ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদন

নেতানিয়াহুর ইরান আক্রমণের সিদ্ধান্ত গত বছরের, বাকি ছিল ট্রাম্পকে টেনে আনা

ইসরায়েল যদি মনে করে কোনো দেশ এমন অস্ত্র তৈরি করছে যা তাদের জন্য হুমকি, তাহলে তারা সেই দেশকে আগেভাগে আক্রমণ করে তা থামিয়ে দেবে।

নেতানিয়াহুকে ওয়াশিংটনে তলব করে জানানো হয়, যুক্তরাষ্ট্র কূটনৈতিকভাবে সমস্যা সমাধানের জন্য ইরানের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করবে। এতে নেতানিয়াহুর পরিকল্পনা অপ্রত্যাশিতভাবে বিলম্বিত হয়। শীর্ষ ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তি জানিয়েছেন, ওয়াশিংটনের তৎপরতা সত্ত্বেও নেতানিয়াহু হামলার ব্যাপারে প্রবল আগ্রহী ছিলেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার উদ্যোগ নেয়ার অনেক আগেই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইসরায়েলকে যুদ্ধের পথে ঠেলে দিয়েছিলেন। বর্তমান ও সাবেক ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের মতে, এই পরিকল্পনার চূড়ান্ত পরিণতি ছিল ১৩ জুন ইরানের ওপর চালানো আকস্মিক হামলা। আর এই হামলার ভিত্তি কোনো নতুন গোয়েন্দা তথ্য নয়, বরং বহু আগে থেকে তৈরি করা সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা। এ ঘটনায় ট্রাম্পকে টেনে আনাই বাকি ছিল নেতানিয়াহুর।

গত বছরের অক্টোবরে ইসরায়েল ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গুঁড়িয়ে দেয়ার মাধ্যমে দুর্বল করে হিজবুল্লাহকে। এর পরপরই নেতানিয়াহু একটি বড় আকারের হামলার প্রস্তুতি নিতে সাধারণ নির্দেশ জারি করেন। ইসরায়েলি গোয়েন্দারা ইরানের পারমাণবিক বিজ্ঞানী ও সামরিক নেতাদের হত্যার জন্য তালিকা তৈরি করতে শুরু করে। একইসঙ্গে, ইসরায়েলি বিমান বাহিনী লেবানন, সিরিয়া ও ইরাকের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পদ্ধতিগতভাবে দুর্বল করে দেয়। এতে পরিষ্কার হয় ইরানের বিরুদ্ধে ভবিষ্যতের বোমা হামলার পথ।

ওয়াশিংটন পোস্ট জানায়, ঊর্ধ্বতন ইসরায়েলি কর্মকর্তারা মার্চ মাসের মধ্যেই (নেতানিয়াহুর ৭ এপ্রিল ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাতের কয়েক সপ্তাহ আগে) সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে, জুন মাসের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণ থাকুক বা না থাকুক, ইরানকে আক্রমণ করা হবে। তাদের যুক্তি ছিল, বছরের দ্বিতীয়ার্ধে ইরান তাদের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পুনর্গঠন করে ফেলবে।

পুরো শরৎকাল জুড়ে যৌথ সামরিক পদক্ষেপের জন্য ইসরায়েলি কর্মকর্তারা ওয়াশিংটনের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন। তাদের বিশ্বাস ছিল, এতে হামলা আরো কার্যকর হবে। গ্রীষ্মে সংগৃহীত মার্কিন গোয়েন্দা তথ্যে দেখা যায়, ইরানি বিজ্ঞানীরা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির তাত্ত্বিক গবেষণা পুনরায় শুরু করেছেন। তবে, তুলসি গ্যাবার্ডসহ মার্কিন বিশ্লেষকরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাননি যে, ইরানের নেতৃত্ব পারমাণবিক বোমা তৈরির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নতুন ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনেও এই মূল্যায়ন একই ছিল।

তা সত্ত্বেও ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে তার নিজের দেশের গোয়েন্দা মূল্যায়নকে খারিজ করে দিয়ে বারবার বলতে থাকেন যে, ইরান বোমার খুব কাছাকাছি রয়েছে বলে তিনি বিশ্বাস করেন। এর ফলে মার্কিন প্রশাসনের ভেতরেই দেখা দেয় মতবিরোধ।

১৩ জুন ট্রাম্পের আলোচনা চলার মধ্যেই নেতানিয়াহু ইরানের ওপর তার আকস্মিক হামলা শুরু করেন। পারমাণবিক অস্ত্রের জন্য ইরানের 'তৎপরতা' বা ইসরায়েলের ওপর কোনো আসন্ন হুমকির নতুন গোয়েন্দা তথ্য—এগুলোর কোনোকিছুই হামলার কারণ ছিল না। ইসরায়েলি ও মার্কিন কর্মকর্তারা এবং উভয় সরকারের উপদেষ্টারা জানিয়েছেন, ইসরায়েল তখন হামলাকে একটি ‘অনন্য সুযোগ’ হিসেবে দেখেছিল। বছরের পর বছর ধরে সাবধানে তৈরি করা পরিকল্পনা কার্যকর করে দুর্বল ইরানকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা, এবং ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে পিছিয়ে দেয়াই ছিল এর মূল উদ্দেশ্য।

ইরানের পারমাণবিক অস্ত্রের দিকে অগ্রগতির বিষয়ে নেতানিয়াহুর কাছে যথেষ্ট প্রমাণ ছিল কিনা, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে চলছে তীব্র বিতর্ক। এ কারণে আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে এই হামলার বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ইসরায়েলি কর্মকর্তা বলেছেন, ইরানের ওপর হামলা করার ব্যাপাররে ইসরায়েলের সিদ্ধান্ত সুযোগ এবং প্রয়োজনীয়তা দুটো দ্বারাই চালিত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘এটা সত্যি যে এর চেয়ে ভালো সময় ছিল না— ইসরায়েলিরা কখনোই এতটা ভালোভাবে প্রশিক্ষিত ছিল না এবং ইরান ও তাদের প্রক্সি দলগুলো কখনোই এতটা দুর্বল অবস্থায় পড়েনি। তবে, হামলার জন্য এটুকুই যথেষ্ট নয়। যদি তারা পারমাণবিক অস্ত্র বানিয়ে ফেলে আর আমরা খেয়াল না করি? তখন কোনো অঞ্চলই নিরাপদ থাকবে না।‘

এই হামলা ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের ‘বেজিন মতবাদ’ এর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ইসরায়েলের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মেনাখেম বিজিনের নামে নামকরণ করা এই মতবাদে বলা হয়েছে— কোনো শত্রু রাষ্ট্র যেন পারমাণবিক অস্ত্র বা ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্র তৈরি করতে না পারে। ইসরায়েল যদি মনে করে কোনো দেশ এমন অস্ত্র তৈরি করছে যা তাদের জন্য হুমকি, তাহলে তারা সেই দেশকে আগেভাগে আক্রমণ করে তা থামিয়ে দেবে— এমনকি সেই দেশ সরাসরি ইসরায়েলকে আক্রমণ না করলেও।

গত বছরের শেষের দিকে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ইসরায়েলের হামলার প্রস্তুতির কথা জানতে পেরে ওয়াশিংটনকে সতর্ক করে যে, ইসরায়েল সম্ভবত ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসের মধ্যে হামলা চালাবে। কিন্তু নেতানিয়াহুকে ওয়াশিংটনে তলব করে জানানো হয়, যুক্তরাষ্ট্র কূটনৈতিকভাবে সমস্যা সমাধানের জন্য ইরানের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করবে। এতে নেতানিয়াহুর পরিকল্পনা অপ্রত্যাশিতভাবে বিলম্বিত হয়। শীর্ষ ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তি জানিয়েছেন, ওয়াশিংটনের তৎপরতা সত্ত্বেও নেতানিয়াহু হামলার ব্যাপারে প্রবল আগ্রহী ছিলেন।

মার্কিন ও ইসরায়েলি গোয়েন্দারা একমত ছিল যে, ইরানি বিজ্ঞানীরা পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে স্থগিত গবেষণা পুনরায় শুরু করেছেন। তবে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি বোমা তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন কিনা, তা নিয়ে ছিল ভিন্নমত।

নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের উপদেষ্টা জ্যাকব নাগেল উল্লেখ করেছেন যে, ইরানি বিজ্ঞানীরা একাডেমিক পরিবেশে কাজ করছিলেন এবং পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির ‘ক্ল্যাসিফায়েড’ দিকগুলো নিয়ে তারা নতুন কিছু করছেন এমন সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছিল না। তবে তারা এমন কিছু বিষয়ে গবেষণা চালাচ্ছিলেন যা শুধুমাত্র শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের জন্য বলে মেনে নেয়া কঠিন ছিল।

সিআইএ প্রধান জন র‍্যাটক্লিফ বিশ্বাস করতেন যে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দ্বারপ্রান্তে রয়েছে। খামেনি পারমাণবিক বোমা তৈরির নির্দেশ দেননি— ২০০৭ সাল থেকে চলে আসা এমন মূল্যায়নকে তিনি পাত্তা দেননি। ওবামা প্রশাসনের অধীনে ইরানের সঙ্গে প্রধান মার্কিন আলোচক রুবেন নেফিউ ইঙ্গিত দেন যে, আসল বিভেদ সম্ভবত মার্কিন ও ইসরায়েলি গোয়েন্দা বিশ্লেষকদের মধ্যে নয়, বরং গোয়েন্দা সংস্থা এবং রাজনীতিবিদদের মধ্যে ছিল।

আর এই মতবিভেদের সুযোগ নেতানিয়াহু নিয়েছেন বলেই ইঙ্গিত নেফিউয়ের। নেতানিয়াহু একদিকে যেমন তার দশকের পর দশকের পুরোনো অবস্থানকে কার্যকর করেছেন, তেমনই ট্রাম্পের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মধ্যেই বপন করেছেন একটি দীর্ঘমেয়াদী সামরিক সংঘাতের বীজ। এই ঘটনা মূলত নেতানিয়াহুর একতরফা সিদ্ধান্ত এবং ট্রাম্পকে এতে যুক্ত করার ব্যাপারেও তিনি আপাতভাবে সফল।

আরও