আল জাজিরার প্রতিবেদন

কখনো না দেখা সন্তানকে খুঁজছেন— গাজায় এক বাবার অমীমাংসিত লড়াই

৩৫ বছর বয়সী লুব্বাদ কম্পিউটার প্রোগ্রামার। তিনি বলছিলেন, কল্পনা করুন, প্রতিটি স্বজন হারানো আর শোকের মুহূর্তের মাঝে আমরা সবাই যখন একসঙ্গে বসতাম, তখন একটি প্রশ্নই বারবার ঘুরেফিরে আসত— বাচ্চাটা কোথায়?

২০২৩ সালের ১৩ অক্টোবর। গাজায় ইসরায়েলের পূর্ণমাত্রার আক্রমণের মাত্র কয়েকদিন পরের কথা। ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে টেনে বের করা হলো মোহাম্মদ লুব্বাদকে। উত্তরের বেইত লাহিয়াতে তাদের পারিবারিক বাড়িটি বিমান হামলায় ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। ওইদিন থেকেই শুরু হলো লুব্বাদের জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ ট্রমা, আর শুরু হলো এমন এক সন্তানের খোঁজ— যাকে তিনি কখনো দেখেননি, এমনকি যার জন্ম হয়েছে কি-না, তা নিয়েও ছিল ঘোর অনিশ্চয়তা।

আহত লুব্বাদকে উত্তর গাজার ইন্দোনেশিয়ান হাসপাতালে ভর্তি করা হলো। সেখান থেকেই তিনি একটু একটু করে খবর পেতে শুরু করেন। তার দুই মেয়ের মধ্যে একজন বেঁচে আছে, কিন্তু পাঁচ বছর বয়সী রানা মারা গেছে। মারা গেছেন তার মা, ভাই, ভ্রাতৃবধূ এবং তাদের সন্তানও। কিন্তু তার স্ত্রী আমাল? আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা আমাল যেন পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে গেছেন।

তথ্যের গোলকধাঁধা আর রহস্যের শুরু

হাসপাতাল কর্মীরা প্রথমে লুব্বাদকে আশ্বস্ত করেন, কামাল আদওয়ান হাসপাতালে আমালকে নেয়া হয়েছে। সেখানে সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে একটি সুস্থ পুত্রসন্তান জন্ম দিয়েছেন তিনি। কিন্তু যুদ্ধের সেই বিভীষিকাময় পরিস্থিতিতে খবরগুলোও দিক বদলাচ্ছিল।

কয়েকদিন পরই লুব্বাদ জানতে পারেন, গুরুতর জখম অবস্থায় আমালকে আল-শিফা হাসপাতালে পাঠানো হয়েছিল। ২২ অক্টোবর সেখানে তিনি মারা যান। স্ত্রী ও সন্তানদের হারিয়ে শোকে পাথর হয়ে গিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু লুব্বাদের মনে বড় হতে থাকে এক বিশাল প্রশ্নবোধক চিহ্ন— ‘কোথায় আমার সেই নবজাতক ছেলে? সে কি বেঁচে আছে?’

নামহীন এক শিশু ও পরিচয়ের সংকট

৩৫ বছর বয়সী লুব্বাদ কম্পিউটার প্রোগ্রামার। তিনি বলছিলেন, ‘কল্পনা করুন, প্রতিটি স্বজন হারানো আর শোকের মুহূর্তের মাঝে আমরা সবাই যখন একসঙ্গে বসতাম, তখন একটি প্রশ্নই বারবার ঘুরেফিরে আসত— বাচ্চাটা কোথায়?’

অক্টোবরের শেষের দিকে লুব্বাদ একটি সূত্র পান। তার ভায়রাভাই জানান, আল-শিফা হাসপাতালে একদল প্রিম্যাচিউর (সময়ের আগে জন্ম নেওয়া) শিশুর মধ্যে একটি শিশু থাকতে পারে, যার বর্ণনার সাথে আমালের সন্তানের মিল আছে। হাসপাতাল কর্মীরাও জানিয়েছিলেন, অষ্টম মাসে জন্ম নেয়া একটি শিশু ১৩-১৪ অক্টোবরের দিকে কামাল আদওয়ান হাসপাতাল থেকে সেখানে স্থানান্তরিত হয়েছিল। কিন্তু সমস্যা ছিল একটাই— সেই যুদ্ধের ডামাডোলে কোনো সঠিক রেজিস্ট্রেশন বা নথিপত্র ছিল না।

এরই মধ্যে গল্পে আসে নতুন মোড়। লুব্বাদের বর্ণনা করা শিশুটির সঙ্গে হুবহু মিল থাকা একটি শিশুকে অন্য একটি পরিবার নিজেদের সন্তান হিসেবে দাবি করে এবং তাদের নামে রেজিস্ট্রি করে নেয়। শুরু হয় এক অমীমাংসিত দ্বন্দ্ব।

যুদ্ধে বেঁচে থাকা মেয়ের সঙ্গে মোহাম্মদ লুব্বাদ। ছবি: আল জাজিরা

যুদ্ধ ও সেই ‘অদৃশ্য’ প্রমাণ

নভেম্বর মাসে আল-শিফা হাসপাতালের ওপর ইসরায়েলি অবরোধ শুরু হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। লুব্বাদ বারবার দাবি করছিলেন ওই শিশুটি তার, কিন্তু সঠিক নথির অভাবে তিনি তা প্রমাণ করতে পারছিলেন না। গাজা পুলিশের তদন্ত বিভাগ নিশ্চিত করে, ওই সময় একই পরিস্থিতিতে থাকা দুজন নারী প্রিম্যাচিউর শিশুর জন্ম দিয়েছিলেন। যুদ্ধের কারণে বিদ্যুতহীন হাসপাতালে আইসিইউতে থাকা বেশ কয়েকজন শিশু মারা যায়। হাসপাতালের কর্মীদের বয়ান অনুযায়ী, মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে একজনের মা ছিলেন নিহত দুই নারীর একজন। অর্থাৎ, এখন মাত্র একটি শিশু জীবিত আছে, যাকে নিয়ে লুব্বাদ ও অন্য পরিবারটির মধ্যে লড়াই চলছে।

ডিসেম্বরে খবর এল, আল-শিফার প্রিম্যাচিউর শিশুদের মানবিক কারণে মিসরে সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। উন্মুখ হয়ে রাফাহ হাসপাতালের দিকে ছুটলেন লুব্বাদ। কিন্তু তিনি পৌঁছানোর আগেই শিশুদের নিয়ে উড়োজাহাজ তখন মিসরের পথে।

দুই বছর পর ফিরে আসা, কিন্তু…

দীর্ঘ দুই বছরেরও বেশি সময় অপেক্ষা করার পর, গত ৩১ মার্চ সেই শিশুরা গাজায় ফিরে আসে। ভিডিও ফুটেজে দেখা যায় সন্তানদের জড়িয়ে ধরে কাঁদছেন মায়েরা। কিন্তু লুব্বাদের ভাগ্যে সেই সুখ ছিল না। খান ইউনিসের নাসের হাসপাতালে তিনি যখন শিশুটিকে দেখতে যান, তখন অন্য পরিবারটিও সেখানে উপস্থিত ছিল।

লুব্বাদ বলেন, ‘আমাদের মধ্যে তখন বিতর্ক শুরু হয়। তদন্তকারীরা দুই পরিবারের কথা শুনে অবাক হয়ে যান যে, দুই পক্ষের ঘটনার মধ্যেই অবিশ্বাস্য মিল রয়েছে।’

পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, শিশুটির গায়ে থাকা আইডেন্টিফিকেশন ব্রেসলেট বলছে সে লুব্বাদের সন্তান নয়। কিন্তু তারা এও স্বীকার করেছে, কামাল আদওয়ান হাসপাতালের রেকর্ড হারিয়ে যাওয়ায় এবং বৈজ্ঞানিক প্রমাণের অভাবে অন্য পরিবারের নামে হওয়া রেজিস্ট্রেশনকেও চূড়ান্ত বলা যাচ্ছে না।

শেষ ভরসা ‘ডিএনএ টেস্ট’

লুব্বাদ এখন একটিই দাবি জানাচ্ছেন— ডিএনএ টেস্ট। তিনি বলেন, ‘ডিএনএ টেস্টই সবকিছুর সমাধান। ফলাফল যাই আসুক, আমি মেনে নেব। আমি শুধু নিশ্চিত হতে চাই।’

কিন্তু ট্র্যাজেডি হলো, গাজায় বর্তমানে ডিএনএ টেস্ট করার মতো কোনো ল্যাব অবশিষ্ট নেই। ইসরায়েলি হামলায় আল-শিফা হাসপাতালের বিশেষায়িত ল্যাবগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে। পুলিশ বিভাগ থেকে জানানো হয়েছে, হয় বিদেশ থেকে ডিএনএ টেস্টের সরঞ্জাম আনতে হবে, অথবা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নমুনা সংগ্রহ করে মিসর বা জর্ডানে পাঠাতে হবে।

লুব্বাদ বর্তমানে তার চার বছরের একমাত্র জীবিত কন্যা জানাকে নিয়ে বেঁচে আছেন। কিন্তু ওই ‘অচেনা’ শিশুটির কাছে তার মন পড়ে আছে। তিনি বলেন, ‘আমার জায়গায় কোনো বাবা থাকলে বুঝতেন এটা কতটা কষ্টের। আমি মানসিকভাবে ভেঙে পড়ার পথে। আমি কাজ করতে পারছি না, স্বাভাবিক জীবন কাটাতে পারছি না। আমার পুরো জীবনটা যেন এক জায়গায় থেমে গেছে।’

স্ত্রীর স্মৃতি আর হারিয়ে যাওয়া সন্তানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে লুব্বাদ এখন আল-শিফা হাসপাতালের সামনে প্রতিবাদের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। গাজার যুদ্ধ তার পরিবার কেড়ে নিয়েছে, ঘর কেড়ে নিয়েছে; কিন্তু তিনি বিশ্বাস করেন, তার রক্ত এখনো কোথাও বেঁচে আছে। আর যতক্ষণ না তিনি একটি ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ উত্তর পাচ্ছেন, ততক্ষণ লুব্বাদের এই পিতৃত্বের লড়াই থামবে না।

আরও