বিশ্বে প্রথমবারের মতো কয়লাকে পেছনে ফেলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রধান উৎসে পরিণত হয়েছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি। তবে এ অগ্রগতি বিশ্বের সর্বত্র সমান নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোয় জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে আসার গতি কিছুটা কমে গেছে। বিপরীতে উন্নয়নশীল দেশগুলোয় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে।
চীনের পরিবর্তন বিশাল আকারে চোখে পড়লেও, অনেক ছোট দেশও এখন বিস্ময়কর গতিতে সৌরবিদ্যুৎ, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও ব্যাটারি প্রযুক্তির দিকে এগোচ্ছে। এর পেছনে শুধু জলবায়ু পরিবর্তনজনিত উদ্বেগ নয়—বরং জ্বালানি আমদানি ব্যয় কমানো, অনিশ্চিত বিদ্যুৎ সরবরাহের বিকল্প খোঁজা ও স্থানীয় অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার মতো বাস্তব কারণও কাজ করছে। পরিসংখ্যান বলছে, বিবিধ কারণে ভুটান, নেপাল মালদ্বীপের মতো এশীয় ছোট নবায়নযোগ্য জ্বালানীতে উল্লেখযোগ্যহারে নির্ভরশীলতা বাড়িয়েছে।
ভুটান: জলবিদ্যুৎ নির্ভরতা থেকে বৈচিত্র্য আনার পথে
হিমালয়ের দেশ ভুটান বহু বছর ধরে জলবিদ্যুৎ রফতানি করে আসছে। কিন্তু তাদের বেশিরভাগ বিদ্যুৎকেন্দ্র নদীর প্রবাহনির্ভর হওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে উৎপাদন অনেক কমে যায়। জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত বিদ্যুৎ ঘাটতি তৈরি হয়, ফলে তখন ভুটানকে ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করতে হয়।
দেশটিতে দ্রুত শিল্পায়নের কারণে জ্বালানির চাহিদা আরো বেড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন ভবিষ্যতে পরিস্থিতিকে আরো কঠিন করে তুলতে পারে। তাই ভুটান সরকার এখন সৌর, বায়ু ও বায়োমাস বিদ্যুতের দিকে ঝুঁকছে। আগামী বছরই ৩০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। এভাবে ভুটান একটি ভারসাম্যপূর্ণ নবায়নযোগ্য জ্বালানি মিশ্রণ গড়ে তুলতে চাইছে।
নেপাল: বৈদ্যুতিক গাড়িতে বিপ্লব
২০১৫ সালে ভারতের অনানুষ্ঠানিক অবরোধে নেপালের জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। তখনই দেশটি বুঝতে পারে আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ।
নেপাল নিজে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করলেও, পেট্রল আমদানি করতে হয়। ২০১৮ সালে নেপাল সরকার আমদানিনির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ নেয়। সে উদ্যোগের আওতায় ২০৩০ সালের মধ্যে নতুন ব্যক্তিগত গাড়ির ৯০ শতাংশ বৈদ্যুতিক করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। বর্তমানে দেশটিতে বৈদ্যুতিক গাড়ির অংশীদারত্ব ৭৬ শতাংশে পৌঁছেছে। সরকারি ছাড় ও প্রণোদনা এ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। খাতকে শক্তিশালী করতে নতুন চার্জিং স্টেশন, রক্ষণাবেক্ষণ সেবা ও স্থানীয় ব্যবসাও তৈরি হচ্ছে।
তবে রাজনৈতিক অস্থিরতা এ পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা রক্ষায় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শ্রীলংকা: জ্বালানি সংকট থেকে উদ্ভাবনের পথে
২০২২-২৩ সালে ভয়াবহ অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সংকটে পড়ে শ্রীলংকা। তীব্র জ্বালানি ঘাটতি, ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎবিচ্ছিন্নতা ও বিদ্যুৎদরের ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধিতে নাজেহাল হয়ে পড়ে রাষ্ট্রটির নাগরিকরা। এ সংকট দেশটিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে আরো দ্রুত ঠেলে দেয়।
বর্তমানে শ্রীলংকার প্রায় অর্ধেক বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আসে, যা মূলত জলবিদ্যুৎ। ২০৩০ সালের মধ্যে এ হার ৭০ শতাংশে নেয়ার লক্ষ্য রয়েছে। দেশটির বিশ্ববিদ্যালয় ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এখন গ্রিডে নবায়নযোগ্য শক্তি সংযোজনের নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করছে। এর মধ্যে রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে ভোল্টেজ ওঠানামা কমানো ও সাপ্লাই স্থিতিশীল করা।
মালদ্বীপ: ডিজেল নির্ভর দ্বীপগুলোয় সৌরশক্তির আলোর ছোঁয়া
প্রায় হাজারখানেক দ্বীপ নিয়ে গঠিত মালদ্বীপে বিদ্যুৎ উৎপাদন দীর্ঘদিন ধরে আমদানিকৃত ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল। এতে ব্যয় বেশি এবং তেলের দামের ওঠানামায় অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়।
২০১৪ সালে দেশটি‘ প্রিপেয়ারিং আউটার আইল্যান্ড ফর সাসটেইন্যাবল এনার্জি ডেভলাপমেন্ট’ নামে প্রকল্প চালু করে—যার লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ শূন্যে নামানো। রাজধানী থেকে দূরের ১৬০টি দ্বীপে ধীরে ধীরে ডিজেল জেনারেটরের পরিবর্তে সৌর প্যানেল, ব্যাটারি স্টোরেজ ও আধুনিক গ্রিড স্থাপন করা হচ্ছে। মালদ্বীপের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি কেবল পরিবেশগত বিকল্প নয়—বরং অর্থনৈতিক টিকে থাকার একমাত্র পথ।
ভুটান, নেপাল, শ্রীলংকা ও মালদ্বীপের এ উদ্যোগ প্রমাণ করে ছোট দেশগুলোও নিজেদের মতো করে পরিচ্ছন্ন, স্থিতিশীল জ্বালানি ব্যবস্থার পথ তৈরি করছে। তাদের প্রেরণা কখনো অর্থনৈতিক সংকট, কখনো রাজনৈতিক অবরোধ, আবার কখনো প্রকৃতির অনিশ্চয়তা। কিন্তু প্রতিটি দেশই একটি টেকসই ভবিষ্যতের আশায় চ্যালেঞ্জকে সুযোগে রূপান্তর করছে।
দ্য করভারসেশন অবলম্বনে