রাশিয়ার গা ঘেঁষে ফিনল্যান্ডে ন্যাটোর ফ্রন্টলাইন, আরেকটি স্নায়ুযুদ্ধের শুরু?

ফিনল্যান্ডের রাশিয়ার সঙ্গে ১ হাজার ৩৪০ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে—এটি ইউরোপের দীর্ঘতম সীমান্ত। এই সীমান্তেই এখন ১৫ ফুট উঁচু কাঁটাতারের দেয়াল তোলা হচ্ছে, যেখানে এক সময় ছিল শুধু খুঁটি আর গরুর পথ। সীমান্তের দৃশ্যপট পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যাচ্ছে পারিপার্শ্বিক বাস্তবতা। একদিকে দোকানপাটে নেই রুশ পর্যটকদের ভিড়, অন্যদিকে সীমান্তজুড়ে নজরদারি ক্যামেরা ও গতি-সংবেদনশীল সেন্সরের পাতা জাল।

ফিনল্যান্ড কয়েক বছর আগেও একটি নিরপেক্ষ ইউরোপীয় রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত ছিল। সেই দেশটি এখন রাশিয়ার গা ঘেঁষে ন্যাটোর উত্তরের ফ্রন্টলাইন। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পরপরই হেলসিংকি ন্যাটোতে যোগ দেয়। তার পর থেকেই এক বিশাল ভৌগলিক, সামরিক ও রাজনৈতিক রূপান্তর শুরু হয় দেশটির।

লাপেনরান্তার সীমান্তবর্তী শ্যুটিং রেঞ্জে ফিনিশ রিজার্ভ সেনা ইয়ান্নে লাত্তো তার গাড়ির ট্রাঙ্ক খুলে একটি ছোট নজরদারি ড্রোন বের করলেন। লাত্তো বলেন, ‘যদি একদিন তারা (রাশিয়া) হঠাৎ সীমানা পরিবর্তন করতে আসে, যেমনটা ইউক্রেনে করল?’ তাঁর কণ্ঠে আতঙ্ক নেই, আছে বাস্তববোধ।

ফিনল্যান্ডের রাশিয়ার সঙ্গে ১ হাজার ৩৪০ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে—এটি ইউরোপের দীর্ঘতম সীমান্ত। এই সীমান্তেই এখন ১৫ ফুট উঁচু কাঁটাতারের দেয়াল তোলা হচ্ছে, যেখানে এক সময় ছিল শুধু খুঁটি আর গরুর পথ। সীমান্তের দৃশ্যপট পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যাচ্ছে পারিপার্শ্বিক বাস্তবতা। একদিকে দোকানপাটে নেই রুশ পর্যটকদের ভিড়, অন্যদিকে সীমান্তজুড়ে নজরদারি ক্যামেরা ও গতি-সংবেদনশীল সেন্সরের পাতা জাল।

এই প্রস্তুতির পেছনে আছে ইতিহাসের ধারাবাহিকতা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ফিনল্যান্ড তার ১০ শতাংশ ভূখণ্ড রাশিয়াকে দিতে বাধ্য হয়েছিল। লাত্তোর দাদু আয়রাপা নামক একটি সীমান্ত শহরে রাশিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে প্রাণ হারান। আজ সেই স্মৃতি যেন নতুন করে ফিরে এসেছে।

ন্যাটোতে যোগদানের পর ফিনল্যান্ড তার সামরিক কৌশলে আমূল পরিবর্তন এনেছে। ৬৪টি আমেরিকান এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান অর্ডার দেয়া হয়েছে। যুদ্ধকালীন সেনা সংখ্যা এক মিলিয়নে পৌঁছাতে রিজার্ভ বাহিনীর সদস্যদের বয়সসীমা ৬৫ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। রাডার ও ড্রোন পরিচালনায় বয়স্ক রিজার্ভদের ভূমিকা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা চলছে। লাত্তোর মতো অনেকেই নিজ উদ্যোগে ড্রোন চালানো শিখছেন, অনেকে নিজের হাতে বানাচ্ছেন কন্ট্রোল গগলস।

তবে সবকিছু ইতিবাচক নয়। লাপেনরান্তার ব্যবসায়ী ইয়ান্নে তারভাইনেন বলেন, ‘আগে লোকজন অভিযোগ করত যে রুশদের ভিড়ে খাবার হোটেলে টেবিল পাওয়া যেত না। এখন দেখুন, রেস্তোরাঁ ফাঁকা। টাকাও আসছে না।’ ফিনল্যান্ডের সীমান্ত অঞ্চলের অর্থনীতি বছরে ৩০০ মিলিয়ন ইউরো ক্ষতির মুখে পড়েছে। বেকারত্ব বেড়ে ১৫ শতাংশে ঠেকেছে।

অন্যদিকে, মানবিক সংকটও প্রকট হয়ে উঠেছে। রাশিয়ায় থাকা আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা করা যাচ্ছে না। অক্সানা সেরেব্রিয়াকোভা কোভিডের পর ফিনল্যান্ডে এসেছিলেন ছেলে ভিতালিকের জন্য। তিনি বলেন, আমার বড় ছেলে আর স্বামী মস্কোতে। এখন তাদের সঙ্গে দেখা করার কোনো উপায় নেই। এটা খুবই দুঃখজনক।

এমন সংকট নিয়ে ৯ জন ফিনিশ নাগরিক ইউরোপিয়ান কোর্ট অফ হিউম্যান রাইটসে মামলা করেছেন, সীমান্ত বন্ধের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে। এর মধ্যে রয়েছেন স্থানীয় রাজনীতিক ইভান ডেভিয়াটকিন, যিনি ফিনল্যান্ডে থাকেন কিন্তু রাশিয়ায় রয়েছেন তার বার্ধক্যপ্রাপ্ত মা।

রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও মানবিক সম্পর্কের টানাপোড়েনে যে রাজনীতি চলছে, তা মোটেই সহজ নয়। একদিকে ফিনল্যান্ডের সরকার বলছে, তারা সীমান্তে বেড়া তুলছে রাশিয়ার 'মাইগ্রেশন ওয়েপোনাইজেশন' প্রতিরোধে। অন্যদিকে মস্কো বলছে, ফিনল্যান্ড 'অ্যান্টি-রাশিয়া' নীতিতে চলছে।

স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী যুগে যেখানে ইউরোপ ধীরে ধীরে 'ডি-বরডারিং' বা সীমান্তহীনতার দিকে এগিয়েছিল, সেখানে এখন আবার 'রি-বরডারিং' ঘটছে—সীমান্ত আবার প্রতীক হয়ে উঠছে ভয়, অনিশ্চয়তা ও শক্তি প্রদর্শনের।

স্যামুয়েল সিলজানেন, ফিনল্যান্ডের বর্ডার গার্ডের অপারেশন প্রধান বলেন, আমরা একটা যুগ থেকে আরেক যুগে ঢুকে পড়েছি—এখন এটা রি-বরডারিংয়ের সময়।

এমন সময় এসব পরিবর্তন ঘটছে যখন ইউক্রেনে যুদ্ধ চলমান। রাশিয়া সীমান্তবর্তী ঘাঁটিগুলোতে ধীরে ধীরে গুদাম নির্মাণ করছে। এই অবস্থায় ফিনল্যান্ড কোনো ঝুঁকি নিতে চায় না। এ কারণে মিক্কেলিতে গড়ে তোলা হচ্ছে নতুন ন্যাটো সদর দপ্তর, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ একাধিক দেশের ৫০ জন সামরিক অফিসার ফিনল্যান্ডের সেনাদের সঙ্গে একযোগে কাজ করবেন।

চ্যাথাম হাউসের গবেষক মিননা আলান্ডার বলেন, ‘বার্তা স্পষ্ট—রাশিয়া যেন বোঝে, এখানে এসে ঝুঁকি নেওয়া তাদের পক্ষে লাভজনক হবে না।’

তবে সবকিছু মিলিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়—এই বেড়া, এই ড্রোন, এই প্রস্তুতি কি শুধুই নিরাপত্তার জন্য, নাকি এটি এক নতুন স্নায়ুযুদ্ধের সূচনা? ইতিহাস বলছে, সীমান্তে যখন কাঁটাতার ওঠে, তখন শুধু ভৌগলিক বিভাজন নয়—মানুষের সম্পর্ক, আত্মীয়তা, বাণিজ্য, মানবিকতা—সবকিছুই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ফিনল্যান্ড এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে যুদ্ধ আর শান্তির মধ্যবর্তী সীমারেখা শুধু কাঁটাতারে নয়, মানুষের মনে গেঁথে বসছে। ভবিষ্যতের ইউরোপে এ সীমান্ত কি একটি সতর্ক সংকেত হবে, নাকি আরেকটি পরিখা, তা সময়ই বলে দেবে।

আরও