নাৎসিদের ভৌগোলিক গোপন শহর: পোল্যান্ডের মাটির নিচে অন্ধকার ইতিহাস

সুড়ঙ্গপথগুলো পর্যটনকেন্দ্রে রূপ নিয়েছে। ভেতরে নেমে গেলে এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়। ঠান্ডা, স্যাঁতসেঁতে বাতাসে ভেসে আসে ইতিহাসের গন্ধ। দেয়ালে এখনো দেখা যায় ‘বাঙ্কার পিপল’ নামের এক সাবকালচারের রেখে যাওয়া গ্রাফিতি।

পোল্যান্ডের ছোট্ট গ্রাম পনিয়েভোর। প্রথম দেখায় আশপাশের গ্রামাঞ্চলে তেমন কোনো অস্বাভাবিকতা চোখে পড়ে না। লুবুশ অঞ্চলের চিরচেনা দৃশ্য—আকাশছোঁয়া মাঠজুড়ে হলুদ ফসল, মাঝে মাঝে জঙ্গলের টুকরো টুকরো অংশ। দৃশ্যটি শান্তিপূর্ণ মনে হলেও, এর মাটির নিচে লুকিয়ে আছে এক অন্ধকার ইতিহাস— একটি নাৎসি ভূগর্ভস্থ শহর।

‘ওস্টওয়াল’ বা ‘ফেস্টুংসফ্রন্ট ওডার-ভার্থে-বোগেন’— দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে হিটলারের নির্দেশে নির্মিত এক দুর্গনগরী। জার্মানির পূর্ব সীমান্তকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে এটি নির্মিত হয়েছিল। সুড়ঙ্গ, রেলস্টেশন, যুদ্ধকক্ষ আর বিশাল শ্যাফট মিলিয়ে প্রায় ২০ মাইল দীর্ঘ এ কমপ্লেক্স আজও টিকে আছে।

নাৎসিরা ১৯৪৫ সালে জায়গাটি ত্যাগ করলে সোভিয়েত সেনারা কয়েক দিনের মধ্যেই তা দখল করে নেয়। পরে কিছুদিন পোলিশ সেনাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণের খরচ সামলানো কঠিন হওয়ায় ১৯৬০-এর দশকে জায়গাটি আবারো পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। তখন থেকেই জায়গাটি বাদুরের আস্তানা। প্রতিবছর প্রায় ৪০ হাজার বাদুড় এখানে এসে শীতকাল পার করে। এ কারণে এটি ইউরোপের অন্যতম বৃহৎ বাদুড় কলোনিতে পরিণত হয়েছে।

হিটলারের উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনায় প্রায় ৫০ মাইল দীর্ঘ প্রতিরক্ষা রেখা তৈরি করার কথা ছিল। কয়েক মিলিয়ন ঘনফুট কংক্রিট ব্যবহার করে বিশাল প্রকল্প হাতে নেয়া হয়, যা ১৯৫১ সাল পর্যন্ত চলার কথা ছিল। কিন্তু পশ্চিম ফ্রন্টে ফ্রান্সকে কেন্দ্র করে যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়ায় প্রকল্পটি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তবুও প্রকৌশলগত দিক থেকে এটি ছিল সে সময়ের অন্যতম উন্নত প্রতিরক্ষা লাইন।

আজ সুড়ঙ্গপথগুলো পর্যটনকেন্দ্রে রূপ নিয়েছে। ২০১১ সালে এখানে ‘মিয়েন্ডজিরেজ ফোর্টিফাইড রিজিয়ন মিউজিয়াম’ চালু হয়। ভেতরে নেমে গেলে এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়। ঠাণ্ডা, স্যাঁতসেঁতে বাতাসে ভেসে আসে ইতিহাসের গন্ধ। দেয়ালে এখনো দেখা যায় ‘বাঙ্কার পিপল’ নামের এক সাবকালচারের রেখে যাওয়া গ্রাফিতি। ১৯৮০ ও ৯০-এর দশকে তারা এখানে রেভ পার্টি, বিয়ে ও নানা অনুষ্ঠান করেছে। তবে দুর্ঘটনায় প্রাণও গেছে কয়েকজনের।

সুড়ঙ্গপথে গভীর শ্যাফট, রেললাইন আর সামরিক যান চলাচলের উপযোগী করিডর আজও বিস্ময় জাগায়। কোথাও কোথাও বাদুড় ঝুলে থাকে স্থির, আবার হঠাৎ ডানা মেলে উড়ে আসে সামনে। শীতকালে যখন তারা হাইবারনেশনে যায়, তখন পর্যটকদের প্রবেশ সীমিত রাখা হয়।

বর্তমানে পর্যটকেরা এখানে বিভিন্ন ধরনের ট্যুরে অংশ নিতে পারেন—স্বল্প সময়ের ১.৫ ঘণ্টার ভ্রমণ থেকে শুরু করে ‘এক্সট্রিম ট্যুর’, যা টানা ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত চলতে পারে। বৈদ্যুতিক ট্রেন কিংবা সোভিয়েত যুগের সাঁজোয়া যানেও ভ্রমণের সুযোগ রয়েছে।

লুবুশ অঞ্চল আজ শুধু এই ভূগর্ভস্থ নাৎসি শহর নয়, বরং নানামুখী আকর্ষণের কেন্দ্র। রাজধানী জিয়েলোনা গোরাকে বলা হয় ‘পোলিশ টাস্কানি’, যেখানে আঙুরক্ষেত আর ওয়াইন উৎসব স্থানীয়দের গর্ব। আবার শভিয়েবোদজিন শহরের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু যিশুখ্রিস্টের মূর্তি।

এই ছোট্ট অঞ্চলে তাই একসঙ্গে পাওয়া যায় ইতিহাসের অন্ধকার, বাদুড়ের উপনিবেশ, ধর্মীয় প্রতীক আর আঙুরক্ষেতের স্বাদ—যা পোল্যান্ডের মাটিতে তৈরি করেছে বৈচিত্র্যময় এক ভ্রমণ অভিজ্ঞতা।

সিএনএন অবলম্বনে

আরও