অস্ট্রেলিয়ার জীবিতদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পদকপ্রাপ্ত সৈনিক হিসেবে পরিচিত বেন রবার্টস-স্মিথ। আফগানিস্তানে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আজ সিডনি বিমানবন্দরে গ্রেফতার হয়েছেন তিনি। অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেল পুলিশ ও অফিস অব দ্য স্পেশাল ইনভেস্টিগেটর জানিয়েছে, রবার্টস-স্মিথের বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধাপরাধ-হত্যা’ সংক্রান্ত পাঁচটি অভিযোগ আনা হবে। এ অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি আজীবন কারাদণ্ড। খবর দ্য গার্ডিয়ান।
রবার্টস-স্মিথকে আজ বিকালে আদালতে তোলার কথা রয়েছে। ভিক্টোরিয়া ক্রসপ্রাপ্ত এ সৈনিকের বিরুদ্ধে মানহানির মামলায় অভিযোগ উঠেছিল, আফগানিস্তানে অস্ট্রেলিয়ান এসএএসে কর্মরত অবস্থায় নিরস্ত্র বেসামরিক মানুষ হত্যা করেছেন তিনি।
একসময় আফগানিস্তান যুদ্ধের সবচেয়ে সম্মানিত ‘অস্ট্রেলিয়ান ভেটেরান’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন রবার্টস-স্মিথ। কয়েকটি প্রতিবেদনের জেরে সাম্প্রতিক বছরে তিনটি পত্রিকার বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন তিনি। ওই সব প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, তিনি যুদ্ধাপরাধ করেছেন, নিরস্ত্র বেসামরিক মানুষ হত্যা করেছেন এবং সহযোদ্ধাদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছেন।
দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল ওই মানহানি মামলায় হেরে যান রবার্টস-স্মিথ। ‘বালান্স অব প্রোবাবিলিটি’ মানদণ্ড অনুসারে বিচারকের রায়ে বলা হয়, অস্ট্রেলিয়ান সামরিক বাহিনীতে কর্মরত অবস্থায় চারটি হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিলেন রবার্টস-স্মিথ। ওই মানদণ্ড অনুসারে, অভিযোগগুলো সত্য হওয়ার সম্ভাবনা ৫০ শতাংশের বেশি।
তিনি ফেডারেল কোর্টের পূর্ণ বেঞ্চে আপিল করলেও হেরে যান। পরবর্তীতে উচ্চ আদালত তার আপিল নিতে অস্বীকার করে। তিনি বারবার সব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।
সাবেক এসএএস কর্পোরাল রবার্টস-স্মিথ ২০১০ সালে তিজাক যুদ্ধে ‘অতি অসাধারণ বীরত্বের’ স্বীকৃতিস্বরূপ ভিক্টোরিয়া ক্রস পান। ‘ফাদার অব দ্য ইয়ার’ নির্বাচিত হন তিনি এবং সরকারের অস্ট্রেলিয়া ডে কাউন্সিলের চেয়ার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
২০১৮ সালে দ্য এজ, দ্য সিডনি মর্নিং হেরাল্ড ও দ্য ক্যানবেরা টাইমস একাধিক প্রতিবেদনে অভিযোগ কর, বেসামরিক মানুষ হত্যা করেছেন রবার্টস-স্মিথ। অধীনস্থ সৈনিকদের দিয়ে তথাকথিত ‘ব্লাডিং’ প্রক্রিয়ায় বন্দিদের হত্যা করিয়েছেন।
রবার্টস-স্মিথ আদালতে দাবি করেন, এসব প্রতিবেদন তাকে এমন এক অপরাধী হিসেবে তুলে ধরেছে, যিনি সামরিক নিয়ম ও নৈতিকতা লঙ্ঘন এবং দেশের সুনাম নষ্ট করেছেন।
পত্রিকাগুলো প্রতিবেদনের সত্যতা প্রমাণে লড়াই করে এবং আদালতে প্রমাণিত হয়, হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিলেন সাবেক এ সেনা সদস্য।
রবার্টস-স্মিথের বিরুদ্ধে সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি ছিল ২০১২ সালে আফগানিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলীয় দারওয়ান গ্রামে একটি অভিযানের ঘটনা।
আদালতের মতে, রবার্টস-স্মিথ হাতকড়া পরানো অবস্থায় আলি জান নামের এক ব্যক্তিকে প্রায় ১০ মিটার উঁচু খাদের কিনারায় নিয়ে যান এবং বুকে লাথি মেরে নিচে ফেলে দেন। আলি জান পড়ে গিয়ে গুরুতর আহত হলেও বেঁচে যান এবং উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিলেন। এ সময় অস্ট্রেলিয়ান সৈন্যরা নিচে নেমে তার কাছে পৌঁছে যান।
আদালত জানান, রবার্টস-স্মিথ অধীনস্থ এক সৈনিককে আলি জানকে গুলি করে হত্যা করার নির্দেশ দেন এবং সেই নির্দেশ কার্যকর করা হয়। পরে তার মরদেহ পাশের একটি মাঠে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়।
আরেকটি বড় অভিযোগ ছিল ২০০৯ সালে ‘হুইস্কি ১০৮’কোডনেমের একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত স্থাপনায় অভিযানের ঘটনা। সেখানে একটি সুড়ঙ্গে লুকিয়ে থাকা দুজনকে পাওয়া যায়। একজন বৃদ্ধ ও আরেকজন কৃত্রিম পা ব্যবহারকারী তরুণ। তারা নিরস্ত্র অবস্থায় আত্মসমর্পণ করেন। বিচারক অ্যান্থনি বেসাঙ্কো রায় দেন, টহল দলের এক জুনিয়র সৈনিককে ওই বৃদ্ধকে হত্যা করার নির্দেশ দেন রবার্টস-স্মিথ। এরপর তিনি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে জোর করে বাইরে নিয়ে গিয়ে মাটিতে ফেলে দেন এবং গুলি চালিয়ে হত্যা করেন।
পরে ওই ব্যক্তির কৃত্রিম পা একজন সৈনিক ‘স্মারক’ হিসেবে নিয়ে যায় এবং সেটি ঘাঁটির পানশালায় উদযাপনের পাত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
এর আগে ২০২৩ সালের শুরুতে অস্ট্রেলিয়ার সাবেক এসএএস সৈনিক অলিভভার সলজের বিরুদ্ধেও এক আফগান ব্যক্তিকে হত্যার অভিযোগে যুদ্ধাপরাধের মামলা করা হয়।