জাতিসংঘের ৮০তম সাধারণ অধিবেশনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেয়া বক্তব্য বিশ্বজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। তার ভাষণের পর অনেক বিশ্বনেতা স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, বৈশ্বিক নেতৃত্ব দেয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে আর নির্ভরযোগ্য শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।
ট্রাম্প তার ৫৮ মিনিটের দীর্ঘ ভাষণে খোলা সীমান্ত, শরিয়া আইন, জাতিসংঘের ব্যর্থতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনকে ‘প্রতারণা’ বলে অভিহিত করেন। তার এই বক্তব্যের পর জাতিসংঘের প্রতিনিধিরা হতভম্ব হয়ে পড়েন। অনেক প্রতিনিধি মনে করেন, বিশ্বের এই ক্ষমতাধর দেশটি তাদের প্রতিষ্ঠিত মূল্যবোধ ধ্বংস করতে উঠেপড়ে লেগেছে।
ট্রাম্পের বক্তৃতার পরপরই বক্তব্য দেন ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো এবং তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। সুবিয়ান্তো জোর দিয়ে বলেন, ‘শক্তি দিয়ে ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হয় না; ন্যায় দিয়েই ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। কোনো একটি দেশ পুরো মানবজাতিকে জবরদস্তি করতে পারে না। আমরা ব্যক্তিগতভাবে দুর্বল হলেও, নিপীড়ন ও অবিচারের অনুভূতি আমাদের একটি শক্তিশালী বাহিনীতে পরিণত করবে, যা এই অবিচারকে পরাজিত করবে।‘
এরদোয়ান ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে বলে অভিহিত করেন এবং তার বর্বরতার সামনে নীরব থাকা দেশগুলোকে এর সহযোগী বলে মন্তব্য করেন।
ট্রাম্পের ভাষণের ঠিক আগে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা যুক্তরাষ্ট্রের নাম উল্লেখ না করেই নতুন স্বৈরাচারী শক্তির হুমকি সম্পর্কে সতর্ক করেন। তিনি বলেন, ‘জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে এর আদর্শগুলো আজ হুমকির মুখে। বহুপক্ষীয়তার ধারণা আজ নতুন এক সংকটে। এই সংস্থার কর্তৃত্ব চ্যালেঞ্জের মুখে। আমরা এমন একটি আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা দেখছি, যেখানে ক্ষমতার অপব্যবহার, সার্বভৌমত্বের ওপর আক্রমণ, স্বেচ্ছাচারী নিষেধাজ্ঞা এবং একতরফা হস্তক্ষেপই নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে।‘
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ং জলবায়ু সংকটকে ‘প্রতারণা’ বলে ট্রাম্পের ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করে বলেন, এটি মানবজাতির জন্য একটি বড় হুমকি।
ট্রাম্পের এই ভাষণ বিশ্বকে এক অনিবার্য প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে— নির্ভরযোগ্য মার্কিন নেতৃত্ব ছাড়া বিশ্ব কীভাবে চলবে? এই প্রশ্ন শুধু উন্নয়নশীল বিশ্বের জন্য নয়, বরং ইউরোপকেও এর মুখোমুখি হতে হচ্ছে। কারণ তারা এখন রাশিয়াকে মোকাবেলা করছে।
ট্রাম্পের বিকল্প হিসেবে একটি জোট গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে, যার নেতৃত্ব দিচ্ছেন গণতান্ত্রিক নেতারা। এই জোট জাতিসংঘের বাইরে কাজ করছে। কারণ, জাতিসংঘ ভেটো ক্ষমতা এবং আর্থিক সহায়তার অভাবে মূলত অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস তার ভাষণে সংস্থার প্রাসঙ্গিকতা তুলে ধরলেও স্বীকার করেন যে, শান্তি ও সমৃদ্ধির স্তম্ভগুলো ভেঙে পড়ছে। তিনি বলেন, ‘কার্যকর বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠান ছাড়া বহু-কেন্দ্রিকতা বিশৃঙ্খলার দিকে ঠেলে দেয়, যা ইউরোপ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মাধ্যমে শিখেছিল।‘
এদিকে, স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ট্রাম্পের বিরোধিতা করে দ্রুত ইউরোপের অন্যতম প্রধান নেতায় পরিণত হচ্ছেন। তিনি অভিবাসনের ইতিবাচক দিক তুলে ধরে বলেন, ‘মুক্ত সমাজই ধর্মান্ধতার সবচেয়ে ভালো প্রতিষেধক।‘ তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘ভিন্নমত প্রকাশের স্বাধীনতা হারালে স্বৈরাচারের পথ খুলে যায়।‘
লুলা, সানচেজ ও চিলির প্রেসিডেন্ট গ্যাব্রিয়েল বোরিক গণতন্ত্র রক্ষার জোট গড়ার চেষ্টা করছেন। তবে এসব উদ্যোগ এখনো প্রাথমিক ও দুর্বল। ফলে প্রতিটি দেশ নিজেদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তি অনুযায়ী ট্রাম্পের কূটনৈতিক চাপের মুখে সিদ্ধান্ত নেবে—কেউ প্রতিরোধ করবে, কেউ আবার মেনে নেবে।
সানচেজ, লুলা এবং চিলির গ্যাব্রিয়েল বোরিক গণতন্ত্র রক্ষার জোট গঠনের চেষ্টা করছেন। যার লক্ষ্য হলো বহুপক্ষীয়তা, আইনের শাসন এবং উগ্রবাদের বিরুদ্ধে সহযোগিতা জোরদার করা।
তবে এই বৈশ্বিক জোটগুলো এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে এবং অসংগঠিত। সবচেয়ে বড় বিপদ হলো প্রতিটি দেশ তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে মার্কিন ক্ষমতার সঙ্গে কীভাবে মোকাবেলা করবে বা নত হবে, সেই সিদ্ধান্ত নেবে।