ভেনিজুয়েলার ‘ফার্স্ট কমব্যাট্যান্ট’ সিলিয়া ফ্লোরেস

প্রভাবশালী আইনজীবী থেকে ভিনদেশী কারাগারের বন্দিনী

রাজনৈতিক অঙ্গণে মাদুরোর কারণেই যে সিলিয়া ফ্লোরেস প্রভাবশালী হয়ে উঠেছেন, বিষয়টি তা নয়। ‘ফার্স্ট কমব্যাট্যান্ট’ উপাধি পাওয়ার আগেই তিনি রাজনৈতিক অঙ্গণে নিজের শক্তিশালী অবস্থান গড়ে তুলেছিলেন তিনি।

ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে গত ৩ জানুয়ারি ভোররাতে কারাকাসের প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ থেকে অপহরণ করে মার্কিন ডেল্টা ফোর্স। ভেনিজুয়েলার একসময়ের নামকরা আইনজীবী সিলিয়া ফ্লোরেসও এখন স্বামীর সঙ্গে মার্কিন কারাগারে বন্দী অবস্থায় রয়েছেন। সোমবার (৫ জানুয়ারি) তাদের বিচার শুরু হতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

এই ঘটনার মধ্য দিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও নিকোলাস মাদুরোর পাশাপাশি আলোচনায় এসেছেন ভেনিজুয়েলার অপহৃত প্রেসিডেন্টের স্ত্রী তথা দেশটির ‘ফার্স্ট কমব্যাট্যান্ট’ সিলিয়া ফ্লোরেসও।

দেশটিতে প্রেসিডেন্টের স্ত্রীকে ‘ফার্স্ট লেডির’ পরিবর্তে উল্লেখ করা ‘ফার্স্ট কমব্যাট্যান্ট’ হিসেবে। চাভিজমো মতবাদ (প্রয়াত উগো চাভেজের মতবাদ) অনুযায়ী, প্রেসিডেন্টের সবচেয়ে কাছের আদর্শিক যোদ্ধা ও রাজনৈতিক সংগ্রামের সহভাগী হিসেবে প্রেসিডেন্টের দাম্পত্য সঙ্গী ফার্স্ট লেডি বা ফার্স্ট জেন্টলম্যানের পরিবর্তে ফার্স্ট কমব্যাট্যান্ট বা প্রথম যোদ্ধা হিসেবে অভিহিত করা হয়।

৬৯ বছর বয়সী সিলিয়া ফ্লোরেসের জন্ম ১৯৫৬ সালের ১৫ অক্টোবর। মধ্য ভেনেজুয়েলার তিনাকুইয়ো শহরে। কারাকাসের পশ্চিমাঞ্চলে শ্রমজীবী মানুষের বসতি হিসেবে পরিচিত এক এলাকায় বড় হয়েছেন তিনি।

সিলিয়া ফ্লোরেস মূলত একজন আইনজীবী। কারাকাসের ইউনিভার্সিদাদ সান্তা মারিয়া থেকে শ্রম ও ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ হিসেবে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। ১৯৯২ সালে তৎকালীন ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট কার্লোস আন্দ্রেস পেরেজকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য উগো চাভেজের নেতৃত্বে এক সামরিক অভ্যুত্থান ব্যর্থ হয়। এর পর উগো চাভেজ আটক হলে তার আইনী সহায়তাকারী দলের নেতৃত্ব দেন সিলিয়া ফ্লোরেস।

ভেনিজুয়েলার স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, ১৯৯৪ সালে চাভেজের কারামুক্তিতে ফ্লোরেস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এর ফলে ১৯৯৯ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে চাভেজের সফল প্রার্থিতার পথ সুগম হয়।

এরপর তিনি চাভেজের নামানুসারে গড়ে ওঠা ‘চাভিসমো’ আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ সদস্যে পরিণত হন। এ আন্দোলনের মধ্য দিয়েই তার পরিচয় হয় ভবিষ্যৎ স্বামী নিকোলাস মাদুরোর সঙ্গে। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে তারা একসঙ্গে রয়েছেন। ৬৩ বছর বয়সী মাদুরো সিলিয়া ফ্লোরেসকে ‘সিলিতা’ বলে ডাকেন।

তবে মাদুরোর সঙ্গে ঘণিষ্ঠতার আগে আরেকটি বিয়ে হয়েছিল তার।

রাজনৈতিক অঙ্গণে মাদুরোর কারণেই যে সিলিয়া ফ্লোরেস প্রভাবশালী হয়ে উঠেছেন, বিষয়টি তা নয়। ‘ফার্স্ট কমব্যাট্যান্ট’ উপাধি পাওয়ার আগেই তিনি রাজনৈতিক অঙ্গণে নিজের শক্তিশালী অবস্থান গড়ে তুলেছিলেন তিনি।

১৯৯৯ সালে উগো চাভেজ প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। এর এক বছর পর, ২০০০ সালে নিজ রাজ্য কোহেদেস থেকে ফ্লোরেস ভেনিজুয়েলার জাতীয় পরিষদে (ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি) সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন সিলিয়া ফ্লোরেস।

২০০৫ সালে তিনি পুনর্নির্বাচিত হন এবং ২০০৬ সালে ভেনিজুয়েলার সংসদের প্রথম নারী স্পিকার হন তিনি। স্পিকার হিসেবে নিকোলাস মাদুরোর স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন তিনি। ২০০৯ সালে তিনি চাভেজের ইউনাইটেড সোশ্যালিস্ট পার্টি অব ভেনিজুয়েলার সেকেন্ড ভাইস-প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিয়োগ পান। ২০১২ সালে উগো চাভেজ তাকে অ্যাটর্নি জেনারেল পদে নিয়োগ দেন।

২০১৩ সালে চাভেজের মৃত্যুর পর বিরোধী প্রার্থী এনরিকে কাপ্রিলেসকে পরাজিত করে নির্বাচনে জয়ী হন মাদুরো। ওই বছরের জুলাইয়ে, দুই দশকেরও বেশি সময়ের সম্পর্কের পর মাদুরো ও ফ্লোরেস বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।

‘ফার্স্ট কমব্যাট্যান্ট’ হিসেবে নতুন দায়িত্ব গ্রহণের পর ফ্লোরেস প্রকাশ্য রাজনীতি থেকে কিছুটা সরে গিয়ে পর্দার আড়ালে কাজ শুরু করেন।

তবে ২০১৭ সালে ভেনিজুয়েলার নতুন সংবিধান প্রণয়নের লক্ষ্যে গঠিত গণপরিষদে নির্বাচিত হওয়ার মাধ্যমে তিনি আবার সক্রিয় রাজনীতিতে ফেরেন। ২০২১ সালে তিনি আবারো দেশটির ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির সদস্য নির্বাচিত হন।

অপহৃত হওয়ার সময়ে সময় তিনি ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির উপদেষ্টা (ডেপুটি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তার বিরুদ্ধে পরিবারের ঘনিষ্ঠ সদস্যদের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পদে নিয়োগ দেয়ার অভিযোগ উঠেছে।

মাদুরোর ঘনিষ্ঠ মহলের সদস্য হওয়ার কারণে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও ফ্লোরেসের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। সে সময় অর্গানাইজেশন অব আমেরিকান স্টেটস অভিযোগ করে যে, মাদুরো সরকার মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে।

শনিবার অপহরণের পর ফ্লোরেসকে মাদুরোর সঙ্গে সোমবারেই নিউইয়র্কের একটি আদালতে হাজির করা হতে পারে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রে একটি উড়োজাহাজ থেকে মাদুরোকে নামতে দেখা গেলেও ফ্লোরেসকে দেখা যায়নি।

নিউইয়র্কের সাদার্ন ডিস্ট্রিক্টে তার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডি এক্সে (সাবেক টুইটার) দেয়া এক পোস্টে জানান, ফ্লোরেসের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো মাদুরোর অভিযোগের অনুরূপ। এর মধ্যে রয়েছে—‘নার্কো-সন্ত্রাসের ষড়যন্ত্র, কোকেন আমদানিতে ষড়যন্ত্র, মেশিনগান ও বিধ্বংসী অস্ত্রের দখল এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এসব অস্ত্র দখলের ষড়যন্ত্র’।
(আল-জাজিরা অবলম্বনে)

আরও