অ্যান্টার্কটিকা ভ্রমণে যাবেন? খেয়াল রাখুন পরিবেশের প্রতিও

আপনি যদি ভ্রমণের ক্ষেত্রে পরিবেশের প্রতি শ্রদ্ধাশীল আচরণ করেন, তাহলে এই বিস্ময়কর স্থানগুলোর সৌন্দর্য আরো মনোহর হয়ে আপনাকে ধরা দেবে। সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতিরও সুরক্ষায় আপনিও নিজের অবদান রাখতে পারেন।

২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে গ্রিনল্যান্ডে পর্যটন ৪৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ২০২৩ সালে ১ লাখ ৩১ হাজার ৭৬৭ জন পর্যটক দেশটি ভ্রমণ করেছেন। পর্যটন বৃদ্ধির প্রধান কারণ ক্রুজ জাহাজের সংখ্যা বৃদ্ধি, যা আর্কটিক অঞ্চলের পানিতে চলাচল করছে।

আর্কটিক কাউন্সিলের মতে, ২০১৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে আর্কটিক পোলার কোড এলাকায় (যেটি উত্তর মেরুর চারপাশের একটি নিয়ন্ত্রিত সামুদ্রিক এলাকা) জাহাজের প্রবেশ ৩৭ শতাংশ বেড়েছে। অনেক ক্রুজ কোম্পানি, যেমন হার্টিগ্রুটেন, সোয়ান হেলেনিক ও পোনান্ট ইত্যাদি আইসল্যান্ড, সভালবার্ড ও গ্রিনল্যান্ডের রুটে চলাচল করে। ২০২৪ সালে নুক বিমানবন্দরের সম্প্রসারণ এবং ২০২৬ সালের মধ্যে আরো দুটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর তৈরি হওয়ার ফলে পর্যটকের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলেও মনে করছেন অনেকে। এদিকে, পর্যটন বৃদ্ধি পাচ্ছে বিপরীত প্রান্তের অ্যান্টার্কটিকায়ও। ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অফ নেচার জানিয়েছে, ১৯৯০ এর দশক থেকে পর্যটক সংখ্যা নিয়মিতভাবে বাড়ছে। ওই এলাকায় ২০২২-২৩ মৌসুমে ১ লাখ ৪ হাজার ৮৯৭ জন পর্যটক ভ্রমণে যান। গত বছর যা ১ লাখ ২৪ হাজার ২৬২-এ পৌঁছেছে।

এর মধ্যে ৮০ হাজারের বেশি পর্যটক পা রেখেছিলেন অ্যান্টার্কটিকার ভূমিতে। তবে বিষয়টি নিয়ে পরিবেশবাদীরা উদ্বিগ্ন। কারণ মানুষের উপস্থিতি ওই এলাকার সংবেদনশীল ইকোসিস্টেম ব্যাহত করতে পারে, প্রাণীদের আচরণ পরিবর্তন করতে পারে এবং অনিচ্ছাকৃতভাবে বহিরাগত জীবাণুও ছড়িয়ে দিতে পারে।

এ কারণে আপনাকে আগেই চিন্তা করতে হবে, পরিবেশের ওপর যত কম নেতিবাচক প্রভাব রেখে ভ্রমণকে আনন্দদায়ক করা যায়। আর্কটিক বা অ্যান্টার্কটিকার ক্ষেত্রে এক্ষেত্রে প্রথম কাজ পরিবহন পছন্দ করা। ক্রুজ জাহাজগুলো হোটেলসহ অন্যান্য পরিষেবা সঙ্গে করে নিয়ে আসে। এটি স্থানীয় অর্থনীতির জন্য তেমন সুবিধাজনক নয়। অন্যদিকে, উড়োজাহাজে গেলে স্থানীয় হোটেল ও ট্যুর অপারেটরদের সাহায্য করা সম্ভব, তবে বিমানের উচ্চ কার্বন নির্গমন রয়েছে। এই দিকটি পরিবেশগত ঝুঁকির কারণ।

বিশ্বব্যাপী বায়ুবাহিত কার্বন নির্গমন ২ দশমিক ৫ শতাংশ হলেও শিপিং শিল্পের অবদান ৩ শতাংশ। এছাড়া জাহাজের ইঞ্জিনের আওয়াজ তিমির ইকোলোকেশন ব্যাহত করতে পারে। ভ্রমণকারীদের জন্য ট্রেন একটি বিকল্প হতে পারে, যা কার্বন নির্গমন ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ কমায়। উদাহরণস্বরূপ, আপনি স্টকহোম থেকে নরওয়ের নরভিক, ট্রন্ডহেইম থেকে বোডো বা হেলসিঙ্কি থেকে রোভানিয়েমি পর্যন্ত ট্রেনেই যেতে পারেন।

পরিবহনের পরের বিষয়টি স্থানীয় প্রাণীদের প্রতি সহমর্মী হওয়া। ভ্রমণে প্রাণীদের বিরক্ত না করেই তাদের পর্যবেক্ষণ করুন। বিশেষ করে, সেলফি তোলার জন্য প্রাণীদের কাছাকাছি যাওয়া উচিত নয়। যদি আপনি ধৈর্য ধরেন, তাহলে অনেক প্রাণী নিজেরাই কৌতূহলী হয়ে আপনার কাছে চলে আসতে পারে। এক্ষেত্রে স্থানীয় গাইডদের সাহায্য নেয়াও গুরুত্বপূর্ণ।

যদি আপনি ক্রুজে না অবস্থান করে ভূমিতে থাকেন, তাহলে পরিবেশগত প্রভাব কমাতে স্থানীয় খাবার বেছে নেয়া ভালো। গ্রিনল্যান্ড ও আর্কটিক কানাডার ইনুইট সম্প্রদায় এখনো টিকিয়ে রাখার জন্য শিকার করে। স্থানীয়ভাবে আহরিত সীলের মাংস আমদানি করা মাংসের তুলনায় অনেক কম কার্বন নিঃসরণ সৃষ্টি করে। যদিও এটি কারো ব্যক্তিগত পছন্দের ওপর নির্ভর করে, তবে এটি পরিবেশের জন্য বেশি উপযোগী।

যদি আপনি ক্যাম্পিং বা দূরবর্তী অঞ্চলে ভ্রমণের পরিকল্পনা করেন, তাহলে স্থানীয়ভাবে গিয়ার ভাড়া নেয়া যেতে পারে, যা পরিবেশবান্ধব ও অর্থনৈতিকভাবে সহায়ক।

আপনি যদি নির্দিষ্ট প্রাণী বা প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে চান, তাহলে তাদের অভিবাসন সময়সূচি সম্পর্কে খবর নিন। উদাহরণস্বরূপ— নিউফাউন্ডল্যান্ডে মে থেকে জুন মাসে গেলে বরফখণ্ডের পটভূমিতে সবুজ মাঠ ও ফুল দেখতে পাবেন।

আপনি যদি ভ্রমণের ক্ষেত্রে সঠিক পরিকল্পনা এবং পরিবেশের প্রতি শ্রদ্ধাশীল আচরণ করেন, তাহলে এই বিস্ময়কর স্থানগুলোর সৌন্দর্য আরো মনোহর হয়ে আপনাকে ধরা দেবে। সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতিরও সুরক্ষায় আপনিও নিজের অবদান রাখতে পারেন।

আরও