থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংকক ও আশপাশের কয়েকটি প্রদেশে ভারি বৃষ্টি ও বন্যায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। তবে ঢাকা-ব্যাংকক বিমান যোগাযোগ চালু রয়েছে। ব্যাংককের বিভিন্ন এলাকায় এখনো পানি জমে থাকায় সড়ক যোগাযোগ স্বাভাবিক হয়নি। এ পরিস্থিতিতে বিদেশী পর্যটকরা হোটেলেই অবস্থান করতে বাধ্য হচ্ছেন। বাংলাদেশ থেকে চিকিৎসা ও ভ্রমণের জন্য থাইল্যান্ডে যাওয়া অনেকেই ব্যাংককের বিভিন্ন হোটেলে আটকা পড়েছেন। এ অবস্থায় বাংলাদেশী যাত্রীসহ সবাইকে সুবর্ণভূমি বিমানবন্দরে যাওয়ার জন্য অতিরিক্ত সময় হাতে রাখার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।
থাইল্যান্ডের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন দুর্যোগ প্রতিরোধ ও প্রশমন বিভাগের (ডিডিপিএম) ২৭ সেপ্টেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির ২৫টি প্রদেশের ১২৮টি জেলা, ৫৮৭টি উপজেলা ও ২ হাজার ৫০০টি গ্রাম বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে। এতে ১ লাখ ৭৪ হাজার ৮০৩টি পরিবার বা ৫ লাখ ৪৫ হাজার ২২ জন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। রাজধানী ব্যাংককের ৫০টি জেলায়ও বন্যার প্রভাব পড়েছে।
বন্যা ও ভারি বৃষ্টির কারণে ব্যাংকক, ননথাবুরি, পাথুম থানি ও সামুত প্রাকান এলাকায় ২৮ ও ২৯ সেপ্টেম্বর বিশেষ সরকারি ছুটি ঘোষণা করেছে থাইল্যান্ড সরকার। দেশটির প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উপমুখপাত্র লালিদা পেরিসভিভাতানা জানিয়েছেন, এসব এলাকায় ভারি বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে মানুষের চলাচলে যে সমস্যা তৈরি হয়েছে, তা বিবেচনায় নিয়ে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। সরকারি অনলাইন সেবা চালু থাকবে। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি খাত ও হাসপাতালগুলো প্রয়োজন ও পরিস্থিতি বিবেচনা করে কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
ব্যাংককে অবস্থানরত বাংলাদেশীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শহরের বেশকিছু এলাকায় পানি নামতে শুরু করেছে। গতকালও বৃষ্টি হয়েছে, তবে আগের মতো মুষলধারায় নয়। ব্যাংককের বন্যাপ্রবণ ও পানিতে নিমজ্জিত এলাকাগুলোয় এখনো পানি রয়েছে। সেসব এলাকায় সরকারি উদ্যোগে ভুক্তভোগীদের মধ্যে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে। তবে জনজীবন স্বাভাবিক হয়নি।
স্থানীয় বাসিন্দারা মূলত ঘরেই অবস্থান করছেন। বিদেশী পর্যটকরা অবস্থান করছেন হোটেলেই। শহরের গুরুত্বপূর্ণ অনেক সড়ক এখনো পানির নিচে ডুবে আছে। সেখানে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়নি। তবে ব্যাংককের এ জলমগ্নতায় বাংলাদেশ থেকে থাইল্যান্ডমুখী ফ্লাইট বন্ধ হয়নি।
থাইল্যান্ডভিত্তিক ভ্রমণ ও চিকিৎসাসেবায় সহায়তা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান সিয়া নয় ফিট অ্যান্ড ফ্লাইয়ের প্রতিষ্ঠাতা মাজেদুল নয়ন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ব্যাংককে পানি কমতে শুরু করেছে, তবে বাংলাদেশ থেকে যেসব পর্যটক থাইল্যান্ডে এসেছেন তাদের অনেকে হোটেলে আটকা পড়েছেন। আর বন্যার কারণে দেশ থেকে থাইল্যান্ডে আসছেন না বিষয়টি এমন নয়। কারণ তাদের চিকিৎসা কিংবা ভ্রমণের জন্য পূর্বনির্ধারিত টিকিট বুকিং দেয়া। এখানে ব্যয়ের বিষয়টি জড়িত থাকায় বন্যাকে উপেক্ষা করেও বাংলাদেশ থেকে মানুষ থাইল্যান্ডে আসছেন।’
এদিকে ব্যাংককে বাংলাদেশ দূতাবাস সূত্রে জানা গেছে, সেখানে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশীরা নিরাপদ রয়েছেন। এখন পর্যন্ত কোনো বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি বা জরুরি সহায়তার আবেদন পাওয়া যায়নি। দূতাবাসের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, গত বৃহস্পতি ও শুক্রবার টানা ৪৮ ঘণ্টা ব্যাংকক ও আশপাশের প্রদেশগুলোতে মুষলধারায় বৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। মুষলধারায় বৃষ্টির পরিবর্তে হালকা বৃষ্টি ও বাতাস রয়েছে। কিছু এলাকায় পানি জমে থাকলেও এখন পর্যন্ত বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
দূতাবাস সূত্র জানিয়েছে, গত বছর থাইল্যান্ডের সংখলা এলাকায় বন্যার সময় উদ্ধার সহায়তার জন্য প্রবাসীদের কাছ থেকে অনেক সহায়তার আবেদন এসেছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে এখন পর্যন্ত তেমন কোনো আবেদন পাওয়া যায়নি।
থাই সরকারের দুইদিনের প্রশাসনিক ছুটির সিদ্ধান্ত অনুসরণ করে ব্যাংককের বাংলাদেশ দূতাবাসও ২৮ ও ২৯ সেপ্টেম্বর কনস্যুলার সেবা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বন্যার মধ্যেও ব্যাংককের সুবর্ণভূমি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও ডন মুয়াং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর চালু রয়েছে। থাইল্যান্ডের পর্যটন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বৃষ্টি ও স্থানীয় জলাবদ্ধতার কারণে দুই বিমানবন্দরে যাতায়াতের সড়কে যানজট ও বিলম্ব হতে পারে। তাই যাত্রীদের অতিরিক্ত সময় হাতে নিয়ে বিমানবন্দরে যাওয়া এবং যাত্রার আগে নিজ নিজ এয়ারলাইনসের কাছ থেকে ফ্লাইটের সর্বশেষ অবস্থা জেনে নেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।
ঢাকা-ব্যাংকক-ঢাকা রুটে বর্তমানে প্রতিদিন একটি করে ফ্লাইট পরিচালনা করছে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে ব্যাংককের সুবর্ণভূমি বিমানবন্দর থেকে কোনো ফ্লাইট বাতিল না হলেও সূচি কিছুটা এলোমেলো হওয়ার কথা জানিয়েছেন ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) কামরুল ইসলাম।
কামরুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ব্যাংকক-ঢাকা রুটের ফ্লাইটের যাত্রীদের সঙ্গে আমরা নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি। তাদেরকে ফ্লাইট ছাড়ার অন্তত ৪ ঘণ্টা আগে বিমানবন্দরে উপস্থিত থাকার অনুরোধ করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত আমাদের কোনো ফ্লাইট বাতিল হয়নি।’
বাংলাদেশ থেকে থাইল্যান্ডগামী এবং থাইল্যান্ড থেকে বাংলাদেশে ফেরত আসা যাত্রীদের ক্ষেত্রে বিমানবন্দরে যাওয়ার জন্য স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি সময় হাতে রাখার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে যাত্রার আগে ফ্লাইটের সময়সূচি, বিমানবন্দরে যাতায়াতের সড়ক পরিস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনসের সর্বশেষ নির্দেশনা যাচাই করে নেয়ার ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।