের মাঝে টাকা দেয়াল হয়ে না দাঁড়ায়।