বন্ধ হয়ে যেতে পারে উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি রফতানি

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দ্রুত বিস্তৃত হওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই সবগুলো আরব উপসাগরীয় দেশের জ্বালানি তেল ও গ্যাস রফতানি কার্যত বন্ধ হয়ে যেতে পারে—এমন আশঙ্কা ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। এরই মধ্যে ইরানের ড্রোন হামলায় কাতারের বৃহত্তম তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) স্থাপনা রাস লাফানে আঘাত হানার পর দেশটি জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণা করেছে, যার ফলে সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় ধরনের বিঘ্ন দেখা দিয়েছে। হামলার কারণে সৌদি আরামকো তাদের রাস তানুরা রিফাইনারির কার্যক্রম বন্ধ করেছে। এ পরিস্থিতিতে যুদ্ধ আরো দীর্ঘায়িত হলে উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্য জ্বালানি রফতানিকারক দেশগুলোও একই ধরনের সংকটে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন জ্বালানি বাজার বিশ্লেষকরা। এছাড়া হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকলে আগামী দুই-তিন সপ্তাহের মধ্যে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছতে পারে।

গতকাল ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেয়া সাক্ষাৎকারে কাতারের জ্বালানিমন্ত্রী সাদ আল-কাবি বলেন, পরিস্থিতি এভাবে চলতে থাকলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের ধাক্কা লাগবে এবং বিশ্ব অর্থনীতিও গভীর সংকটে পড়তে পারে।

আল-কাবি বলেন, ‘যুদ্ধ কয়েক সপ্তাহ ধরে চলতে থাকলে উপসাগরীয় অঞ্চলের সব জ্বালানি রফতানিকারক দেশ বাধ্য হয়ে “‍ফোর্স মাজর” ঘোষণা করতে পারে। অর্থাৎ নিরাপত্তা ও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে তারা তাদের জ্বালানি সরবরাহের চুক্তি সাময়িকভাবে স্থগিত করবে।’ তার ভাষায়, ‘আরো কয়েক দিন পরিস্থিতি এমন থাকলে উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রায় সব রফতানিকারক দেশকেই ফোর্স মাজর ঘোষণা করতে হবে।’

বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম এলএনজি উৎপাদক কাতার এরই মধ্যে এমন পরিস্থিতির মুখে পড়েছে। ইরানের ড্রোন হামলায় দেশটির বৃহত্তম এলএনজি স্থাপনা রাস লাফান গ্যাস প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রে আঘাত হানার পর কাতার এ সপ্তাহেই ফোর্স মাজর ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে। ফলে কাতারের গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে।

আল-কাবি জানান, যুদ্ধ যদি এখনই থেমেও যায়, তবু স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যবস্থায় ফিরতে কাতারের কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। কারণ হামলার পর অবকাঠামোগত ক্ষতির পরিমাণ এখনো পুরোপুরি নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি এবং স্থাপনাগুলো মেরামত করতেও সময় লাগবে।

তিনি আরো সতর্ক করে বলেন, ‘এ সংঘাত কেবল জ্বালানি বাজারেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং এর প্রভাব বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর ব্যাপকভাবে পড়বে। জ্বালানির দাম বাড়বে, অনেক পণ্যের ঘাটতি দেখা দেবে এবং শিল্প উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।’ তার মতে, যুদ্ধ চলতে থাকলে বিশ্বের অর্থনীতিগুলো বড় ধরনের ধাক্কা খাবে। জ্বালানির দাম বাড়বে, সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেবে, ফলে উৎপাদন ব্যবস্থায় চেইন রিঅ্যাকশন তৈরি হবে।

এদিকে সংঘাতের প্রভাবে এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়তে শুরু করেছে। শুক্রবার ইউরোপীয় বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৮৭ দশমিক ৬ ডলারে পৌঁছেছে, যা সংঘাত শুরুর পর সর্বোচ্চ। আল-কাবির পূর্বাভাস অনুযায়ী, যদি হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যায়, তবে আগামী দুই-তিন সপ্তাহের মধ্যে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছতে পারে।

হরমুজ প্রণালি বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ। বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এ পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর থেকে এ জলপথে জাহাজ চলাচল প্রায় থমকে গেছে। অন্তত ১০টি বাণিজ্যিক জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে, বীমা প্রিমিয়াম বেড়ে গেছে এবং অনেক জাহাজ মালিক তাদের জাহাজ এ পথ দিয়ে পাঠাতে অনিচ্ছুক হয়ে পড়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল সচল রাখতে মার্কিন নৌবাহিনীর নিরাপত্তা সহায়তা দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন এবং শিপিং কোম্পানিগুলোকে অতিরিক্ত বীমা সুবিধা দেয়ার প্রস্তাবও দিয়েছেন। তবে আল-কাবি মনে করেন, যুদ্ধ চলাকালীন এ পথ দিয়ে জাহাজ চলাচল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

তার ভাষায়, হরমুজ প্রণালির সবচেয়ে সরু অংশ মাত্র ২৪ মাইল প্রশস্ত এবং এটি ইরানের উপকূল ঘেঁষে গেছে। ফলে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এখানে জাহাজ পাঠানো অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। তিনি বলেন, ‘এ অবস্থায় জাহাজগুলোকে ওই প্রণালি দিয়ে পাঠানো খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। অনেক জাহাজ মালিকই মনে করছেন এতে তারা আরো বড় লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারেন।’

জ্বালানি ছাড়াও উপসাগরীয় অঞ্চলের সঙ্গে বৈশ্বিক বাণিজ্যেও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন তিনি। কারণ এ অঞ্চল বিশ্বজুড়ে ব্যবহৃত বিপুল পরিমাণ পেট্রোকেমিক্যাল ও সার উৎপাদনের কাঁচামাল সরবরাহ করে। যদি এ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়, তবে তার প্রভাব কৃষি, শিল্প ও বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপরও পড়বে।

কাতার বর্তমানে তাদের বিশাল নর্থ ফিল্ড গ্যাস ক্ষেত্রের উৎপাদনক্ষমতা বাড়ানোর জন্য প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলারের একটি বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৭ সালের মধ্যে বার্ষিক উৎপাদন ৭৭ মিলিয়ন টন থেকে বাড়িয়ে ১২৬ মিলিয়ন টনে উন্নীত করার কথা ছিল। কিন্তু চলমান সংঘাতের কারণে এ প্রকল্পও বিলম্বিত হতে পারে বলে জানিয়েছেন আল-কাবি।

তিনি বলেন, ‘সংঘাত দ্রুত শেষ হলে প্রকল্পের ওপর প্রভাব সীমিত থাকতে পারে। কিন্তু যদি যুদ্ধ এক বা দুই মাস ধরে চলে, তবে উৎপাদন সম্প্রসারণ পরিকল্পনায় বড় ধরনের বিলম্ব দেখা দিতে পারে।’

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ক্রমেই বিস্তৃত হওয়ায় উপসাগরীয় দেশগুলোতে উদ্বেগ বাড়ছে। ইরান এরই মধ্যে কাতারসহ কয়েকটি উপসাগরীয় দেশে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এর লক্ষ্য ছিল জ্বালানি অবকাঠামো, বিমানবন্দর, মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং কূটনৈতিক স্থাপনাগুলো। ফলে জ্বালানিসমৃদ্ধ এ অঞ্চলে যুদ্ধের ঝুঁকি আরো বাড়ছে এবং তার প্রভাব এরই মধ্যে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

আরও