টুইন টাওয়ার হামলার আগে প্রেসিডেন্টকে দেয়া গোয়েন্দা সতর্কবার্তা প্রকাশ্যে আনল সিআইএ

সিআইএ গতকাল শতাধিক বেশি পৃষ্ঠার প্রেসিডেন্টস ডেইলি ব্রিফিংয়ের নথি গোপনীয়তামুক্ত করে প্রকাশ করেছে। ৯/১১ হামলার আগে আল-কায়েদা ও বিন লাদেনের হুমকি নিয়ে প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ও জর্জ ডব্লিউ বুশকে দেয়া এসব নথি প্রথমবারের মতো জনসমক্ষে আনা হলো। এর মধ্য দিয়ে হামলার আগে দুই প্রেসিডেন্ট কী ধরনের তথ্য দেখেছিলেন, কিন্তু তা যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারেননি—তার একটি উদ্বেগজনক চিত্র পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে

তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের কাছে ৯/১১ হামলার আগে দেয়া একটি গোয়েন্দা সতর্কবার্তায় বলা হয়েছিল, আল-কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেন-সংশ্লিষ্ট একটি গোষ্ঠী ‘বিস্ফোরকভর্তি একটি উড়োজাহাজ নিয়ে মার্কিন কোনো শহরে হামলা চালাতে পারে’। ১৯৯৮ সালের ১০ সেপ্টেম্বর দেয়া প্রেসিডেন্টের গোয়েন্দা ব্রিফিংয়ের একেবারে নিচের দিকে সতর্কবার্তাটি রাখা হয়েছিল।

সিএনএনের প্রতিবেদন অনুসারে, শেষ পর্যন্ত কোনো বিস্ফোরক ব্যবহার করা হয়নি। তবে চারটি উড়োজাহাজ ছিনতাই করা হয়েছিল। এর মধ্যে দুটি নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে আঘাত হানে ও একটি ওয়াশিংটন ডিসির পেন্টাগনে বিধ্বস্ত হয়। আরেকটি ক্যাপিটল ভবনে আঘাত হানার উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়া হলেও যাত্রীরা সশস্ত্র ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলায় সেটি পেনসিলভানিয়ার একটি মাঠে বিধ্বস্ত হয়।

সিআইএ গতকাল শতাধিক বেশি পৃষ্ঠার প্রেসিডেন্টস ডেইলি ব্রিফিংয়ের নথি গোপনীয়তামুক্ত করে প্রকাশ করেছে। ৯/১১ হামলার আগে আল-কায়েদা ও বিন লাদেনের হুমকি নিয়ে প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ও জর্জ ডব্লিউ বুশকে দেয়া এসব নথি প্রথমবারের মতো জনসমক্ষে আনা হলো। এর মধ্য দিয়ে হামলার আগে দুই প্রেসিডেন্ট কী ধরনের তথ্য দেখেছিলেন, কিন্তু তা যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারেননি—তার একটি উদ্বেগজনক চিত্র পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে।

নথিতে দেখা যায়, বছরের পর বছর ধরে সতর্কবার্তা দেয়া হয়েছিল। বলা হয়েছিল, ওসামা বিন লাদেন যুক্তরাষ্ট্রে অথবা বিদেশে মার্কিন স্থাপনায় হামলার কথা ভাবছেন। কোথাও গোয়েন্দা তথ্যের খণ্ডাংশে বলা হয়েছে, তিনি ওয়াশিংটনের একটি শপিং মলে হামলা, পারমাণবিক বোমা তৈরির উপকরণ সংগ্রহ, রাসায়নিক অস্ত্র হামলা কিংবা এক মার্কিন নাগরিককে অপহরণের পরিকল্পনা করছিলেন। ওই নাগরিকের নাম নথিতে মুছে দেয়া হয়েছে।

তবে নথিগুলো ৯/১১ হামলার আগে মার্কিন সরকার কী জানত বা কেন হামলা ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছিল—এ বিষয়ে গোয়েন্দা ইতিহাসবিদদের ধারণায় মৌলিক কোনো পরিবর্তন আনেনি। ৯/১১ হামলা তদন্তে ২০০৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে গঠিত জাতীয় কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, গোয়েন্দা সংস্থাগুলো পরপর দুই প্রেসিডেন্টের প্রশাসনকেই আল-কায়েদার হুমকি সম্পর্কে সতর্ক করেছিল। কিন্তু সেই হুমকির ব্যাপকতা ও জরুরি পরিস্থিতি যথাযথভাবে অনুমান বা জানাতে তারা ব্যর্থ হয়। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতির কারণে বিশ্লেষকরাও তথ্যগুলো একত্র করে অর্থবহ চিত্র তৈরি করতে পারেননি।

ওই সময় সিআইএ-ও গভীর অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল বলে গবেষকরা জানান। সংস্থাটির প্রধান মনোযোগের বিষয় ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন। ফলে নতুন পরিস্থিতিতে কীভাবে নিজেদের কাজ পুনর্বিন্যাস করবে বা কোন বিষয়ে গুরুত্ব দেবে, তা স্পষ্ট ছিল না। ওই সময় ওসামা বিন লাদেনকে অনুসরণকারী সিআইএর ‘অ্যালেক স্টেশন’ নামের ইউনিটও ছিল ছোট।

অস্টিনের টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের গোয়েন্দা সংস্থাবিষয়ক ইতিহাসবিদ জেফরি রোগ বলেন, ‘সংস্থার একটি অংশ কোনো হুমকি নিয়ে যতই সতর্কবার্তা দিক না কেন, এটি তবু একটি বড় সংস্থা।’

তবু সিআইএর এ নথি প্রকাশ ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রেসিডেন্টের দৈনিক গোয়েন্দা ব্রিফিংয়ের নথিগুলো সংস্থাটির সবচেয়ে সংবেদনশীল গোপন নথিগুলোর মধ্যে পড়ে।

সিআইএর ২০০১ সালের ৬ আগস্টের চূড়ান্ত সতর্কবার্তার শিরোনাম ছিল, ‘যুক্তরাষ্ট্রে হামলা চালাতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বিন লাদেন’। এতে বলা হয়, আল-কায়েদার সদস্যরা ‘বছরের পর বছর’ যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেছে বা সেখানে ভ্রমণ করেছে এবং সংগঠনটি ‘এমন একটি সহায়তা কাঠামো বজায় রাখছে বলে মনে হচ্ছে, যা হামলায় সহায়তা করতে পারে’।

ওই সময় এফবিআইয়ের তথ্যেও যুক্তরাষ্ট্রে এমন কিছু সন্দেহজনক কর্মকাণ্ডের ধরন শনাক্ত হয়েছিল, যা উড়োজাহাজ ছিনতাই বা অন্য ধরনের হামলার প্রস্তুতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। এর মধ্যে নিউইয়র্কে সরকারি ভবনগুলোয় সাম্প্রতিক নজরদারির তথ্যও ছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়, তখন যুক্তরাষ্ট্রে বিন লাদেন-সংশ্লিষ্ট ৭০টি পূর্ণাঙ্গ মাঠপর্যায়ের তদন্ত চলছিল।

তবে প্রতিবেদনে স্বীকার করা হয়েছিল, ‘আরো চাঞ্চল্যকর হুমকি সংক্রান্ত কিছু তথ্য আমরা নিশ্চিত করতে পারিনি।’ এর মধ্যে ১৯৯৮ সালের এমন একটি তথ্যও ছিল, যেখানে বলা হয়েছিল বিন লাদেন একটি মার্কিন উড়োজাহাজ ছিনতাই করতে চেয়েছিলেন।

প্রকাশিত নথির সর্বশেষটির তারিখ ২০০১ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ভোর ৪টা। এতে কান্দাহারভিত্তিক এক আরব ব্যক্তির বক্তব্য উদ্ধৃত করা হয়েছে। তিনি বলেছিলেন, হামলার পরিকল্পনা করা হয়েছিল দুই বছর ধরে। তার ভাষায়, এটি ছিল ‘ক্রোধের সূচনা’।

আরও