আল জাজিরা এক্সপ্লেইনার

হিলিয়াম সংকটের শঙ্কা: যুদ্ধের প্রভাবে ব্যাহত এমআরআই পরীক্ষা ও প্রযুক্তি খাত

র্তমানে বিশ্বে মোট উৎপাদিত হিলিয়ামের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই আসে কাতার থেকে। ২০২৫ সালে দেশটি প্রায় ৬৩ মিলিয়ন ঘনমিটার হিলিয়াম উৎপাদন করেছে, যেখানে বৈশ্বিক উৎপাদন ছিল প্রায় ১৯০ মিলিয়ন ঘনমিটার।উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রায় সব হিলিয়াম রফতানি করে কাতার। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এ পথ প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। ফলে বন্ধ রয়েছে রফতানিও।

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধ ও তার প্রতিক্রিয়ায় মধ্যপ্রাচ্যে সৃষ্ট অস্থিরতা বিশ্বব্যাপী হিলিয়াম সরবরাহে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে। এর প্রভাব ছড়িয়েছে চিকিৎসা খাত থেকে শুরু করে সেমিকন্ডাক্টর শিল্প পর্যন্ত। বিশেষ করে এমআরআই স্ক্যানের মতো জরুরি চিকিৎসাসেবায় এর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বর্তমানে বিশ্বে মোট উৎপাদিত হিলিয়ামের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই আসে কাতার থেকে। ২০২৫ সালে দেশটি প্রায় ৬৩ মিলিয়ন ঘনমিটার হিলিয়াম উৎপাদন করেছে, যেখানে বৈশ্বিক উৎপাদন ছিল প্রায় ১৯০ মিলিয়ন ঘনমিটার।উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রায় সব হিলিয়াম রফতানি করে কাতার। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এ পথ প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। ফলে বন্ধ রয়েছে রফতানিও।

মার্চের শুরুতে ইরানের ওপর ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় হরমুজ প্রণালি ‘বন্ধ’ ঘোষণা করে তেহরান। সেইসঙ্গে সতর্ক করা হয়, অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ এ প্রণালিতে প্রবেশ করলে তা ধ্বংস করা হবে। যদিও পরে ইরান জানায়, নির্দিষ্ট কিছু দেশের জাহাজ ছাড়া অন্যদের চলাচল সম্ভব, তবে তেহরানের অনুমতি বাধ্যতামূলক।

এমন পরিস্থিতিতে কাতারের রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি প্রতিষ্ঠান কাতারএনার্জি জানিয়েছে, তাদের তরল হিলিয়াম রফতানি বছরে প্রায় ১৪ শতাংশ কমে যাবে। মূলত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদনের সময় উপজাত হিসেবে হিলিয়াম পাওয়া যায়। কিন্তু যুদ্ধের কারণে কাতারের রাস লাফান ও মেসাইয়িদ অঞ্চলের জ্বালানি স্থাপনায় হামলার পর এলএনজি উৎপাদন কমে গেছে। এতে দেশটির প্রায় ১৭ শতাংশ রফতানি সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

হিলিয়াম পরিবহনের ক্ষেত্রেও রয়েছে জটিলতা। এটি খুব হালকা গ্যাস হওয়ায় তরল করে বিশেষ শীতল পাত্রে সংরক্ষণ করে পাঠাতে হয়। তবে তরলীকরণের পর ৪৫ দিনের মধ্যে সরবরাহ করতে না পারলে তা আবার গ্যাসে পরিণত হয়ে নষ্ট হয়ে যায়। ফলে পরিবহন বিলম্ব মানেই সরাসরি ক্ষতি।

কাতার থেকে হিলিয়ামের সবচেয়ে বড় ক্রেতা দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, তাইওয়ান ও চীন। যদিও বেশিরভাগ সরবরাহ দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে হয়, তবুও সরবরাহ কমে গেলে বাজারে চাপ তৈরি হবে। বিশ্লেষকদের মতে, ৩০ দিনের সরবরাহ বিঘ্নিত হলে দাম ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে, আর ৬০ থেকে ৯০ দিন স্থায়ী হলে তা ২৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

হিলিয়াম অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রায় তরল থাকে এবং রাসায়নিকভাবে নিষ্ক্রিয়। ফলে এটি ঠাণ্ডা রাখতে সুপারকন্ডাক্টিং ম্যাগনেট ব্যবহৃত হয়, যা এমআরআই মেশিনের মূল উপাদান। বিশ্বে ব্যবহৃত হিলিয়ামের প্রায় এক-চতুর্থাংশই এমআরআইসহ এ ধরনের প্রযুক্তিতে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া সেমিকন্ডাক্টর চিপ উৎপাদনেও হিলিয়াম অপরিহার্য। এটি স্মার্টফোন, গাড়ি, ডেটা সেন্টার থেকে সামরিক প্রযুক্তিসহ প্রায় সব আধুনিক যন্ত্রের ভিত্তি।

বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বড় হিলিয়াম উৎপাদক, যার উৎপাদন প্রায় ৮১ মিলিয়ন ঘনমিটার। তবুও উত্তর আমেরিকার বাজার আংশিকভাবে উপসাগরীয় সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এয়ারগ্যাস তাদের সরবরাহ অর্ধেকে নামিয়ে আনার ঘোষণা দিয়েছে।

বিশ্বের অধিকাংশ যন্ত্রই তরল হিলিয়ামের ওপর নির্ভরশীল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হিলিয়ামের কোনো কৃত্রিম বিকল্প নেই। ফলে সরবরাহ সংকট প্রযুক্তি উন্নয়ন ও চিকিৎসা সেবায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।

আরও