পলিটিকো এক্সক্লুসিভ

ট্রাম্পের এজেন্ডা বাস্তবায়নে খেলাধুলা: স্টেট ডিপার্টমেন্টের গোপন নকশা

নথিতে পরিষ্কার বলা হয়েছে, খেলাধুলা কেবল বিনোদন নয়, বরং চীন বা রাশিয়ার মতো বৈশ্বিক প্রতিপক্ষদের হঠানোর একটি মঞ্চ।

যুক্তরাষ্ট্র যখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আসরের সহ–আয়োজক, তখন সেটি শুধু ফুটবল নয়। সেটি ভিসা, সীমান্ত, নিরাপত্তা, সংস্কৃতি আর রাজনীতির এক বিশাল পরীক্ষাগার। স্টেট ডিপার্টমেন্টের নয় পৃষ্ঠার ‘স্পোর্টস ডিপ্লোম্যাসি প্লেবুক’ মূলত একটি নীলনকশা—বিশ্বকাপ, অলিম্পিক, সুপার বোলের মতো মেগা–ইভেন্টগুলোকে কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সফট পাওয়ার অস্ত্র বানানো যায়।

বিশ্বের কূটনীতির মানচিত্রে ওয়াশিংটনের পররাষ্ট্র দপ্তরকে সবাই চেনে ‘ফগি বটম' নামে। স্বাভাবিকভাবেই সেখানে যুদ্ধ, শান্তি, নিষেধাজ্ঞা আর সমঝোতার নথি তৈরি হয়। তবে ফগি বটমের করিডোরে এখন আর কেবল পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ বা বাণিজ্য যুদ্ধের ফাইল ওড়ে না; সেখানে এখন আলোচনার টেবিলে জায়গা করে নিয়েছে ফিফার টেকনিক্যাল ম্যানুয়াল আর অলিম্পিকের চার্টার। ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা স্টেট ডিপার্টমেন্ট এক অদ্ভুত বিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যে কূটনীতিকরা এক সময় মধ্যপ্রাচ্য বা দক্ষিণ চীন সাগরের ভূ-রাজনীতি নিয়ে রাত জাগতেন, তারা এখন ব্যস্ত 'ফিফা পাস' আর 'হুলিগান' ডাটাবেস নিয়ে। পলিটিকো'র হাতে আসা নয় পৃষ্ঠার এক গোপন নথিতে দেখা যাচ্ছে, ট্রাম্প প্রশাসন আগামী দশককে 'ক্রীড়া দশক' হিসেবে ঘোষণা করে খেলাধুলাকে বানাতে চাইছে তাদের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম প্রধান হাতিয়ার।

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা, ইউক্রেনের যুদ্ধ বা চীনের সঙ্গে কৌশলগত টানাপোড়েন—এসব ইস্যুতে ট্রাম্প বরাবরই স্টেট ডিপার্টমেন্টের বড় অংশকে পাশ কাটিয়ে গেছেন। সিদ্ধান্তগুলো কেন্দ্রীভূত থেকেছে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, কয়েকজন ঘনিষ্ঠ সহকারী এবং বিশেষ দূতের হাতে। কিন্তু এমন এক জায়গায় এসে ট্রাম্প প্রশাসন আর স্টেট ডিপার্টমেন্ট একে অন্যকে এড়িয়ে যেতে পারছে না, আর সেটা হচ্ছে ফিফা বিশ্বকাপ।

যুক্তরাষ্ট্র যখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আসরের সহ–আয়োজক, তখন সেটি শুধু ফুটবল নয়। সেটি ভিসা, সীমান্ত, নিরাপত্তা, সংস্কৃতি আর রাজনীতির এক বিশাল পরীক্ষাগার। আর এই পরীক্ষাগারে নিজেদের প্রয়োজনীয়তা প্রমাণ করার এক বিরল সুযোগ দেখছে স্টেট ডিপার্টমেন্ট। মার্কিন এই দপ্তরের ভেতরে ঘুরে বেড়ানো একটি নথির নাম ‘স্পোর্টস ডিপ্লোম্যাসি প্লেবুক’। নয় পৃষ্ঠার এই দলিল মূলত একটি নীলনকশা—বিশ্বকাপ, অলিম্পিক, সুপার বোলের মতো মেগা–ইভেন্টগুলোকে কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সফট পাওয়ার অস্ত্র বানানো যায়। বিদেশী বিনিয়োগ টানা, আন্তর্জাতিক জনমত প্রভাবিত করা, এমনকি ট্রাম্প প্রশাসনের সামাজিক নীতিগুলোও বৈশ্বিক পরিসরে তুলে ধরার পথ দেখানো হয়েছে এতে।

এই নতুন দর্শনের মূলে রয়েছে একটি দ্বান্দ্বিক লড়াই। একদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কট্টর 'আমেরিকা ফার্স্ট' নীতি এবং অভিবাসনের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ, আর অন্যদিকে ২০২৬ বিশ্বকাপ ও ২০২৮ অলিম্পিকের মতো মেগা ইভেন্টগুলোকে সফল করে তোলার প্রবল আকাঙ্ক্ষা। এই দুই বিপরীত স্রোতের মোহনাতেই দাঁড়িয়ে আছেন মার্কো রুবিও। স্টেট ডিপার্টমেন্টের জন্য এটি এখন এক অগ্নিপরীক্ষা—কীভাবে এক দিকে বিশ্বের নানা প্রান্তের দর্শকদের জন্য 'স্বাগতম' জানানো লাল গালিচা বিছানো যায়, আবার অন্যদিকে ট্রাম্পের 'জেনোফোবিক' বা বিদেশী-বিদ্বেষী হিসেবে পরিচিত প্রশাসনের কঠোর নিয়মের বেড়াজাল অক্ষুণ্ণ রাখা যায়।

এই 'স্পোর্টস ডিপ্লোম্যাসি প্লেবুক'-এর পরতে পরতে লুকিয়ে আছে ক্ষমতার সূক্ষ্ম চাল। নথিতে পরিষ্কার বলা হয়েছে, খেলাধুলা কেবল বিনোদন নয়, বরং চীন বা রাশিয়ার মতো বৈশ্বিক প্রতিপক্ষদের হঠানোর একটি মঞ্চ। আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংস্থাগুলোয় মার্কিন আধিপত্য ফিরিয়ে এনে প্রতিপক্ষের প্রোপাগান্ডা রুখে দেয়াই এর লক্ষ্য। এমনকি ট্রাম্পের ব্যক্তিগত পছন্দের আলটিমেট ফাইটিং চ্যাম্পিয়নশিপ (ইউএফসি) থেকে শুরু করে সুপার বোল পর্যন্ত—সবই এখন মার্কিন 'ব্র্যান্ড' প্রচারের মাধ্যম। দূতাবাসের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে যেন তারা সৃজনশীল উপায়ে এই ইভেন্টগুলোকে ব্যবহার করে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করেন।

পরিস্থিতিকে আরো জটিল করেছে ট্রাম্পের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা। তিন ডজনের বেশি দেশের নাগরিকদের ওপর বিভিন্ন মাত্রার বিধিনিষেধ রয়েছে—এর মধ্যে এমন দেশও আছে, যারা বিশ্বকাপে খেলবে। খেলোয়াড় ও টিম স্টাফদের জন্য ছাড় থাকলেও, সেটি নিঃশর্ত নয়। সন্দেহ থাকলেই ভিসা বাতিল হতে পারে। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেয়া পোস্টও হতে পারে ভিসা না পাওয়ার কারণ। খেলোয়াড়দের জন্য ছাড় থাকলেও সাধারণ সমর্থকদের জন্য বসানো হয়েছে 'সোশ্যাল মিডিয়া ভেটিং'-এর মতো কঠোর ফিল্টার। যদি কারো অনলাইন কর্মকাণ্ডে মার্কিন সংস্কৃতি বা প্রতিষ্ঠানের প্রতি বিরাগ প্রকাশ পায়, তবে তার জন্য বিশ্বকাপের দরজা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এমনকি ফুটবল মাঠের কুখ্যাত 'হুলিগান'দের ঠেকাতে বিভিন্ন দেশের গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে তথ্য বিনিময় করছে স্টেট ডিপার্টমেন্ট।

ফিফা বরাবরই বলে এসেছে—আয়োজক দেশের অভিবাসন নীতি তাদের বিষয় নয়। তাই প্রকাশ্যে তারা ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সংঘাতে যায়নি। কিন্তু আড়ালে চলছে নীরব কূটনীতি। আয়োজক শহরগুলোকে আগাম সতর্ক করা, কিছু দেশের সঙ্গে ভিসা সমন্বয়—সবই চলছে পর্দার আড়ালে।

সবশেষে, এই প্লেবুক ট্রাম্পের নিজস্ব সামাজিক মূল্যবোধেরও এক প্রতিফলন। ট্রান্সজেন্ডার অ্যাথলেটদের ভিসা নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে নারী ও মেয়েদের জন্য তথাকথিত 'নিরাপদ ক্রীড়া পরিবেশ' নিশ্চিত করার মাধ্যমে ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ নীতিগুলোকেই বৈশ্বিক রূপ দিতে চাইছে ওয়াশিংটন। ফুটবল মাঠে যখন প্রথম বাঁশি বাজবে, তখন গোলপোস্টের লড়াইয়ের আড়ালে চলবে এক গভীর কূটনৈতিক খেলা, যার নীল নকশা তৈরি হয়েছে স্টেট ডিপার্টমেন্টের এই গোপন দলিলে।

আরও