দক্ষিণ লেবাননে এক ইসরায়েলি সৈন্য হাতুড়ি দিয়ে যিশুর মূর্তিতে আঘাত করছে— এমন একটি ছবি অনলাইনে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার পর তীব্র নিন্দা শুরু হয়েছে। খবর বিবিসি।
ডেবেল নামের লেবাননি গ্রামে একটি বাড়ির বাইরে ক্রুশের ওপর মূর্তিটি ছিল। ইসরায়েলি আক্রমণে মধ্যেও এখানকার যে অল্প কয়েকটি গ্রামে বাসিন্দারা থেকে গেছেন, ডেবেল তার একটি। স্থানীয় গির্জার প্রধান ফাদার ফাদি ফ্লাইফেল বলেন, ‘আমাদের কাছে পবিত্র প্রতীক ক্রুশ। সব ধর্মীয় প্রতীকের অবমাননা সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করছি। এটি মানবাধিকার ঘোষণার পরিপন্থী এবং সভ্যতার প্রতিফলন নয়।’
এর আগেও লেবাননে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি শুক্রবার কার্যকর হওয়ার পরও হাজার হাজার ইসরায়েলি সেনা দক্ষিণ লেবাননের বিস্তীর্ণ এলাকায় অবস্থান করছে। সেখান থেকে প্রায়ই হামলার খবর পাওয়া যাচ্ছে।
যিশু মূর্তিতে হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপ্টিস্ট ধর্মযাজক ও ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি এক্সে লিখেছেন, ‘দ্রুত, কঠোর ও প্রকাশ্য শাস্তি প্রয়োজন।’
ডানপন্থী মার্কিন ভাষ্যকাররাও ছবিটির তীব্র নিন্দা করেন। সাবেক কংগ্রেসম্যান ম্যাট গেটজ ছবিটি শেয়ার করে লেখেন, ‘ভয়াবহ।’ সাবেক কংগ্রেসওম্যান মার্জোরি টেইলর গ্রিনও লেখেন, ‘আমাদের সবচেয়ে বড় মিত্র। যারা প্রতি বছর আমাদের কর থেকে বিলিয়ন ডলার ও অস্ত্র নেয়।’
জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হিসেবে বিবেচিত হলেও ইসরায়েলের প্রতি মার্কিন জনসমর্থন সাম্প্রতিক সময়ে কমেছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাংক পিউ রিসার্চ সেন্টারের এক জরিপ অনুযায়ী, ৬০ শতাংশ মার্কিন প্রাপ্তবয়স্ক ইসরায়েল সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করেন। গত বছরের যা ছিল ৫৩ শতাংশ।
গত মাসে ইসরায়েলের আরেকটি ঘটনায় আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। তখন ইসরায়েলি পুলিশ জেরুজালেমে রোমান ক্যাথলিক গির্জার শীর্ষ নেতাকে পাম সানডেতে ব্যক্তিগত প্রার্থনার জন্য চার্চ অব দ্য হলি সেপালকারে প্রবেশ করতে বাধা দেয়। ইসরায়েলি পুলিশ তখন ইরান যুদ্ধকালীন নিরাপত্তা উদ্বেগের কথা উল্লেখ করেছিল।
হাকাবি ওই ঘটনাকে ‘দুঃখজনক মাত্রাতিরিক্ততা’ বলে আখ্যা দেন, যা বিশ্বজুড়ে বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। সে সময় ধর্মীয় সমাবেশে সর্বোচ্চ ৫০ জনের অনুমতি থাকলেও গির্জার নেতাদের প্রবেশে বাধা দেয়ার সিদ্ধান্তকে ‘ন্যায্যতা দেয়া কঠিন’ বলে তিনি মন্তব্য করেন।
২০২৫ সালে জেরুজালেমভিত্তিক সংস্থা রজিং সেন্টারের এক প্রতিবেদনে খ্রিস্টধর্মের প্রতি ‘সাম্প্রতিক প্রকাশ্য বৈরিতার বৃদ্ধি’ উল্লেখ করা হয়। এর কারণ হিসেবে ‘বাড়তে থাকা মেরুকরণ ও অতিরাষ্ট্রবাদী রাজনৈতিক প্রবণতা’কে দায়ী করা হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিটি সত্যি বলে স্বীকার করেছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। তারা জানায়, এ ঘটনাকে ‘অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে’ দেখছে এবং সৈন্যটির আচরণ বাহিনীর প্রত্যাশিত মূল্যবোধের সঙ্গে সম্পূর্ণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
এ ঘটনায় ‘স্তম্ভিত ও মর্মাহত’ বলে মন্তব্য করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তিনি বলেন, ‘এ অঞ্চলে একমাত্র ইসরায়েলেই খ্রিস্টানদের সংখ্যা ও জীবনমান বাড়ছে। মধ্যপ্রাচ্যে একমাত্র ইসরায়েলই সবার ধর্মীয় স্বাধীনতা বজায় রাখে।’
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে তেহরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শুরু করার দুদিন পরই ইরানের সমর্থনে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে রকেট হামলা শুরু করে। এর জবাবে ২ মার্চ ইসরায়েল সামরিক হামলা শুরু করে। এতে লেবাননে ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত এবং ২ হাজার ২৯০ জনের বেশি নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ১৭৭ শিশু ও ১০০ জন স্বাস্থ্যকর্মী রয়েছে। একই সময়ে হিজবুল্লাহর হামলায় ১৩ জন ইসরায়েলি সেনা ও দুজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন বলে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।