ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ব্যক্তিগত ও কূটনৈতিক সম্পর্ক সম্ভবত ‘মেরামতের অযোগ্য’ পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে সতর্ক করেছেন শীর্ষস্থানীয় কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে স্টারমারের ‘টিম’ বা বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ করার বিষয় নিয়ে ট্রাম্প জনসমক্ষে ব্যঙ্গ করার পর এমন আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন তারা। খবর দ্য গার্ডিয়ান।
সম্প্রতি হোয়াইট হাউস আয়োজিত ইস্টার লাঞ্চের বক্তৃতায় দুর্বল কণ্ঠে স্টারমারকে অনুকরণ করে উপহাস করেন ট্রাম্প। একই সঙ্গে যুক্তরাজ্য বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ‘সেরা মিত্র’ নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। ট্রাম্পের ক্ষোভের অন্যতম কারণ, ইরানে হামলার প্রাথমিক পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রকে ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দেয়নি যুক্তরাজ্য। এছাড়া যুদ্ধ চলাকালে বিমানবাহী রণতরী পাঠানোর বিষয়েও অনীহা দেখিয়েছে।
বক্তৃতায় ট্রাম্প জানান, যুক্তরাজ্যের কাছে তিনি যুদ্ধ চলাকালে বিমানবাহী রণতরী পাঠানোর অনুরোধ করেছিলেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, স্টারমার জবাবে বলেন—আমাকে আমার টিমের সঙ্গে কথা বলতে হবে। এ নিয়ে ট্রাম্প উপহাস করে বলেন, আমি তাকে বললাম—আপনি প্রধানমন্ত্রী, আপনার কাউকে জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু তিনি বললেন, না, না, আমাদের আগামী সপ্তাহে মিটিং আছে। অথচ ততক্ষণে যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে।
তবে ট্রাম্পের বক্তব্যকে অসংলগ্ন উল্লেখ করে ডাউনিং স্ট্রিট সূত্র জানিয়েছে, ট্রাম্প কখনোই এ ধরনের কোনো রণতরী চাননি বা ব্রিটেনও তা প্রস্তাব করেনি। দুই সপ্তাহ আগে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, স্টারমার খনি পরিস্কারকারী জাহাজ বা মাইনসুইপার পাঠানোর বিষয়ে টিমের সঙ্গে পরামর্শ করতে চেয়েছিলেন।
এ বিষয়ে সাবেক কূটনীতিকরা বলছেন, স্টারমারের সরাসরি যুদ্ধে না জড়ানোর সিদ্ধান্ত সঠিক পদক্ষেপ ছিল। তবে এর ফলে তার সঙ্গে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একজন জ্যেষ্ঠ কূটনীতিকের মতে, স্টারমারের উচিত ট্রাম্পকে কার্যত উপেক্ষা করে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা। কারণ বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক দ্রুত স্বাভাবিক হওয়া কঠিন। ট্রাম্পের ‘অপ্রত্যাশিত ও খামখেয়ালি’ আচরণের মুখে ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক গড়ার চেষ্টা বৃথা হতে পারে বলে অভিমত তাদের।
অন্যদিকে, সাবেক ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত কিম ড্যারোচ মনে করেন, স্টারমারের সঙ্গে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত সম্পর্ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর প্রভাবে ট্রাম্প ন্যাটো বা ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপের মতো পদক্ষেপ নিতে পারেন। এ পরিস্থিতিতে ব্রিটিশ সরকারের উচিত হবে ইউরোপীয় একক বাজারের সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনকে অগ্রাধিকার দেয়া।
লেবার পার্টির নেতারা স্টারমারের অবস্থানকে সমর্থন জানিয়েছেন। দলটির এমপি ও পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটির চেয়ার এমিলি থর্নবেরি স্টারমারের পক্ষ নিয়ে বলেন, আমি খুশি যে আমাদের এমন একজন নেতা আছেন যিনি বিশেষজ্ঞদের কথা শোনেন। কারো পরামর্শ না নিয়ে সিদ্ধান্ত নিলে পারস্য উপসাগরে ইরানীদের মতো কৌশলের কাছে পরাজিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
অন্যদিকে, ট্রাম্পের এমন আচরণের কারণে যুক্তরাজ্যের কনজারভেটিভ ও রিফর্ম ইউকে-র মতো দলগুলো অস্বস্তিতে পড়েছে। রিফর্ম ইউকে’র রবার্ট জেনরিক বলেন, প্রধানমন্ত্রী যে দলেরই হন, বিশ্বমঞ্চে তিনি সম্মানের দাবিদার। একজন বিদেশী নেতার ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীকে এভাবে তিরস্কার করা মেনে নেয়া যায় না।
তবে এসব চাপের মুখেও নতি স্বীকার না করার ঘোষণা দিয়েছেন কিয়ার স্টারমার। পার্লামেন্টের লিয়াজোঁ কমিটিতে তিনি বলেন, বাইরে থেকে কত চাপ আসছে, তাতে আমার কিছু যায় আসে না। জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় যা প্রয়োজন, তাই করব। আমি বুঝতে পারছি আমাকে চাপে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে, কিন্তু আমি আমার অবস্থান থেকে এক চুলও নড়ব না।
তবে ইস্টার লাঞ্চের সে অনুষ্ঠানে ট্রাম্প কেবল স্টারমারকেই নয়, ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁকেও আক্রমণ করেন। তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেন ট্রাম্প। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ট্রাম্পের এ আক্রমণাত্মক কূটনীতি আটলান্টিক মহাসাগরের দুই তীরের দীর্ঘদিনের মৈত্রীকে এক নজিরবিহীন অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে।