ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় কুহেস্তাক শহরে বিয়ের অনুষ্ঠানে হামলায় পাঁচজন নিহত ও অন্তত ৬৮ জন আহত হওয়ার ঘটনায় ব্যবহৃত অস্ত্রটি সরাসরি মার্কিন সামরিক বাহিনীর ছোড়া হয়ে থাকতে পারে বলে জানিয়েছেন অস্ত্র বিশেষজ্ঞরা। এমনকি সেটি কোনো লক্ষ্যবস্তুতে আঘাতের পর ছিটকে গিয়ে এ বিস্ফোরণ ঘটেনি, বরং এটি সরাসরি লক্ষ্যেই আঘাত করেছে বলে মনে করছেন তারা। রয়টার্সের যাচাই করা ছবি ও ভিডিও বিশ্লেষণ করে এ মত দিয়েছেন অস্ত্র বিশেষজ্ঞরা।
গত মঙ্গলবার রাতে কুহেস্তাকের একটি বাড়িতে বিয়ের অনুষ্ঠান চলাকালে বিস্ফোরণটি ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, অনুষ্ঠানে কয়েক ডজন মানুষ উপস্থিত ছিলেন। বিস্ফোরণে বাড়িটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং অনেকে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েন।
এ ঘটনার পর কুহেস্তাকে বেসামরিক হতাহতের বিষয়টি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর আগে ফেব্রুয়ারিতে ইরানের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বহু শিশু ও শিক্ষক নিহত হওয়ার ঘটনা ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, গত ১ সেপ্টেম্বর ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে একাধিক হামলা চালানো হয়। এসব হামলায় ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) বিমান প্রতিরক্ষা স্থাপনা, রাডার ব্যবস্থা ও যোগাযোগ অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু করা হয়। উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক স্থাপনায় ইরানের আগের হামলার জবাবে এসব হামলা চালানো হয় বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
রয়টার্সের পর্যালোচনার জন্য ছবি ও ভিডিও চার সামরিক অস্ত্র বিশেষজ্ঞকে দেয়া হয়। তাদের তিনজনের মতে, বাড়িটির ছাদে সরাসরি অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। কাছাকাছি কোনো স্থাপনায় হামলার পর অস্ত্রের অংশ ছিটকে এসে বাড়িটিতে আঘাত করার সঙ্গে ক্ষয়ক্ষতির ধরনটি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
সাবেক মার্কিন সেনা বিস্ফোরক নিষ্ক্রিয়করণ প্রযুক্তিবিদ ও অস্ত্র বিশ্লেষক ট্রেভর বল বলেন, ছাদে আঘাতের পর অথবা ছাদের ঠিক ওপরে বিস্ফোরণ ঘটেছে বলে মনে হচ্ছে। তার মতে, এটি সরাসরি আঘাতের ফল এবং অস্ত্রটি সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের।
অবসরপ্রাপ্ত ব্রিটিশ সেনা কর্মকর্তা গ্যারেথ কোলেটও একই মত দিয়েছেন। তার মতে, হাতে পাওয়া প্রমাণগুলো মার্কিন ৫০০ পাউন্ড ওজনের আকাশ থেকে নিক্ষেপযোগ্য অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনাকেই বেশি সমর্থন করে।
অসলোভিত্তিক পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষণা অধ্যাপক সেবাস্টিয়ান শুটও ছবি ও ভিডিও পর্যালোচনা করেছেন। তার মতে, বাড়িটির ছাদে তৈরি গর্তটি পাশের টেলিযোগাযোগ টাওয়ারে হামলার পর কোনো অস্ত্র ছিটকে এসে আঘাত করার কারণে সৃষ্টি হয়নি।
বিশেষজ্ঞরা আরো বলেন, ভুলপথে যাওয়া ইরানি বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে বাড়িটি ধ্বংস হয়েছে—এমন সম্ভাবনাও কম। শুটের মতে, আঘাতের কোণটি বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কোলেটও বলেন, বিমান প্রতিরক্ষা ওয়ারহেডে সাধারণত যে ধরনের খণ্ডিত ধ্বংসাবশেষ থাকার কথা, ঘটনাস্থলে তার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এদিকে ইরানি গণমাধ্যমে প্রকাশিত কিছু অস্ত্রের ধ্বংসাবশেষের ছবি ও ভিডিও বিশ্লেষণ করে ট্রেভর বল সেগুলোর কয়েকটি অংশকে জয়েন্ট স্ট্যান্ড-অব ওয়েপন (জেএসওডব্লিউ) হিসেবে শনাক্ত করেছেন। এটি যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহৃত এক ধরনের গ্লাইড বোমা। তবে ওই ধ্বংসাবশেষ কুহেস্তাকের বাড়িতে হামলার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত কিনা, তা যাচাই করতে পারেনি রয়টার্স।
দুই মার্কিন কর্মকর্তা পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ১ সেপ্টেম্বর কুহেস্তাক এলাকায় মার্কিন বাহিনী হামলা চালায়। এর লক্ষ্য ছিল শহরের একটি টেলিযোগাযোগ টাওয়ার। স্যাটেলাইট চিত্র অনুযায়ী, টাওয়ারটি বিয়ের অনুষ্ঠানস্থল থেকে প্রায় ১৩৫ মিটার দূরে। ইরানি গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সময় রাত সাড়ে ৯টার দিকে টাওয়ারটিতে হামলা হয়।
এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিয়ের অনুষ্ঠানে হতাহতের ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে। এর মধ্যে মার্কিন হামলা, ইরানি বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের গতিপথ পরিবর্তন এবং কোনো ইন্টারসেপ্টর লক্ষ্যচ্যুত হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
বিস্ফোরণের পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনাটির খবর ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে যোগাযোগ থাকা মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, ঘটনার বিষয়ে বিদেশী গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা না বলতে প্রত্যক্ষদর্শীদের ওপর চাপ প্রয়োগ করে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। রয়টার্স মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলেছে।
ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, হামলার শিকার টেলিযোগাযোগ টাওয়ারটি বেসামরিক স্থাপনা ছিল। এটি সিরিকের বাসিন্দাদের মোবাইল, টেলিফোন ও ইন্টারনেট সেবা দিত।
গত বৃহস্পতিবার কুহেস্তাকে নিহতদের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সেদিনের হামলায় নিহত চার বছর বয়সী আমির মোহাম্মদ কারিমির কফিনে ফুল দিতে দেখা যায় স্থানীয়দের। এ সময় এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, সিরিকের পরিস্থিতি অত্যন্ত শোকাবহ। মানুষ এখনো ঘটনাটির ধাক্কা সামলে উঠতে পারেনি।