ভেনিজুয়েলার উপকূলের কাছে স্থানীয় সময় গতকাল সন্ধ্যায় পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। এতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। অনেক ভবন ধসে পড়েছে এবং আতঙ্কিত মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন। খবর এপি।
রিখটার স্কেলে ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার এ ভূমিকম্পে দেশটির বিভিন্ন শহরে ভবন খালি করে দেয়া হয়। কম্পন অনুভূত হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৭০০ কিলোমিটার দূরে ব্রাজিলের আমাজন অঞ্চল পর্যন্ত।
গতকাল গভীর রাতে জাতির উদ্দেশে দেয়া এক সংক্ষিপ্ত ভাষণে দেশটির ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেস জানান, ভূমিকম্পে কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ি-ঘর ও ভবনের সংখ্যা, আহত বা নিহতের কোনো পরিসংখ্যান তিনি দেননি।
তিন আরো বলেন, ভূমিকম্পে ভেনিজুয়েলার প্রধান বিমানবন্দর সিমোন বলিভার ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সেটি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি কয়েক দিনের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্লাসও স্থগিত করা হয়েছে।
রদ্রিগেস বলেন, ‘আমরা জনগণকে শান্ত থাকার আহ্বান জানাচ্ছি। আমরা সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানাই।’
তিনি দেশের সব স্বাস্থ্যসেবা পেশাজীবীদের হাসপাতালে উপস্থিত হয়ে আহতদের সহায়তা করার আহ্বান জানান।
ফালকন অঙ্গরাজ্যের গভর্নর ভিক্টর ক্লার্ক জানান, ৩২ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে এবং ভূমিকম্পের চার ঘণ্টা পরও অন্তত ১৫ জন ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা ছিলেন।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস প্রথম ভূমিকম্পটির মাত্রা ৭ দশমিক ১ বলে জানিয়েছিল, পরে তা সংশোধন করে ৭ দশমিক ২ করা হয়। ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল ক্যারিবীয় উপকূলবর্তী মোরন শহরের পশ্চিমে, রাজধানী কারাকাস থেকে প্রায় ১৬৮ কিলোমিটার পশ্চিমে। এর গভীরতা ছিল ২২ কিলোমিটার।
ইউএসজিএস জানায়, মাত্র এক মিনিট পর আরো বড় ৭ দশমিক ৫ মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্প আঘাত হানে। দ্বিতীয় ভূমিকম্পটির গভীরতা ছিল ১০ কিলোমিটার এবং এর উৎপত্তিস্থল ছিল মোরনের দক্ষিণ-পশ্চিমে ১৬ কিলোমিটার দূরে।
এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে ভেনিজুয়েলায় আঘাত হানা সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্পগুলোর মধ্যে এগুলো অন্যতম। স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টার কিছু পর ভূমিকম্প দুটি আঘাত হানে।
রাজধানী কারাকাসে দুলতে থাকা ভবন থেকে মানুষ দ্রুত বেরিয়ে আসে। অনেকেই বিস্মিত ও আতঙ্কিত হয়ে দেখেন, পুরো দেয়াল ধসে পড়ে ভবনের ভেতরের আসবাবপত্র পর্যন্ত রাস্তা থেকে দেখা যাচ্ছে। শহরের দুটি এলাকায় ধুলার বিশাল মেঘও দেখা যায়। সাধারণত ওই সময় রেস্তোরাঁ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় ব্যস্ততা থাকে।
সূর্যাস্তের পরও অনেকে মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় অবস্থান করেন। কেউ কেউ পোষা প্রাণীকে জড়িয়ে মাটিতে বসে ছিলেন। বিভিন্ন সড়কে ধসে পড়া ভবন, উপড়ে যাওয়া বৈদ্যুতিক খুঁটি ও ধ্বংসাবশেষ জমে গেছে। রাজধানীর কিছু অংশে বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
কারাকাসের বাসিন্দা হেক্টর রিচ্চি বলেন, ‘প্রথমে কম্পনটা হালকা ছিল, তারপর ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। শেষে আমাদের সবাইকে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বাইরে জড়ো হতে হয়েছে।’
দেশের বিভিন্ন স্থানে মোবাইল নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় অনেক পরিবারে উদ্বেগ বেড়ে গেছে, বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি সংকটের কারণে দেশ ছেড়ে যাওয়া ৭৭ লাখের বেশি ভেনিজুয়েলীয়দের স্বজনদের মধ্যে।
ভেনিজুয়েলার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিয়োসদাদো কাবেলো বলেন, দেশের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে ভূমিকম্পের কম্পন অনুভূত হয়েছে।
তিনি জানান, কারাকাসের আলতামিরা এলাকায় বেশ কিছু বাড়ি ও ভবন ধসে পড়ায় ‘উদ্বেগজনক পরিস্থিতি’ তৈরি হয়েছে। তিনি ইঙ্গিত দেন যে অনেকে আহত হয়েছেন এবং জরুরি সেবার যানবাহন চলাচলের জন্য সড়ক ফাঁকা রাখার আহ্বান জানান।
আফটারশকে আরো ক্ষতি করতে পারে বলে তিনি মানুষকে বাইরে অবস্থান করার পরামর্শ দেন।
এদিকে ব্রাজিলের আমাজন অঞ্চলের মানাউস, বেলেম ও মাকাপা শহরের বিভিন্ন ভবন খালি করে দেয়া হয় বলে টিভি গ্লোবোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
কলম্বিয়ার ক্যারিবীয় উপকূল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলেও ভূমিকম্পের কম্পন অনুভূত হয়। তবে সেখানে কোনো হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। কলম্বিয়ার সামুদ্রিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশটির ক্যারিবীয় উপকূলে সুনামির কোনো ঝুঁকি নেই।
মার্কিন প্যাসিফিক সুনামি সতর্কীকরণ কেন্দ্র ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জের জন্য সুনামি সতর্কতা জারি করে। ডমিনিকান প্রজাতন্ত্রের কর্তৃপক্ষও সতর্কতা জারি করে। তবে পুয়ের্তো রিকোর জন্য জারি হওয়া সতর্কতা দ্রুত প্রত্যাহার করা হয়।
ভেনিজুয়েলার অবস্থান একাধিক ফল্ট লাইনের কাছাকাছি। তবে দক্ষিণ আমেরিকান ও ক্যারিবীয় টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় লাতিন আমেরিকার অনেক দেশের তুলনায় সেখানে ভূমিকম্প তুলনামূলক কম ঘটে।
অন্যদিকে মেক্সিকো ও চিলির মতো প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলবর্তী দেশগুলোতে নিয়মিত ভূমিকম্প হয়। দেশ দুটি ভূমিকম্পপ্রবণ টেকটোনিক বেল্ট ‘প্যাসিফিক রিং অব ফায়ার’-এর অংশ, যা বিশ্বের প্রায় ৯০ শতাংশ ভূমিকম্পের জন্য দায়ী।