ক্যারিবীয় সাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরে মাদক পাচারের সন্দেহে নৌযান লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্রের চালানো হামলা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে এবং তা মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে পড়তে পারে বলে মন্তব্য করেছেন জাতিসংঘের এক মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ। খবর আল জাজিরা।
গতকাল প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জাতিসংঘের মানবাধিকার ও সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রমবিষয়ক বিশেষ র্যাপোর্টিয়ার বেন সল জানান, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত আন্তর্জাতিক জলসীমায় ৬৮টি নৌযানে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এসব হামলায় অন্তত ২২৩ জন নিহত হয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্র এসব অভিযানকে ‘নার্কো-সন্ত্রাসীদের’ বিরুদ্ধে আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা হিসেবে বর্ণনা করেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কংগ্রেসকে জানিয়েছেন, ঘোষিত ‘সন্ত্রাসী’ সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে চলমান সশস্ত্র সংঘাতের অংশ হিসেবেই এসব অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। তবে জাতিসংঘের প্রতিবেদনে এ যুক্তি প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। এতে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলাগুলো আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী, জীবনের অধিকারের লঙ্ঘন ও সম্ভাব্যভাবে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
প্রতিবেদন প্রকাশের দুই দিন আগে ক্যারিবীয় সাগরে একটি নৌযানে হামলা চালিয়ে চারজনকে হত্যার কথা জানিয়েছিল মার্কিন সামরিক বাহিনী। মানবাধিকার সংগঠনগুলোও এসব অভিযানের সমালোচনা করে এগুলোকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বলে আখ্যা দিয়েছে। পেন্টাগন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হামলার ভিডিও প্রকাশ করলেও নিহত ব্যক্তিদের পরিচয় বা তাদের বিরুদ্ধে মাদক পাচারের কী প্রমাণ ছিল, সে বিষয়ে খুব কম তথ্য প্রকাশ করেছে।
বেন সলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাদক পাচার এমন কোনো ‘সশস্ত্র আক্রমণ’-এর আইনি মানদণ্ড পূরণ করে না, যার ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্র আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করতে পারে। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, কোনো রাষ্ট্রের হয়ে বা রাষ্ট্রীয় প্রক্সি হিসেবে কাজ করা অ-রাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীর সশস্ত্র হামলার ক্ষেত্রে আত্মরক্ষার অধিকার প্রযোজ্য হতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের তালিকায় সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত কিছু গোষ্ঠী—যেমন ‘ট্রেন দে আরাগুয়া’—ভেনেজুয়েলা সরকারের হয়ে সশস্ত্র প্রক্সি হিসেবে কাজ করছিল, এমন কোনো ‘বাস্তব ভিত্তি’ পাওয়া যায়নি।
প্রতিবেদনে প্রাণঘাতী নয় এমন বিকল্প ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগের কথাও বলা হয়েছে। এর মধ্যে সমুদ্রপথে সন্দেহভাজন নৌযান আটকে দেয়া বা বাধা দেয়ার মতো পদক্ষেপ রয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও নিজেও এ ধরনের ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব বলে স্বীকার করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব কারণে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা ‘নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তির সঙ্গেও সাংঘর্ষিক। ওই চুক্তি অনুযায়ী, আসন্ন কোনো প্রাণঘাতী হুমকি মোকাবেলায় শেষ উপায় হিসেবে প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু এসব হামলার ক্ষেত্রে সেই শর্ত পূরণ হয়নি।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, এসব হত্যাকাণ্ড ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ হিসেবে হত্যার আইনি সংজ্ঞার আওতায় পড়তে পারে। কারণ, হামলাগুলো একটি সংগঠিত রাষ্ট্রীয় নীতির অধীনে পদ্ধতিগতভাবে পরিচালিত হয়েছে এবং নিহতের সংখ্যা বিবেচনায় এর ব্যাপ্তিও ব্যাপক। এ কারণে সল এসব হত্যাকাণ্ডের তদন্ত, হামলার নির্দেশদাতা রাজনৈতিক ও সামরিক নেতাসহ দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা এবং নিহতদের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করার আহ্বান জানিয়েছেন।
হামলাগুলোর আইনি বৈধতার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে মাদক পাচার কমাতে এসব অভিযানের কার্যকারিতা নিয়েও প্রতিবেদনে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এতে বলা হয়, মার্কিন সীমান্তে কোকেন জব্দের পরিমাণ মোটামুটি অপরিবর্তিত রয়েছে। অথচ ওই অঞ্চলের কোকেনের বড় একটি অংশ কনটেইনারবাহী জাহাজে পাচার হয়, যেগুলোতে খুব কমই তল্লাশি চালানো হয়। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র মূলত ছোট নৌযানগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে।
ফেন্টানিল ও অন্যান্য ওপিওয়েডের ক্ষেত্রেও এসব হামলার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কারণ এসব মাদক সাধারণত ভেনেজুয়েলা থেকে সমুদ্রপথে যুক্তরাষ্ট্রে পাচার হয় না। অথচ দেশটিতে অতিরিক্ত মাদক গ্রহণজনিত মৃত্যুর প্রধান কারণগুলোর মধ্যে ফেন্টানিল ও ওপিওয়েড রয়েছে।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, মাদক পাচারের নিম্নপর্যায়ের সন্দেহভাজনদের হত্যা করতে এসব হামলা মাদক চক্রের নেটওয়ার্ক ভেঙে দেয়া ও শীর্ষ নেতাদের বিচারের আওতায় আনার প্রচেষ্টাকে দুর্বল করতে পারে। হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত এসব সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় হয়েছে ৪৭০ কোটি ডলার। বেন সলের মতে, এ অর্থ প্রমাণভিত্তিক আইন প্রয়োগ, জনস্বাস্থ্য ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যয় করা যেত।