১২তম দিনে গড়াল আন্দোলন

খামেনির পতনের দাবিতে গণবিক্ষোভে উত্তাল ইরান, নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৪৫

সর্বোচ্চ নেতা খামেনি বিক্ষোভকারীদের ‘দাঙ্গাবাজ’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে তাদের দমনের ইঙ্গিত দিয়েছেন।

বিক্ষোভকারীদের ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির পতনের আহ্বান জানাতে এবং প্রয়াত সাবেক শাহের নির্বাসিত পুত্র রেজা পাহলভির প্রত্যাবর্তনের দাবি করতে শোনা গেছে। ‘দিস ইজ দ্য ফাইনাল ব্যাটল, পাহলভি উইল রিটার্ন’—এমন স্লোগান প্রতিধ্বনিত হয় তেহরান, মাশহাদ, তাবরিজ, ইসফাহান ও বাবোলসহ বিভিন্ন শহরে।

রাজধানী তেহরানসহ সারা ইরান এখন সরকারবিরোধী বিক্ষোভে উত্তাল। গত কয়েক বছরের মধ্যে এটিকে ইসলামি প্রজাতন্ত্রটির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তেহরান এবং দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মাশহাদসহ ৩১টি প্রদেশের শতাধিক শহর ও জনপদে বিশাল বিশাল বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কর্তৃপক্ষ দেশজুড়ে ইন্টারনেট সেবা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে বলে জানিয়েছে ইন্টারনেট মনিটরিং গ্রুপ নেটব্লকস। খবর বিবিসি।

ভিডিও ফুটেজে বিক্ষোভকারীদের ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির পতনের আহ্বান জানাতে এবং প্রয়াত সাবেক শাহের নির্বাসিত পুত্র রেজা পাহলভির প্রত্যাবর্তনের দাবি করতে শোনা গেছে। ‘দিস ইজ দ্য ফাইনাল ব্যাটল, পাহলভি উইল রিটার্ন’—এমন স্লোগান প্রতিধ্বনিত হয় তেহরান, মাশহাদ, তাবরিজ, ইসফাহান ও বাবোলসহ বিভিন্ন শহরে। মাশহাদে এক পর্যায়ে কয়েকজন বিক্ষোভকারী একটি ওভারপাসে ওঠে নজরদারি ক্যামেরা খুলে ফেলেন বলেও ভিডিওতে দেখা যায়।

মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, গত ১২ দিনের বিক্ষোভে নিহতের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। নরওয়েভিত্তিক সংস্থা ইরান হিউম্যান রাইটস জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত অন্তত ৪৫ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৮ জন শিশু। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা এইচআরএএনএ নিহতের সংখ্যা ৩৪ বলে উল্লেখ করেছে এবং অন্তত ২ হাজার ২৭০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে দাবি করেছে। সরকারি তথ্যে অন্তত ৬ জন নিরাপত্তারক্ষীর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে।

ইরানে সরকারবিরোধী আন্দোলন। ছবি- এপির ভিডিও থেকে নেয়া

ইরানের কুর্দি অধ্যুষিত অঞ্চলে বিরোধী দলগুলোর ডাকে সাধারণ ধর্মঘট পালিত হচ্ছে। সেখানকার ইলাম ও কেরমানশাহ প্রদেশে বিক্ষোভকারীদের ওপর নিরাপত্তারক্ষীরা সরাসরি গুলি চালিয়েছে বলে অভিযোগ ওঠেছে। অন্যদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান নিরাপত্তারক্ষীদের ‘সর্বোচ্চ ধৈর্য’ ধরার আহ্বান জানালেও সর্বোচ্চ নেতা খামেনি বিক্ষোভকারীদের ‘দাঙ্গাবাজ’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে তাদের দমনের ইঙ্গিত দিয়েছেন।

এদিকে, ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থানরত রেজা পাহলভি বিক্ষোভ শুরুর আগে ইরানিদের ‘একতাবদ্ধ হয়ে রাস্তায় নামার’ আহ্বান জানান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লেখেন, ‘আজ রাতে লাখো ইরানি তাদের স্বাধীনতার দাবি জানিয়েছে।’ সরকারকে ‘জবাবদিহির আওতায় আনার’ জন্য তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ধন্যবাদ দেন এবং ইউরোপীয় নেতাদের অভিন্ন অবস্থান নেয়ার আহ্বান জানান।

এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পুনরায় হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, বিক্ষোভকারীদের হত্যার ঘটনা ঘটলে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর প্রতিক্রিয়া জানাবে। ‘তারা যদি মানুষ হত্যা শুরু করে, আমরা খুব কঠিনভাবে আঘাত করব,’ বলেন ট্রাম্প।

গত বছরের তুলনায় রিয়ালের রেকর্ড দরপতন, ৪০ শতাংশ মূল্যস্ফীতি, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং দুর্নীতির অভিযোগে জর্জরিত অর্থনীতিই এই আন্দোলনের মূল কারণ বলে বিশ্লেষকদের মত। এক তেহরানবাসী নারী বিবিসিকে বলেন, ‘আমরা শূন্যে ঝুলে আছি—পালানোর ডানা নেই, এখানে থাকার আশাও নেই। জীবন অসহনীয় হয়ে ওঠেছে।‘

২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে হওয়া গণআন্দোলনের পর এই বিক্ষোভকে সবচেয়ে বিস্তৃত আন্দোলন হিসেবে দেখা হচ্ছে। তার আগে ২০০৯ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের পর হওয়া আন্দোলন ছিল ইসলামি বিপ্লব-পরবর্তী ইরানে সবচেয়ে বড় গণবিক্ষোভ।

আরও