চার বছর আগে জাতীয় টেলিভিশনে ভাষণ দিয়ে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রায় সামরিক অভিযান শুরু করেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। সরকারি ভাষ্যে যার নাম ‘স্পেশাল মিলিটারি অপারেশন’ (এসএমও)। তখন অবশ্য কেউ ভাবেনি এটি ১৯৪১-৪৫ সালের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী হবে।
গত চার বছরে যুদ্ধের আঁচ রুশদের জীবনে গভীর পরিবর্তন এনেছে। স্থানীয় বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ এ অভিযানে রুশ সেনাদের নিহতের সংখ্যা ১ লাখ ৮৬ হাজার ছাড়িয়েছে, যা ১৯৮০-এর দশকে আফগানিস্তান যুদ্ধে সোভিয়েত রেড আর্মির ক্ষতির প্রায় ১৩ গুণ।
সীমান্তে যুদ্ধের ছায়া
ইউক্রেন সীমান্ত সংলগ্ন রাশিয়ার কুরস্ক ও বেলগোরোদ অঞ্চলগুলো এখন নিয়মিত ড্রোন হামলা, কামানের গোলা ও স্থল অভিযানের সাক্ষী। কুরস্কের একটি অংশ সাময়িকভাবে ইউক্রেনীয় বাহিনীর নিয়ন্ত্রণেও ছিল। এক সময় সেখানে দিনে কয়েকবার হামলা হতো। আশ্চর্যের বিষয় হলো, মানুষ এখন এতটাই অভ্যস্ত হয়ে গেছে যে সাইরেন বাজলেও কেউ আর আশ্রয়কেন্দ্রে ছুটে যায় না।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ফোনার ডট টিভির তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর বেলগোরোদ অঞ্চলে ইউক্রেনীয় হামলায় অন্তত ৪৫৮ বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।
তবে মস্কো ও সেন্ট পিটার্সবার্গের মতো বড় শহরগুলোয় যুদ্ধের প্রভাব তুলনামূলক কম। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা সেখানে বড় বাধা হয়ে ওঠেনি। মস্কোর ৩০ বছর বয়সী আন্দ্রেই জানালেন, নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আকাশচুম্বী। অল্প কেনাকাটাতেই এক হাজার রুবল খরচ হয়ে যায়। কিন্তু নগরবাসীর ক্রয়ক্ষমতা খুব একটা কমেনি।
পণ্য সংকট ও প্রযুক্তির পরিবর্তন
পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে জনপ্রিয় অনেক ব্র্যান্ড বাজার থেকে হারিয়ে গেছে। এলজির মতো কিছু দক্ষিণ কোরীয় পণ্য বাজারে ফিরলেও বিকল্প হিসেবে আসা চীনা পণ্যগুলোর মান নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে সংশয় রয়েছে। সেন্ট পিটার্সবার্গের আলোকচিত্রী কিরিল এফ বলেন, আগে যে ব্র্যান্ডগুলো পাওয়া যেত, সেগুলো এখন সরাসরি দোকানে নেই—রিসেলারদের কাছ থেকে বেশি দামে কিনতে হয়। তবে কোনোটিই জার্মানি বা পোল্যান্ডের প্রযুক্তির মানের সমতুল্য নয়।
এছাড়া অ্যাপল বা অন্যান্য বিদেশী অ্যাপের পেমেন্ট সচল রাখতে অনেক রুশ নাগরিক এখন কিরগিজস্তানের মতো প্রতিবেশী দেশের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করছেন
এছাড়া, সরকারের নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ আরো কঠোর হয়েছে। ফেক নিউজ বা ভুয়া খবর রোধে অত্যন্ত কঠোর আইন করেছে ক্রেমলিন। ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুক ব্লক করা হয়েছে। ইউটিউব, হোয়াটসঅ্যাপ বা টেলিগ্রামের গতি কমিয়ে দিয়ে রাষ্ট্রসমর্থিত বিকল্প প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের ওপর জোর দেয়া হচ্ছে। এটিকে ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছে তরুণ প্রজন্ম। ৩৯ বছর বয়সী ফটোগ্রাফার কিরিল মনে করেন, ব্লক করার এ নীতি তরুণ প্রজন্মের মনে রাষ্ট্রের প্রতি ঘৃণা তৈরি করবে।
যুদ্ধ নিয়ে জনমত: সমর্থন, সংশয় ও উদাসীনতা
জনমত জরিপ অনুযায়ী, এখনো রাশিয়ার অধিকাংশ মানুষ যুদ্ধের পক্ষে। এর পেছনে বড় কারণ উচ্চ বেতন। সেনাবাহিনীতে যোগ দিলে বিপুল অংকের অর্থ পাওয়া যায়।
শুরুতে যুদ্ধের বিরোধীতা করতেন সারাতভের ভ্লাদিস্লাভ। তবে বর্তমানে তিনি ইউক্রেনীয়দের ফ্যাসিস্ট মনে করেন। আর তাই যুদ্ধে তার পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। সম্প্রতি তার ভাই ড্রোন পাইলট হিসেবে রুশ বাহিনীতে যোগ দিয়েছেন।
সেন্ট পিটার্সবার্গের নাগরিক কিরিল যুদ্ধকে শুরুতে রুশ কূটনীতির ব্যর্থতা মনে করলেও এখন বলছেন, যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে শেষ পর্যন্ত যেতে হয়। পুরোপুরি পরাজয় কেউ চায় না, এমনকি যুদ্ধবিরোধীরাও না।
সামনের সারির অভিজ্ঞতা: পলায়ন, দেশত্যাগ ও হতাশা
তবে যারা যুদ্ধের ভয়াবহতা কাছ থেকে দেখেছেন তাদের কথা ভিন্ন। সাইবেরিয়ার কেমেরোভোর ট্রাকচালক আলেক্সান্দার মেদভেদেভ (ছদ্মনাম) বাধ্যতামূলক সামরিক দায়িত্ব শেষে আবারও মোতায়েন হন। তবে লুহানস্কে যুদ্ধের ভয়াবহতা দেখে তার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যায়।
রণক্ষেত্রে গিয়ে তিনি বুঝতে পারেন, যুদ্ধ কেবল মরদেহের পাহাড় আর অনাথ শিশু তৈরি করছে। একপর্যায়ে তিনি সম্মুখ সমর ছেড়ে পালিয়ে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সহায়তায় দেশ ছাড়েন। এখন তিনি এমন এক রাশিয়ায় ফিরতে চান যেখানে শান্তির মূল্য থাকবে।
যুদ্ধের প্রথম বছরে প্রায় ২০ লাখ রুশ নাগরিক দেশ ছেড়েছেন বলে বিশেষজ্ঞদের অনুমান। যাদের মধ্যে অধিকাংশ দেশ ছেড়েছেন বাধ্যতামূলক নিয়োগের ভয়ে, বাকিরা পুতিনবিরোধী অবস্থানের কারণে।
তবে অভিবাসী জীবনে মানিয়ে নেয়া কঠিন হওয়ায় অনেকেই দেশে ফিরেছেন। জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশে অভিবাসীবিরোধী মনোভাবও বাড়ছে। তবে ফিরে আসা রুশদের অভিমত, দীর্ঘ চার বছরে রাশিয়ার পরিস্থিতি ক্রমেই অন্ধকারাচ্ছন্ন। ইউক্রেনের অবকাঠামো ধ্বংসের ঘটনাকে তারা পুতিন সরকারের নির্মমতার প্রমাণ হিসেবে দেখেন।
বিভক্ত বাস্তবতায় একটি বিষয় স্পষ্ট—এ যুদ্ধ শুধু ইউক্রেনের ভূখণ্ডে নয়, রাশিয়ার সমাজ, রাজনীতি ও মানসিকতাতেও গভীর ছাপ ফেলেছে।