২৫০ দিনের বেশি সমুদ্রে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন

মার্কিন রণতরীতে খাদ্য-স্যানিটেশন সমস্যা ও নাবিকদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত ৯৫৬ জন নাবিকের ওপর করা এক গবেষণায় দেখা যায়, মার্কিন সামরিক বাহিনীর অন্যান্য শাখার তুলনায় নৌবাহিনীর জাহাজে থাকা সদস্যদের মধ্যে ‘গুরুতর মানসিক চাপের’ হার সবচেয়ে বেশি। গবেষণায় এর পেছনে জাহাজে বসবাসের অনুপযোগী পরিবেশ, অতিরিক্ত শব্দ এবং এমন কঠোর কর্মসূচিকে দায়ী করা হয়, যার কারণে পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রামের সময় পাওয়া যায় না

২৫০ দিনের বেশি সময় ধরে সমুদ্রে রয়েছে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন। এতে কয়েক হাজার নাবিক খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর সংকট, পানি-স্যানিটেশন সমস্যা এবং চরম ক্লান্তির মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এরই মধ্যে অনেকে আত্মহত্যাপ্রবণ হয়ে উঠেছেন। এ পরিস্থিতিতে আইনপ্রণেতারা পেন্টাগনের কাছে জবাব চেয়েছেন এবং ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের মধ্যে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপরও চাপ বাড়ছে। খবর বিবিসি।

সামরিকবিষয়ক কয়েকটি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের কিছু নাবিক জাহাজ থেকে সমুদ্রে ঝাঁপ দেয়ার চেষ্টা করেছেন। স্বজনদের মধ্যেও এ নাবিকদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

তবে গতকাল মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জাহাজটির পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোকে ‘পুরোপুরি ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে’ বলে দাবি করেছেন।

ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন গত নভেম্বরে ক্যালিফোর্নিয়া থেকে দক্ষিণ চীন সাগরের উদ্দেশে যাত্রা করে। পরে ইরানে হামলার আগে ফেব্রুয়ারিতে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয়।

সর্বশেষ মোতায়েনের মেয়াদ শুরুতে মে মাসে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা একের পর এক সময় বাড়ানো হয়েছে। এখনো জাহাজটির দেশে ফেরার নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা করা হয়নি। তবে বৃহস্পতিবার একাধিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, পূর্বনির্ধারিত রোটেশন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের পরিবর্তে ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটনকে পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।

কানেকটিকাটের ডেমোক্র্যাট সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথাল হেগসেথকে লেখা এক চিঠিতে প্রায় ৫ হাজার মানুষ থাকা জাহাজটির কথিত দুর্ভোগের বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন। এর মধ্যে রয়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর সংকট, পানিদূষণ, স্যানিটেশন সমস্যা, মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি, ডেকে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং ডাকব্যবস্থায় বিঘ্ন। জাহাজে পাঠানো অনেক পার্সেল ও সামগ্রী মাসের পর মাস পৌঁছছে না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

সশস্ত্র বাহিনী বিষয়ক কমিটির সদস্য ব্লুমেনথাল লিখেছেন, এসব অভিযোগের তাৎক্ষণিক তদন্ত প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রশ্ন তুলেছেন, নৌবাহিনীর বিমানবাহী রণতরীগুলোর ওপর বর্তমানে যে মাত্রার দায়িত্ব দেয়া হচ্ছে, তা দীর্ঘমেয়াদে সামাল দেয়ার মতো সক্ষমতা বাহিনীর আছে কিনা।

দুই মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে সিবিএস নিউজ জানিয়েছে, চলতি মাসের শুরুতে একজন নাবিক জাহাজ থেকে সমুদ্রে পড়ে যান। পরে একটি হেলিকপ্টারের মাধ্যমে তাকে উদ্ধার করা হয়। জাহাজের চিকিৎসা বিভাগে প্রাথমিক চিকিৎসার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে জাহাজ থেকে সরিয়ে নেয়া হয়। ঘটনাটি কীভাবে ঘটেছে, তা তদন্ত করা হচ্ছে।

এর আগে মিলিটারি টাইমস ও স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস জানিয়েছিল, কয়েকজন নাবিক জাহাজ থেকে সমুদ্রে ঝাঁপ দেয়ার কথা ভেবেছিলেন বলে স্বজনরা জানিয়েছেন। দীর্ঘ সময় সমুদ্রে থাকা এবং জাহাজের কঠিন পরিস্থিতি কিছু নাবিকের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে তাদের দাবি।

অভিযোগের মধ্যে আরো রয়েছে—এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে কাপড় ধোয়ার ব্যবস্থা না থাকা এবং বন্দরে খুব কম যাতায়াতের কারণে তাজা খাবার না পাওয়া। বন্দরে গেলেও অনেক সময় নাবিকদের জাহাজ থেকে নামার অনুমতি দেয়া হয় না।

জাহাজে থাকা এক নাবিকের স্বজন জানিয়েছেন, মোতায়েন শুরু হওয়ার পর ওই নাবিকের প্রায় ৬৫ পাউন্ড বা ২৯ কেজি ওজন কমেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই স্বজন জানান, তার আত্মীয় নিশ্চিত করেছেন যে কয়েকজন নাবিক জাহাজ থেকে ঝাঁপ দেয়ার চেষ্টা করেছেন।

সাম্প্রতিক একাধিক হোয়াটসঅ্যাপ কথোপকথনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, নাবিকটি তাকে বলেছিলেন, ‘আমি ভীষণ ক্লান্ত। একেবারে শেষ।’

ওই নাবিক আরো জানিয়েছেন, জাহাজের ইঞ্জিন এবং যুদ্ধবিমান ওঠানামার কারণে সারাক্ষণ শব্দ ও কম্পনের মধ্যে থাকতে হয়। ঘুম, খাওয়া কিংবা গোসল—সব সময়ই জাহাজের কম্পন অনুভূত হয়।

ক্যালিফোর্নিয়ার ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসম্যান মাইক লেভিন এক্সে অভিযোগগুলোর সংক্ষিপ্তসারে বলেন, জাহাজে ছত্রাকযুক্ত গোসলখানা, নষ্ট টয়লেট, কয়েক সপ্তাহ ধরে অচল লন্ড্রি ব্যবস্থা, দীর্ঘ সময় গরম পানি না থাকা এবং কোনো এক বেলায় মাত্র আধা কাপ ভাত ও দুটি টর্টিলা দেয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এমনকি সাবান, ডিওডোরেন্ট ও টুথপেস্টেরও সংকট রয়েছে বলে তিনি জানান।

তবে এসব অভিযোগের পর মার্কিন নৌবাহিনীর এক কর্মকর্তা বলেন, জাহাজটিতে আত্মহত্যার চিন্তা বা আত্মহত্যার চেষ্টার ঘটনা বেড়েছে—এমন কোনো প্রমাণ তারা পাননি।

ওই কর্মকর্তা জানান, যুদ্ধের কারণে ‘প্রচলিত সরবরাহকেন্দ্রগুলো’ ব্যাহত হয়েছে। বর্তমানে ‘মিশনের জন্য অত্যাবশ্যকীয় সরঞ্জাম’ জাহাজে পৌঁছানোকে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘প্রথমে খাবার, এরপর স্বাস্থ্যবিধির সামগ্রী, তারপর ডাক।’

গতকাল পানামায় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথও অভিযোগগুলো নাকচ করেন। তিনি বলেন, সরকার নিশ্চিত করে যে প্রতিটি জাহাজ, প্রতিটি ক্রু এবং প্রতিটি ক্যাপ্টেনকে প্রতিটি মুহূর্তে যতটা সম্ভব প্রয়োজনীয় সহায়তা দেয়া হচ্ছে।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত ৯৫৬ জন নাবিকের ওপর করা এক গবেষণায় দেখা যায়, মার্কিন সামরিক বাহিনীর অন্যান্য শাখার তুলনায় নৌবাহিনীর জাহাজে থাকা সদস্যদের মধ্যে ‘গুরুতর মানসিক চাপের’ হার সবচেয়ে বেশি।

গবেষণায় এর পেছনে জাহাজে বসবাসের অনুপযোগী পরিবেশ, অতিরিক্ত শব্দ এবং এমন কঠোর কর্মসূচিকে দায়ী করা হয়, যার কারণে পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রামের সময় পাওয়া যায় না।

এদিকে ইউএসএনআই নিউজের সামরিক তথ্য বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আত্মহত্যা এখনো মার্কিন নৌবাহিনী ও মেরিন কোরে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। আর মার্কিন ভেটেরান্স অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্যানুযায়ী, সামরিক বাহিনীতে কাজ করা সাবেক সদস্যদের মধ্যে আত্মহত্যার হার সামরিক বাহিনীতে কখনো কাজ না করা আমেরিকানদের তুলনায় বেশি।

আরও