দুবাইয়ে ভাড়া বাসায় অভিযান, গৃহহীন হওয়ার ঝুঁকিতে হাজারো অভিবাসী শ্রমিক

‘তারা আপনাকে বলবে এখান থেকে চলে যেতে। কিন্তু আপনি কোথায় যাবেন—সে বিষয়ে কিছুই বলবে না।‘

নিম্নআয়ের শ্রমিকরা মাসে গড়ে ৩০০ থেকে ৫৫০ ডলার আয় করেন। তারা সাধারণত ২২৫-২৭০ ডলারে একটি ছোট ঘরের অংশ ভাড়া নেন, কখনো শেয়ার করে আরো কম খরচে থাকেন। অথচ শহরে ১ বেডরুমের ফ্ল্যাটের মাসিক গড় ভাড়া প্রায় ১,৪০০ ডলার।

দুবাইয়ের ঝলমলে অট্টালিকা আর বিলাসবহুল পেন্টহাউসের শহরের এক কোণায় একটি জীর্ণ অ্যাপার্টমেন্টে থাকেন মিশরীয় অভিবাসী শ্রমিক হিশাম। দুই বেডরুমের সেই বাসায় থাকেন ১০ জন পুরুষ। আর হিশামের ঘর বলতে মূলত একটি কেবিনেটের মতো ছোট জায়গা— যেখানে কেবল একটি গদি বিছানো যায়।

এই সংকুচিত ও অনিরাপদ থাকার জায়গার জন্য তাকে মাসে ২৭০ ডলার গুনতে হয়। কিন্তু দুবাই কর্তৃপক্ষ এখন এই জায়গা থেকেও তাকে বের করে দিচ্ছে। হিশাম হলেন সেই অসংখ্য নিম্নআয়ের অভিবাসী শ্রমিকদের একজন, যারা দুবাইয়ে অবৈধ বাসা-বাড়িতে থাকার দায়ে শুরু হওয়া অভিযানের কবলে পড়েছেন।

জুন মাসে একটি বহুতল ভবনে আগুন লাগার ঘটনার পর দুবাই কর্তৃপক্ষ আশঙ্কা করে যে, পার্টিশন দেয়া এসব বাসাগুলো তৈরি করছে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি। এরপরই শুরু হয় ব্যাপক অভিযান।

এসব অ্যাপার্টমেন্টে পাতলা দেয়াল, প্লাইউড, পর্দা ইত্যাদির মাধ্যমে একেকটি বাসা ১০ থেকে ২০ জন মানুষের জন্য ভাগ করে তৈরি করা হয় অস্থায়ী ডরমেটরির মতো। বিছানার স্থান মাত্র কয়েক ডলারে ভাড়া দেয়া হয়। গোপনীয়তা বলতে কিছুই থাকে না। তবুও এসব অ্যাপার্টইমেন্টই নিম্ন আয়ের অভিবাসীদের একমাত্র ভরসা। হিশাম বলেন, ‘এখন আমরা জানি না কী করব। আমাদের কাছে বসবাসের আর কোনো বিকল্প নেই।‘

দুবাই মিউনিসিপ্যালিটি অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে দেয়া এক বিবৃতিতে জানায়, তারা অগ্নি ও নিরাপত্তা ঝুঁকি কমানোর লক্ষ্যে সারা শহরে পরিদর্শন চালাচ্ছে। এর লক্ষ্য হলো সর্বোচ্চ জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ভাড়াটিয়াদের জীবনের মান উন্নত করা। তবে যারা বৈধ বাসাভাড়া নিতে পারেন না, তারা কোথায় থাকবে—সে বিষয়ে কিছু বলা হয়নি।

দুবাইয়ের একটি অ্যাপার্টমেন্টের দরজাজুড়ে সস্তায় ঘর ভাড়া দেয়ার বিজ্ঞাপন। ছবি- এপি

দুবাইয়ে শ্রম ইউনিয়ন নিষিদ্ধ এবং ন্যূনতম মজুরির নিশ্চয়তা নেই। কভিড-পরবর্তী সময়ে দুবাইয়ে ব্যাপক জনসংখ্যা ও রিয়েল এস্টেট বৃদ্ধির কারণে ভাড়া বেড়েছে আশঙ্কাজনকভাবে। বর্তমানে দুবাইয়ের জনসংখ্যা প্রায় ৩৯ লাখ, যা ২০৪০ সালের মধ্যে ৫৮ লাখে পৌঁছাবে বলে পূর্বাভাস।

শহরটিতে বেশিরভাগ আবাসন প্রকল্প উচ্চআয়ের বিদেশীদের জন্য নির্মিত। নিম্নআয়ের শ্রমিকরা মাসে গড়ে ৩০০ থেকে ৫৫০ ডলার আয় করেন। তারা সাধারণত ২২৫-২৭০ ডলারে একটি ছোট ঘরের অংশ ভাড়া নেন, কখনো শেয়ার করে আরো কম খরচে থাকেন। অথচ শহরে ১ বেডরুমের ফ্ল্যাটের মাসিক গড় ভাড়া প্রায় ১,৪০০ ডলার।

হোটেল, নির্মাণ কোম্পানি বা রিসোর্টের মতো প্রতিষ্ঠান যদি কর্মচারীকে ৪০০ ডলারের নিচে বেতন দেয়, তাহলে আবাসনের ব্যবস্থা করতে প্রতিষ্ঠানগুলো আইনত বাধ্য। কিন্তু বহু শ্রমিক অনানুষ্ঠানিকভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত, ফলে তাদের আবাসন অনেকটা দৃষ্টির বাইরেই রয়ে যায়।

উগান্ডার ২৪ বছর বয়সী নিরাপত্তাকর্মী হাসান জানান, তিনি একজন বন্ধুর সঙ্গে একই বিছানায় শেয়ার করে থাকেন। এখনো তার কক্ষ কর্তৃপক্ষের নজরে আসেনি। তবে দুশ্চিন্তায় আছেন তিনি। হাসান বলেন, ‘তারা আপনাকে বলবে এখান থেকে চলে যেতে। কিন্তু আপনি কোথায় যাবেন—সে বিষয়ে কিছুই বলবে না।‘

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অভিযান বহু মানুষকে বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে ঠেলে দিচ্ছে। লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের উপসাগরীয় শ্রমবাজার বিশেষজ্ঞ স্টেফেন হার্টগ বলেন, ‘এই পদক্ষেপ এমন সব মানুষের ওপর চাপ তৈরি করবে, যাদের অবস্থা আগে থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ।‘

এপি অবলম্বনে

আরও