বিবিসি

বসতি সম্প্রসারণের আড়ালে পশ্চিম তীরে তীব্র হল ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ অভিযান

সিমখা বলেন, যেসব ফিলিস্তিনি তার দাবি করা পাহাড়ের গ্রাম ও খামার ছেড়ে চলে গেছে, তারা বুঝেছে যে এই ভূমি ঈশ্বর ইহুদিদের জন্যই নির্ধারণ করেছেন, তাদের জন্য নয়।

ইসরায়েলের মন্ত্রী থেকে শুরু করে সিমখার মতো প্রভাবশালী স্থানীয় নেতা এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা থেকে প্রমাণ মেলে— এই চাপ আসলে একটি বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ। দখলকৃত অঞ্চলে ইহুদি বসতি দ্রুত সম্প্রসারণ এবং ইসরায়েলের পাশাপাশি একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের যে কোনো আশা সম্পূর্ণরূপে নিঃশেষ করাই এই পরিকল্পনা।

জাতি, ধর্ম ও যুদ্ধ গভীরভাবে রাজনীতি ও জমির মালিকানার সঙ্গে জড়িত যে স্থানে তার নাম পশ্চিম তীর। ইয়র্দান নদী থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত জমির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আরব ও ইহুদিদের দ্বন্দ্ব শুরু হয় এক শতাব্দীরও বেশি আগে, যখন ইউরোপ থেকে আসা জায়নিস্টরা ফিলিস্তিনে জমি কিনে বসতি স্থাপন শুরু করে। এর পর থেকে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বাঁক এই দ্বন্দ্বকে রূপ দিয়েছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের প্রাণঘাতী হামলা এবং ইসরায়েলের বিধ্বংসী প্রতিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আসে এই দ্বন্দ্বের সর্বশেষ মোড়।

যুদ্ধবিরতির আগে যত দিনই বাকি থাকুক না কেন, গত ২২ মাসের যুদ্ধের প্রভাব বছর ও প্রজন্ম জুড়ে বিস্তৃত হওয়ার হুমকি তৈরি হয়েছে এই পশ্চিম তীরে। ১৯৬৭ সালের মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ফলাফল যেমন আজও চলছে। গাজা, পূর্ব জেরুজালেম ও পশ্চিম তীর এখনো ইসরায়েলের দখলে। গাজায় ধ্বংসযজ্ঞ ও হত্যাযজ্ঞের পরিমাণ পশ্চিম তীরে চলমান উত্তেজনা ও সহিংসতাকে আড়াল করছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিদের ওপর চাপ তীব্র করেছে ইসরায়েল। এক্ষেত্রে নিরাপত্তার অজুহাত দিয়েছে নেতানিয়াহু প্রশাসন।

পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের এক আঞ্চলিক নেতা মাইর সিমখা। ইসরায়েলের মন্ত্রী থেকে শুরু করে সিমখার মতো প্রভাবশালী স্থানীয় নেতা এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা থেকে প্রমাণ মেলে— এই চাপ আসলে একটি বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ। দখলকৃত অঞ্চলে ইহুদি বসতি দ্রুত সম্প্রসারণ এবং ইসরায়েলের পাশাপাশি একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের যে কোনো আশা সম্পূর্ণরূপে নিঃশেষ করাই এই পরিকল্পনা।

দখলদার হিসেবে আইনগত দায়িত্ব পালনে ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে ব্যর্থতার অভিযোগ করছে ফিলিস্তিনিরা ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো। শুধু বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় চোখ বন্ধ করাই নয়, বরং তাতে অংশ নেয়ার অভিযোগও আছে ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে।

৭ অক্টোবর ২০২৩-এর পর থেকে পশ্চিম তীরে উগ্র-জাতীয়তাবাদী ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা তীব্রভাবে বেড়েছে। জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক দফতর (ওসিএইচএ) অনুমান করছে, বসতি স্থাপনকারী ইহুদিরা প্রতিদিন গড়ে চারটি হামলা করছে।

আন্তর্জাতিক আদালত (আইসিজে) একটি পরামর্শমূলক মত দিয়েছে যে, ১৯৬৭ সালে দখলকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের পুরো দখলই বেআইনি। ইসরায়েল এই মতকে প্রত্যাখ্যান করে দাবি করেছে, জেনেভা কনভেনশনের দখলকৃত ভূখণ্ডে বসতি স্থাপনে নিষেধাজ্ঞা তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।

বিবিসির প্রতিবেদক জেরেমি বাওয়েনের (ডানে) সঙ্গে কথা বলছেন মাইর সিমখা। ছবি- বিবিসি

ফিলিস্তিনিদের আক্রমণের সব অভিযোগ অস্বীকার করলেন মাইর সিমখা। বরং তিনি খুশি যে অধিকাংশ আরব কৃষক যারা আগে তার দখল করা পাহাড়ে পশু চরাত এবং উপত্যকায় জলপাই চাষ করত, তারা চলে গেছে। তিনি ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা ও তার পরবর্তী ইসরায়েলি প্রতিক্রিয়াকে একটি মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা মনে করেন।

তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় অনেক কিছু বদলেছে। আমাদের ভূমিতে শত্রুর আশা শেষ হয়ে গেছে। তারা বুঝতে শুরু করেছে যে তারা এখান থেকে চলে যাচ্ছে। গত এক-দেড় বছরে এটাই বদলেছে। আজ এখানে মরুভূমির জমিতে হাঁটলে কেউ এসে আপনাকে হত্যা করতে চাইবে না। এখনো আমাদের উপস্থিতির বিরোধিতা করার চেষ্টা হচ্ছে। কিন্তু শত্রু ধীরে ধীরে বুঝতে পারছে যে তাদের এখানে কোনো ভবিষ্যৎ নেই। বাস্তবতা বদলেছে। আমি আপনাকে এবং বিশ্বের মানুষকে জিজ্ঞেস করি, কেন আপনারা ফিলিস্তিনিদের নিয়ে এত আগ্রহী? তারা তো আরেকটি ছোট জাতি মাত্র। ফিলিস্তিনিরা আমার আগ্রহের বিষয় নয়। আমি আমার জনগণকে নিয়েই ভাবি।‘

সিমখা বলেন, যেসব ফিলিস্তিনি তার দাবি করা পাহাড়ের গ্রাম ও খামার ছেড়ে চলে গেছে, তারা বুঝেছে যে এই ভূমি ঈশ্বর ইহুদিদের জন্যই নির্ধারণ করেছেন, তাদের জন্য নয়।

এই বছরের ২৪ জুলাই জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের একটি প্যানেল ভিন্ন মত প্রকাশ করেছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনারের কার্যালয় থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘ব্যাপক ভীতি প্রদর্শন, সহিংসতা, জমি দখল, জীবিকা ধ্বংস এবং এর ফলে জোরপূর্বক সম্প্রদায় উচ্ছেদের কারণে আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। আমরা আশঙ্কা করি, এর ফলে ফিলিস্তিনিদের তাদের জমি থেকে বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে এবং তাদের খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ছে। সহিংসতা, সম্পত্তি ধ্বংস, এবং জমি ও সম্পদে প্রবেশাধিকারে অস্বীকার মানবাধিকার লঙ্ঘনের একটি সুসংগঠিত ধারা বলে মনে হচ্ছে।‘

সিমখা বলছেন, এখন তিনটি পাহাড়ে প্রায় ২০০ জনে পৌঁছেছে তার সম্প্রদায়। তিনি একসময় ‘হিলটপ ইয়ুথ’ নামে পরিচিত বসতি স্থাপনকারী আন্দোলনের একটি উগ্র অংশে ছিলেন, যারা ফিলিস্তিনিদের ওপর সহিংস হয়রানির জন্য কুখ্যাত। দখলকৃত ভূখণ্ডে বসতি গড়া অধিকাংশ ইসরায়েলি সিমখার মতো মতাদর্শিক বা ধর্মীয় কারণে এখানে আসেননি, বরং কারণ সেখানে সম্পত্তির দাম সস্তা।

কিন্তু এখন সিমখার মতো লোকজনই এখন ঘটনাপ্রবাহের কেন্দ্রে, তাদের নেতারা মন্ত্রিসভায়। তারা বিয়ে করেছেন, তাদের বয়স বাড়ছে। শুধু সন্তানদের জন্য সুইমিংপুল নয়, বরং ফিলিস্তিনিদের ওপর চূড়ান্ত জয় এবং ভূমির চিরস্থায়ী ইহুদি মালিকানা নিয়ে তারা ভাবছেন।

সিমখা নিজেকে সুখী মানুষ বলে মনে করেন। তার বিশ্বাস, ঈশ্বরের ইচ্ছা বাস্তবায়ন করে পশ্চিম তীরকে শুধু ইহুদিদের ভূমি বানানোর তার মিশন সফলভাবে এগিয়ে চলেছে।

উল্লেখ্য, ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে জয়লাভের পর ইসরায়েল দ্রুত নবদখলকৃত পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে ইহুদি বসতি স্থাপন শুরু করে। প্রায় ৬০ বছরে সরকার ও ধনী সমর্থকদের অর্থ ও প্রচেষ্টায় বর্তমানে প্রায় ৭ লক্ষ ইসরায়েলি ইহুদি সেখানে বসবাস করছে। বড় বড় বসতি ছোট শহরের রূপ নিয়েছে, রাস্তা ও টানেল নেটওয়ার্ক জমির স্থায়ী দখল নিশ্চিত করছে। প্রথম দিকে বসতি স্থাপনকে জাতীয় নিরাপত্তার যুক্তি দিয়ে সমর্থন করা হলেও, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি ধর্মীয়-জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। ১৯৯৩ সালের অসলো শান্তি চুক্তির মাধ্যমে জমি বিনিময়ের মাধ্যমে সংঘাত মেটানোর আশা জাগলেও ২০০০ সালে তা ব্যর্থ হয়। কারণ ধর্মীয় জায়নিস্টদের বিশ্বাস, তাদের জন্য এ জমি ঈশ্বরপ্রদত্ত।

আরও