কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ দাঙ্গা, যেভাবে সামাল দিচ্ছে ফ্রান্স

এবারের অস্থিরতার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো পুলিশের অস্ত্রের আঘাতে বিক্ষোভকারীদের গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনা। তিন সপ্তাহের বিক্ষোভে অপ্রাপ্তবয়স্কসহ ছয়জন হাত বা চোখ হারিয়েছেন। গত ৪০ বছরে এমন পরিস্থিতি দেখা যায়নি

কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ দাঙ্গার ঘটনা ঘটেছে ফ্রান্সে। দেশজুড়ে বিক্ষোভের মধ্যে বড় শহরগুলোয় সহিংসতা ও লুটপাট ছড়িয়ে পড়ে। দাঙ্গাকারীরা পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়, গাড়িতে আগুন দেন এবং হামলা থেকে বাদ পড়েনি সরকারি ভবনও। ঐতিহাসিক একটি নগর ভবনও আগুনে পুড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। খবর এপি।

সপ্তাহান্তে দেশজুড়ে প্রায় ২ হাজার ৪০০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হাজার হাজার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ভাংচুর ও লুটপাটের শিকার হয়েছে।

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং স্কুলের দুরবস্থার প্রতিবাদে আয়োজিত বিক্ষোভের মধ্যেই এ সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। এসব বিক্ষোভে কয়েক লাখ মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে অংশ নিয়েছিলেন।

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ ‘চরম বামপন্থী গোষ্ঠীর বিদ্রোহী সদস্যদের’ সঙ্গে যুক্ত অপরাধীদের দায়ী করে ‘বেপরোয়া সহিংসতার’ নিন্দা জানিয়েছেন।

আগামী দিনগুলোয় আরো বিক্ষোভ হতে পারে। আগামী বৃহস্পতিবার ও শনিবার নতুন করে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে উচ্চমাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সংগঠনগুলো। ন্যাশনাল হাই স্কুল স্টুডেন্ট কো-অর্ডিনেশন গ্রুপ তরুণদের রাস্তায় নামার আহ্বান জানিয়েছে। পাশাপাশি অবরোধ ও বিক্ষোভ অব্যাহত রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে তারা।

এছাড়া ২০১৮ সালের ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলন পুনরুজ্জীবিত করতে চাওয়া একদল কর্মী আগামী শনিবার দেশজুড়ে বিক্ষোভের ঘোষণা দিয়েছে। তাদের স্লোগান ‘মাখোঁকে পদত্যাগ করতে হবে’।

পুরনো দাঙ্গার স্মৃতি ফিরিয়ে আনছে সহিংসতা

পুলিশি কার্যক্রম নিয়ে গবেষণা করা সায়েন্সেস পো গ্রেনোবল রাজনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের অধ্যাপক সেবাস্তিয়ান রোশে বলেন, এবারের সহিংসতায় ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ের মতো।

জ্বালানি তেলের ওপর কর বাড়ানোর বিরোধিতা থেকে শুরু হওয়া ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনে মাখোঁ সরকারের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক বিক্ষোভ হয়েছিল। এসব বিক্ষোভের কিছু অংশ সহিংস হয়ে ওঠে। প্যারিসে সংঘর্ষের সময় গাড়িতে আগুন দেয়া হয়, দোকানপাট লুট করা হয় এবং আর্ক দ্য ত্রিয়ঁফ স্মৃতিস্তম্ভ ভাঙচুর করা হয়।

রোশে বলেন, ধ্বংসযজ্ঞ ও ক্ষয়ক্ষতির দিক থেকে এবারের পরিস্থিতি সম্ভবত ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের প্রথম দুই সপ্তাহান্তের ঘটনার কাছাকাছি।

২০২৩ সালের জুনেও প্যারিসের বাইরে পুলিশের গুলিতে ১৭ বছর বয়সী এক কিশোর নিহত হওয়ার পর দেশজুড়ে কয়েক দিন ধরে দাঙ্গা হয়েছিল। সে সময় দোকানপাট লুট ও সরকারি ভবনে আগুন দেয়া হয়। হাজার হাজার মানুষ গ্রেফতার হন এবং শত শত মানুষ আহত হন।

২০০৫ সালেও ফ্রান্সে টানা তিন সপ্তাহ দাঙ্গা হয়েছিল। পরিস্থিতি সামাল দিতে তখন জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছিল সরকার।

তবে গত ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে পুলিশি কার্যক্রম ও সহিংসতা নিয়ে গবেষণা করা রোশের মতে, এবারের অস্থিরতার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো পুলিশের অস্ত্রের আঘাতে বিক্ষোভকারীদের গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনা। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তিন সপ্তাহের বিক্ষোভে অপ্রাপ্তবয়স্কসহ ছয়জন হাত বা চোখ হারিয়েছেন। গত ৪০ বছরে এমন পরিস্থিতি দেখা যায়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সাম্প্রতিক বিক্ষোভে প্রাণঘাতী নয় এমন গ্রেনেড ও দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণের অন্যান্য অস্ত্র ব্যবহারের কারণে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে তীব্র সমালোচনা হচ্ছে। রোশে বলেন, ইউরোপের আর কোনো দেশে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের এত বেশি পঙ্গু করে না।

সহিংসতার জন্য চরম বামপন্থী ও অপরাধীদের দায়ী করছে সরকার

কর্তৃপক্ষ বারবার বলেছে, সহিংসতার পেছনে রয়েছে চরম বামপন্থী গোষ্ঠীগুলো এবং তাদের সুযোগ কাজে লাগানো অপরাধীরা। প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু এ পরিস্থিতিকে ‘নজিরবিহীনভাবে সংগঠিত বিশৃঙ্খলা’ বলে বর্ণনা করেছেন।

তবে রোশের মতে, এত ব্যাপক সহিংসতার জন্য চরম বামপন্থীদের ছোট ও শিথিলভাবে সংগঠিত অংশকে এককভাবে দায়ী করা যায় না। ফরাসি গোয়েন্দা সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, বিভিন্ন উপদলে বিভক্ত এ আন্দোলনে প্রায় ৩ হাজার মানুষ রয়েছে। এসব উপদলের আনুষ্ঠানিক সাংগঠনিক কাঠামো নেই।

রোশে বলেন, সহিংস বামপন্থী কর্মী ও লুটপাটকারীদের লক্ষ্যও আলাদা। কর্মীরা সাধারণত ব্যাংক ও ম্যাকডোনাল্ডসের মতো পুঁজিবাদ ও বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রতীকী স্থাপনায় হামলা চালান। অন্যদিকে লুটপাটকারীরা রাজনৈতিক বক্তব্য দেয়ার জন্য নয়, বরং পণ্য চুরি করতে খেলাধুলার সামগ্রী ও ইলেকট্রনিকসের দোকান লক্ষ্যবস্তু করেন।

কঠোর অবস্থানের ঘোষণা মাখোঁর

দাঙ্গাকারীদের বিরুদ্ধে ‘কোনো ধরনের ছাড় না দেয়ার’ ঘোষণা দিয়েছেন মাখোঁ। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি ভবন সুরক্ষায় আঞ্চলিক প্রশাসনের কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। প্রয়োজনে নির্দিষ্ট কিছু সমাবেশ নিষিদ্ধ করার কথাও বলেছেন।

সহিংসতার আশঙ্কা গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও পরিকল্পনার ব্যর্থতার কারণে অবমূল্যায়ন করা হয়েছিল কিনা, তা তদন্তের নির্দেশও দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট।

পরিস্থিতি অনুযায়ী বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয়ভাবে কারফিউ জারির সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

কর্তৃপক্ষ জানায়, শনিবার ফ্রান্সজুড়ে প্রায় ২ হাজার ৪০০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে প্যারিস অঞ্চলে ৮৫৫, মার্সেইয়ে ১০১ এবং লিওঁতে ১৯৯ জন রয়েছেন।

প্যারিসের কৌঁসুলিদের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী অঞ্চলে গ্রেফতার ব্যক্তিদের মধ্যে ৫৫৭ জনকে পুলিশি হেফাজতে রাখা হয়েছে। তাঁদের ৭৮ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক।

কৌঁসুলিদের ভাষ্য অনুযায়ী, অধিকাংশ মামলায় সম্পত্তি ভাংচুর, সহিংসতা সংঘটনের উদ্দেশ্যে গঠিত দলে অংশগ্রহণ এবং পুলিশ কর্মকর্তাদের ওপর হামলার অভিযোগ আনা হয়েছে।

আরও